ইরান যুদ্ধে বিপর্যস্ত এশিয়া: জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে জনজীবন

বিবিসি’র প্রতিবেদন

ইরান যুদ্ধে বিপর্যস্ত এশিয়া: জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে জনজীবন

ফন্ট সাইজ:

ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়াজুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এশিয়ায়, কারণ এই পথ দিয়ে আসা ৯০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এশীয় দেশগুলোতে রপ্তানি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার ইতিমধ্যে ওয়ার্ক ফ্রম হোম, কর্মদিবস কমানো এবং জাতীয় ছুটির মতো জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

ফিলিপাইনে জাতীয় জরুরি অবস্থা: যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে ফিলিপাইনে। মঙ্গলবার দেশটি জ্বালানি সরবরাহ ও স্থিতিশীলতার ওপর আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। রাজধানী ম্যানিলার ঐতিহ্যবাহী জিপনি চালকরা চরম সংকটে পড়েছেন। কার্লোস ব্রাগাল নামের এক চালক জানান, আগে যেখানে ১২ ঘণ্টা কাজ করে তিনি ১০০০ থেকে ১২০০ পেসো আয় করতেন, এখন তা নেমে এসেছে ২০০ থেকে ৫০০ পেসোতে। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে আমাদের পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। সরকারের দেয়া ভর্তুকি মাত্র দুই দিনের তেলের পয়সা যোগায়, এরপর আমাদের কী হবে? শুধু চালকরাই নন, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বুলাকানে সবজি চাষিরা চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছেন।

থাইল্যান্ডে ভিন্নধর্মী প্রতিবাদ ও সাশ্রয়: জ্বালানি সাশ্রয়ে থাইল্যান্ড সরকার একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে। নাগরিকদের এসি ২৬-২৭ ডিগ্রিতে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমনকি থাই পিবিএস-এর সংবাদ পাঠিকারা অন-এয়ারে তাদের প্রথাগত স্যুট বা ব্লেজার খুলে সংবাদ পাঠ করছেন, যাতে গরমের মধ্যে এসি কম ব্যবহার করেও কাজ চালানো যায়। সংবাদ উপস্থাপিকা সিরিমা সংকলিন বলেন, স্যুট খোলা হয়তো পুরো সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু আমরা একটি উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছি যে আমরা পরিস্থিতি নিয়ে উদাসীন নই।

শ্রীলঙ্কায় নতুন সংকট: ২০২২ সালের আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠা শ্রীলঙ্কা ফের নতুন বিপদে পড়েছে। কলম্বোর বাসিন্দা দিমুথু জানান, আগের বার দেশের কাছে তেল কেনার অর্থ ছিল না, আর এবার অর্থ আছে কিন্তু বাজারে তেল নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার প্রতি বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে এবং তেলের রেশনিং শুরু করেছে। তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে মানুষ তাদের কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন। নিমাল নামের এক ঘাস কাটার যন্ত্র চালক জানান, তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার কাজ অন্যের হাতে চলে যাচ্ছে।

মিয়ানমার ও ভারতে থমকে গেছে শিল্প ও সামাজিক জীবন: গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারে এখন তেলের অভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের জন্য জোড়-বেজোড় (এক দিন অন্তর) নীতি চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বের জনবহুল দেশ ভারতে এই সংকটের প্রভাব পড়েছে ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানায়। গুজরাটের সিরামিক শিল্প গ্যাস সংকটের কারণে এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে, যার ফলে প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। মুম্বাইয়ের প্রায় ২০ শতাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। রান্নার গ্যাসের (খচএ) জন্য দেশজুড়ে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, কারণ ভারতের মোট এলপিজি আমদানির ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে।

চীনের সতর্কতা: বিপুল পরিমাণ তেলের মজুদ থাকা সত্ত্বেও চীন এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক। তারা ইতিমধ্যে তেলের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানে আমেরিকা ও ইসরাইলের এই যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো তত বেশি পতনের মুখে পড়বে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই মানবিক বিপর্যয় থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন