বাংলার প্রভাবশালী জগৎ শেঠ পরিবার

বাংলার প্রভাবশালী জগৎ শেঠ পরিবার

ফন্ট সাইজ:

বাংলায় বাণিজ্য করে বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী ধনী বণিক পরিবারের জন্ম হয়। জগৎ শেঠ পরিবার, উমি চাঁদ, খোজা ওয়াজিদ এদের অন্যতম। নবাব আমলে জগৎ শেঠ পরিবার এত ধনী হয়ে ওঠে যে তাদের ওপর শুধু বাণিজ্য নয়, অনেকের রাজনৈতিক অবস্থানও নির্ভর করতো। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের রথসচাইল্ড পরিবারকে জগৎ শেঠ পরিবারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ঘটনাচক্রে দুটো পরিবারই বাংলা বাণিজ্যের মাধ্যমে তাদের ভাগ্যের চাকা বদলে ফেলে। রাজস্থানের মারওয়ার থেকে ভাগ্যান্বেষী জৈন ধর্মাবলম্বী হীরানন্দ শাহু বাংলায় আসেন। সাত ছেলের অন্যতম মানিক চাঁদকে তিনি ঢাকায় মহাজনী ব্যবসার জন্য পাঠান। মানিক চাঁদ যখন ঢাকায় স্থায়ী হন তখন তার কাছে ছিল ১০০ মিলিয়ন রুপি। মূলত ব্যবসায়িক বুদ্ধির কারণে মানিক চাঁদ বাংলার শাসক মুর্শিদ কুলি খানের প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপিত হলে ১৭০৪ সালে তিনি সেখানে স্থায়ী হন এবং বিপুল অর্থ দিয়ে নবাবকে সহায়তা করেন।
তার উত্তরসূরিরা একই ধারা বজায় রাখেন বিশেষ করে ফতেহ চাঁদ প্রবল প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। মানিক চাঁদের কোনো ছেলে ছিল না, ফতেহ চাঁদ ছিলেন তার ভাগ্নে। বাংলা থেকে যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব মোগল শাসকদের দেয়া হতো তা আদায়ে জগৎ শেঠ পরিবার অগ্রণী ভূমিকা পালন করতো।

নবাব সুজাউদ্দিনের সময় ফতেহ চাঁদ নবাবের পক্ষে ১৫০ লাখ বা দেড় কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে দিল্লিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ সময় ফতেহ চাঁদের আয় হয় ৪০ লাখ টাকা। ১৭২৪ সালে মোগল শাসকরা তাদের ‘জগৎ শেঠ’ বা বিশ্বের সেরা ধনী হিসেবে উপাধি দান করেন। জগৎ শেঠ উপাধি একসময় পারিবারিক পরিচিতিতে পরিণত হয়। তাদের সম্পর্কে প্রচলিত কথা ছিল এমন, ‘গঙ্গা যেমন শতমুখে জলরাশি এনে সমুদ্রে ফেলে, তেমনি ধনরত্ন এসে জমা হতো জগৎ শেঠদের কোষাগারে।’

