পোলাওয়ের ঘ্রাণ

পোলাওয়ের ঘ্রাণ

ফন্ট সাইজ:

ঈদের সকাল মানেই এক অদ্ভুত ঘ্রাণে ভরে ওঠে সারাবাড়ি। চুলোর আগুনে দুধসাদা চাল, ঘি আর গরম মসলার মিশ্রণে যে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে তা শুধু রান্নাঘরে নয়Ñ মনের ভেতর জাগিয়ে দেয় রসনাবিলাসের রমরমা মুহূর্তটির কথা। খুলে যায় স্মৃতির পাতা। যার নাম আনন্দ। ঈদের দিনের আনন্দেরও যেন একটা গন্ধ আছেÑ আর তার নাম পোলাও। এই পোলাও তখন আর শুধু খাবার থাকে না; হয়ে ওঠে উৎসবের সুগন্ধ।
নতুন পোশাকের গন্ধের সাথে ঈদের গন্ধ জড়িয়ে আছে। এই মায়াবী গন্ধে ঈদের সকালে সেমাইয়ের স্বাদ যেন অপেক্ষার বাঁশি বাজায় পোলাও খাওয়ার।
চুলার পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের রান্নার আয়োজন দেখতে দেখতে মনটা লাফিয়ে উঠতো পোলাওয়ের জন্য। মায়ের হাতের কী অপূর্ব স্বাদের পোলাও। চুলো থেকে পোলাওয়ের পাতিল নামানোর পর ঢাকনা খুলে গরম ভাপ নেয়াÑ ছোটবেলার সেই মুহূর্তটি আজও অমøান হয়ে আছে। চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে মায়ের সেই রান্নাঘর, সেই হাঁড়ি-পাতিল, সেই বাসনকোসন, ফিন্নি-পায়েস, জর্দা, মাংস, মসলাপাতি, তরিতরকারি, ঘি-তেলÑ সবকিছু ছাপিয়ে পোলাওয়ের চাল বিশেষ স্বাদে ভরপুর করে দিতো মনটাকে। ঘরে পোলাও। কারও বাসায় বেড়াতে গেলে পোলাও। যে বাড়িতেই যাই না কেন প্লেটে এক চামচ পোলাও যে কী মায়া তৈরি করে দিতো সেই সুগন্ধীযুক্ত মায়াবী পোলাওয়ের স্বাদ এতই শক্তিশালী। যা জীবনভর বহমান থাকে।
ঘিয়ে ভাজা চালের মায়াবী ঘ্রাণে ঈদের দিন ধনী-গরিব সব বাড়ির বাতাস এক হয়ে যায় পোলাওয়ের গন্ধে। আর এই গন্ধ থেকে পাওয়া যায় মন রাঙানো উৎসবের অনুভূতি। ঈদের আনন্দ যেন ছড়িয়ে পড়ে পোলাওয়ের ঘ্রাণ হয়ে।
শৈশব থেকে শুরু। বয়সের ধাপে ধাপে সময় এগিয়ে চললেও পোলাওয়ের ঘ্রাণ সেই একইরকম মজার উপাদেয় খাবার। ঈদের দিন শেষে ঘ্রাণ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। পাতিল খালি হয়, প্লেট ধুয়ে ফেলা হয়, ঈদের ব্যস্ততা থেমে আসে। কিন্তু পোলাওয়ের স্বাদের সেই গন্ধ কোথায় যেন রয়ে যায়।
পোলাওয়ের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক গভীরভাবে আবেগময়। দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ ভাতের বিপরীতে পোলাও আসে বিশেষ দিনগুলোর আমন্ত্রণ নিয়ে। ঈদ, বিয়ে জন্মদিন, উৎসব অতিথির আগমন কিংবা হঠাৎ কোনো খুশির উপলক্ষÑ সবকিছুর মাঝেই পোলাও যেন বলে দেয় আজকের দিনটি আলাদা। এই আলাদা হয়ে ওঠার মধ্যেই আনন্দ উদ্যাপনের সূচনা।
আনন্দের স্বাদ তৈরির পেছনে আছে প্রস্তুতির গল্পও। বাড়িতে পোলাও রান্না মানেই একটু বিশেষ আয়োজন, বাড়তি প্রস্তুতি। রান্নায় একটু বেশি বেশি মনোযোগ। পোলাওর চাল জোগাড় করা ছাড়াও ঘি-মসলা বাছাই করতে হয়। এলাচ দারুচিনি তেজপাতার সুবাসে এক পাতিল পোলাও পরিবারে এনে দেয় ভালোবাসার উষ্ণতা। খাবার টেবিলে পোলাও রচনা করে পারিবারিক বন্ধনের গভীরতা। একইসঙ্গে অতিথি আপ্যায়নে এক প্লেট পোলাওয়ের মধ্যদিয়ে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়। তাইতো বাঙালি পরিবারে এখনো পোলাও যেন শুধু খাবার নয়Ñ এটি আনন্দ ভাগাভাগির মহা আয়োজন।
পোলাও এমন একটা খাবার যা সীমারেখা মানে না। ধর্ম, জাতি, ভাষা কিংবা ভূগোলের মানচিত্রÑ সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে এটি আজও সব মানুষের প্রিয় খাবার। পৃথিবীর নানা প্রান্তে খাবারের নাম পাল্টে যায়, মসলার ঘ্রাণ পাল্টে যায় কিন্তু পোলাও তার মূল সত্তা নিয়ে একইভাবে উৎসবের আপ্যায়নে স্বাদের প্রতীক হয়ে আছে। মানুষের বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, প্রার্থনার ধরন আলাদা হতে পারে কিন্তু আনন্দের অনুভূতি এক। সেই অনুভূতির স্বাদ বহন করে পোলাও। পোলাওয়ের স্বাদ প্রমাণ করে মানবজীবনের অনুভূতি সত্যিই সর্বজনীন।