বাংলার নবাবদের একচেটিয়া আনুকূল্যে জগৎ শেঠ পরিবার বাংলার অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মুর্শিদাবাদ ও ঢাকায় টাকশালের মুদ্রা তৈরি প্রায় এককভাবে তারা নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৭৫৭ সালে তারা ৫৮ লাখ টাকার সমমূল্যের মুদ্রা তৈরি করে সাড়ে তিন লাখ টাকা লাভ করেন। বৃটিশ কর্মকর্তা লিউক স্ক্র্যাফটনের হিসেবে এই সময় জগৎ শেঠদের বার্ষিক আয় ছিল ৫০ লাখ টাকার মতো। বাংলার মোট রাজস্বের দুই-তৃতীয়াংশই জগৎ শেঠ পরিবারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হতো, যার একটি অংশ তারা নিজেরা রাখতেন। বাংলার মুদ্রা বিনিময় হার কতো হবে- সেটাও নির্ধারণ করতো জগৎ শেঠ পরিবার। সুদে টাকা ধার দেয়ার মহাজনী ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও ছিল তাদের হাতে। দিল্লির মোগল দরবারে জগৎ শেঠদের এত বেশি প্রভাব ছিল যে, বাংলার অনেক নবাবের ক্ষমতা ও কাজের অনুমোদন তারা করিয়ে নিয়ে আসতেন। তাদের বলা হতো ‘ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাংকার’। বৃটিশরা ইহুদি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তুলনা করে জগৎ শেঠদের বলতেন ‘গ্রেটেস্ট অব জু’স’। ইংরেজ ইতিহাসবিদ রবার্ট ওরম ১৭৫০-এর দিকে লিখেছেন, ‘সারা পৃথিবীতে জগৎ শেঠরাই সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাংকার।’
কলকাতা বসবাসকারী ইংরেজ বণিক ক্যাপ্টেন ফেন্উইক বলেন, ‘জগৎ শেঠ মাহতব রাই নবাবের খুব প্রিয়পাত্র এবং লন্ডনের ব্যাংকারদের কেন্দ্র লম্বার্ড স্ট্রিটের সমস্ত ব্যাংকারকে যোগ করলেও তার মতো ব্যাংকার হবে না।’
কাশিমবাজারে ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল লিখেছেন, ‘জগৎ শেঠরা হচ্ছেন মোগলদের ব্যাংকার, জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি।’
১৭৫৫ থেকে ১৭৫৭ সাল- এই তিন বছরে জগৎ শেঠদের কাছে ফরাসিদের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ইংরেজ কোম্পানি শুধু মুর্শিদাবাদ থেকেই ১৭১৮ থেকে ১৭৩০ সালের মধ্যে জগৎ শেঠ পরিবারের কাছে ঋণ করেছিল বছরে গড়ে চার লাখ টাকা। জগৎ শেঠ পরিবারের অর্থনৈতিক শক্তির কথা ইউরোপিয়ান বিভিন্ন কোম্পানির উচ্চ পদস্থ কর্মচারীরা লিখে গেছেন। ১৭৪০ সালে ফরাসি কুঠির প্রধান ডুপ্লে লিখেছেন, ‘জগৎ শেঠরা ইহুদিদের চেয়েও অধম, সব সময় কাটারি দিয়ে আমাদের গলা কাটতে উদ্যত।’
সকল বিদেশি কোম্পানিকেই বাংলা থেকে টাকা ধার করতে হতো। অর্থ ব্যবস্থাপনায় উন্নত ও সংগঠিত বাংলা এগিয়ে থাকায় তাদের ঋণ পেতে সমস্যা হতো না। সুরাটে সুদের হার ছিল শতকরা ৯ টাকা আর বাংলায় ১২ টাকা। ১৭৪০ সালে ইংরেজদের বিনীত অনুরোধে জগৎ শেঠ পরিবার সুদের হার শতকরা ৯ টাকায় নামিয়ে আনে।
জগৎ শেঠ ফতেহ চাঁদ সম্পর্কে ডাচ্ কোম্পানি প্রধান সিকটরম্যান ১৭৪৪ সালে তার মেমোরিতে লিখেন, ‘জগৎ শেঠ ফতেহ চাঁদ সবচেয়ে বড় ব্যাংকার, তার ব্যবসা বাণিজ্য মহাজনী কারবার ভারতবর্ষের সর্বত্র বিস্তৃত। তিনি যদিও ব্যক্তিগতভাবে শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, তা সত্ত্বেও পুরো ব্যাপারটিতেই তার প্রচণ্ড প্রভাব রয়েছে। সেজন্য তাকে সব সময় খুশি রাখা এবং তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা খুবই দরকার। এটা করার সবচেয়ে ভালো উপায় তাকে নিয়মিত বিরল প্রজাতির ছোট পাখি, ভালো মসলা ও ছোটখাটো এবং দুষ্প্রাপ্য জিনিস উপহার দেয়া।’
জগৎ শেঠদের সেরা সময়ে তাদের পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ ১৪ কোটি টাকার বেশি ছিল। ১৭৪২ সালে মারাঠা নেতা মীর হাবিবের নেতৃত্বে মুর্শিদাবাদে হামলা হয়। মারাঠা বাহিনী জগৎ শেঠ ফতেহ চাঁদের বাড়ি লুট করে নগদ দুই কোটি টাকা নিয়ে যায়। এই সময়ে ফতেহ চাঁদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সিয়রের অনুবাদক হাজী মুস্তাফা লিখেছেন, ‘এই বিশাল পরিমাণ টাকা লুট হয়ে গেলে ইউরোপের যেকোনো রাজাই বিচলিত বোধ করতেন। কিন্তু জগৎ শেঠ ফতেহ চাঁদের হাবভাবে বিশেষ কোনো তারতম্য হলো না। তিনি নবাবের জন্য নির্ধারিত এক কোটি টাকা কেন্দ্রীয় কোষাগারে একবারেই দিয়ে দিলেন।’
আঠারো শতকের শুরুতে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিতি জগৎ শেঠ পরিবারের উল্কাগতিতে উত্থানের পেছনে ছিল বাংলার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক। সে সময়ের আরও দুই বড় বণিক উমি চাঁদ ও খোজা ওয়াজিদের বেলায়ও নবাবরা একই নীতি অবলম্বন করেন। সাধারণ বণিকদের জন্য নবাবগণ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এমনকি বণিকদের বিপদে-আপদে নবাবরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।
বাংলার নবাবদের সঙ্গে এই সুসম্পর্কের ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে বৃটিশদের সঙ্গে জগৎ শেঠ পরিবারের যে সদস্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তার নাম মহতাব রায়। নবাবের অতি প্রিয়ভাজন মহতাব রায়ের বিশ্বাসঘাতকতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জগৎ শেঠ পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণেই মীর জাফরকে বৃটিশরা পরবর্তী নবাব হিসেবে নির্বাচন করে। বৃটিশরা তাদের কোনো বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে রাজি ছিল না। মহতাব রায়কে ব্যবহার করে কাজ শেষে ছুড়ে ফেলা হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে মহতাব রায়ের বিশ্বাসঘাতকতা পরবর্তীতে হাত-পা বেঁধে গঙ্গায় ডুবিয়ে তার নিজের করুণ মৃত্যুর কারণ শুধু হয়নি, পুরো জগৎ শেঠ পরিবারের ধ্বংস ডেকে আনে। ক্রমেই পরিবারটি তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি হারাতে থাকে।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক, এসোসিয়েট ফেলো রয়্যাল হিস্টোরিকাল সোসাইটি



মোঃ আতাউর রহমান

২ মাস আগে

সকল যুগে সকল সময়ে বিশ্বাস ঘাতকদের পরিনতি জগৎ শেঠ মাহতাব রায়ের মতই হয়।

মন্তব্য করুন