আজকাল পোলাওয়ের সাথে উপজাত হয়ে জায়গা নিয়েছে বিরিয়ানি, খিচুড়ি, তেহারি, কাচ্চি, মোরগপোলাও। কিন্তু কালিজিরা কিংবা চিনিগুঁড়া চালের পোলাও অভিন্ন স্বাদে বাঙালি পরিবারে উৎসবের আমেজ এনে দেয়। করপোরেট কারখানায় তৈরি পোলাওয়ের চাল আজকাল ব্র্যান্ডের নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। পোলাওয়ের চাল কিনতে গিয়ে অনেকেই বিক্রেতার কাছে নাম ধরে আর কেউ বলে না ‘চিনিগুঁড়া দেন’ কিংবা ‘কালিজিরা দেন’। সরাসরি ব্র্যান্ডের নাম বলেই ক্রয় করছে পোলাওয়ের চাল।
পোলাওয়ের আসল জাদু লুকিয়ে আছে তার চালে। মূলত চাল হচ্ছে পোলাওয়ের প্রাণ। উপযুক্ত চাল না হলে পোলাও হয়ে উঠবে ভাতের মতো। পোলাওয়ের চাল মানে আলাদা এক পরিচয়। প্রতিদিনের ভাতের চালের বিপরীতে পোলাওয়ের চাল হয় সাধারণত লম্বা, সরু, ঝরঝরে। কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, বাসমতি কিংবা ছোটদানার সুগন্ধি চাল দিয়ে পোলাও রান্না হয়। পোলাও রান্নারও কৌশল আছে। যে কারণে পোলাওয়ের চালকে যত্ন করে ঝেরে-ধুয়ে-পরিষ্কার রাখতে হয়। খানিকটা সময় ভিজিয়ে রেখে সতর্কতার সঙ্গে ঘি-মসলায় চাল এমনভাবে ভেজে নিতে হয় যেন চালের দানা না ভেঙে যায়। চালের দানা ভেঙে গেলে পোলাওয়ের সৌন্দর্য কমে যাবে। রান্নার পর ঝরঝরে ভাবটা অটুট রাখতে হবে। আর এ কারণেই পোলাও রান্নার সময় প্রয়োজন একটু বাড়তি মনোযোগ। রন্ধনশিল্পীর হাতে তাহলেই সুস্বাদু হয়ে ওঠে পোলাও। পোলাও আমাদের চিরচেনা ঐতিহ্য। কিন্তু এর শুরুটা কবে থেকে হলো?
তথ্যব্যাংক ঘাটাঘাটি করে জানা গেল যে, পোলাওয়ের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। উৎপত্তি হয়েছিল প্রাচীন পারস্যে। যা বর্তমানে ইরান অধ্যুষিত অঞ্চল। সে সময় এই খাবারটিকে বলা হতো পিলাফ। কেউ কেউ বলতেন পলৌ। ফরাসি শব্দ পলৌ থেকে পোলাও নামটি এসেছে। তবে মাংস ও চালের মিশ্রণে তৈরি পলান্ন শব্দ থেকে পোলাওয়ের ধারণা পাওয়া যায়। পল মানে মাংস এবং অন্ন মানে ভাত বা খাদ্য। প্রাচীন ভারতে এমনকি মহাকাব্যিক যুগে আমিষ মিশ্রিত এই বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হতো। প্রাচীন খাবার পলান্ন থেকেই কালক্রমে আজকের পোলাও। যার উপজাত হচ্ছে বিরিয়ানি। এটি রাজকীয় খাবার হিসেবে বিবেচ্য হতো। রান্নার কৌশল বলতে সে সময় ঘি আর মসলার মিশ্রণে সুগন্ধী চালের ভাপে রান্না হতো। পারস্যের রাজসভায় এই খাবার খাওয়া হতো। পরে মুঘল আমলে পারস্যের সীমানা পেরিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মজাদার খাবার হিসেবে পোলাওয়ের প্রচলন শুরু হয়।
স্বাদে এবং উপকরণে আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে বলে কালক্রমে এটি পোলাও নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বালুচি, তানজানিয়া এবং তুরস্ক অঞ্চলে রন্ধনশৈলীতে ভিন্নস্বাদের খাবার হিসেবে পোলাও বেশ পছন্দের খাবার। গরম গরম পোলাওয়ের যেমন স্বাদ পাওয়া যায় তেমনি ঠান্ডা পোলাও খেতেও অন্যরকম স্বাদ। পোলাওয়ের সঙ্গে মাছ, মাংস, মুরগির রোস্ট কোরমা, সবজি, কিংবা ডিমের তরকারি খুবই সুস্বাদু। কোনো কোনো অঞ্চলে বিশেষ করে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ এলাকায় অনেকেই চ্যাপা ভর্তা দিয়ে পোলাও খেতে ভালোবাসেন। পরিবেশনের সময় পোলাওয়ের ওপরে পিয়াজের বেরেস্তা, কিসমিস, বাদাম দিয়ে সাজিয়ে পোলাওকে আরও লোভনীয় ও সুস্বাদু করে তোলা হয়।
আজ সময় বদলেছে। মানুষের খাবারে এসেছে বিচিত্রপদ। বৈচিত্র্যের সম্ভারে বদলে গেছে খাবারের রুচি। তবুও পোলাওয়ের সেই পরিচিত ঘ্রাণ সেই স্বাদ, উৎসবী আমেজ আজও অফুরান। 

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন