গুণী অভিনেত্রী ববিতা। পারিবারিক নাম পপি থেকে ববিতা হওয়ার গল্পে উঠে এসেছে তার রঙিন দিনের স্মৃতিচারণে। ববিতা মানেই ৮০-৯০ দশকের ফ্যান্টাসি দুনিয়ার রঙিন মলাটের পুরো উপন্যাস। তরুণদের স্বপ্নে আসা অধরা এক অপ্সরা। যিনি কালের পরিক্রমায় হয়ে উঠেন মর্ডাণ আইকন।
সময় বহতা নদীর মতো। শুধু বয়েই চলা থেমে থাকা তার অভিধানে নেই। আমার অভিনয় জীবনটা তেমনি। সেই ১২-১৩ বছর থেকে অভিনয়ে হাতেখড়ি ‘সংসার’ সিনেমা দিয়ে। রাজ্জাক ভাই, আমার বড় বোন (আমার অভিভাবক সুচন্দা আপা) যাকে আমি বুজি বলে ডাকি তার মেয়ে চরিত্রে প্রথম ক্যামেরার সামনে আসা। আমার দুলাভাই প্রখ্যাত পরিচালক জহির রায়হানের বদৌলতে অভিনেত্রী ববিতার জন্ম।
মানবজমিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জীবনের অনেক অজানা কথাই বললেন গুণী এই অভিনেত্রী। বাসায় আমন্ত্রণ জানালেন আলাপচারিতার জন্য। আমাদের এই আলাপচারিতায় তার ছোট বোন নায়িকা চম্পা দ্যুতিয়ালির ভূমিকা রেখেছেন। গুলশানের অভিজাত এলাকায় সুরম্য অট্টালিকার টপ ফ্লোরে ছবির মতো সাজানো ফ্ল্যাটের সদর দরজা খুলে হাসিমুখে সম্ভাষণ জানালেন। পুরো বাড়ি জুড়েই নান্দনিকতার ছোঁয়া। যেদিকেই চোখ যায় শিল্পের ছোঁয়া।
সবকিছু ছাপিয়ে যে বিষয়টি চোখ জুড়িয়ে যায় সেটা হচ্ছে গাছ-ফুল আর পাখির কিচিরমিচির মিশেলে তার বাগান দেখে। অসংখ্য দেশি-বিদেশি ফুলের গাছ দিয়ে তৈরি তার ছাদবাগান। শুভ্রতা যে শান্তির প্রতীক ববিতার আসবাব তারই ছোঁয়ায় মূর্ত। আর আজ তিনি পরেছেনও সাদা শাড়িতে অসংখ্য ফুলের কারুকাজ করা শাড়ি। তার হিরের নাকফুল জ্বলজ্বল করছে ধ্রুবতারার মতো।
আলাপচারিতার জন্য তার ছাদ বাগানকেই বেছে নিলাম। তিনি নিজেই তদারকি করলেন কোন এঙ্গেলে ক্যামেরা বসালে ভালো হবে, আলোর সোর্সটা কোনদিক দিয়ে সুন্দর আবহ তৈরি করবে- সবমিলিয়ে অপূর্ব তার শিল্পীসত্তা। মানবজমিন পরিবারের পক্ষ থেকে একগুচ্ছ লাল গোলাপের ঝুড়ি তার হাতে ২১শে পদকপ্রাপ্তিতে তুলে দিলাম। গুণী অভিনেত্রীকে অনেক শুভেচ্ছাও জানালাম।
প্রথমেই জানতে চাইলাম বিশ্বখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনিসংকেত’-এ তার সুযোগ পাওয়ার গল্প সম্পর্কে?
ববিতা: আমি তখন মাত্র বাংলাদেশের সিনেমায় নাম লিখিয়েছি। খুব একটা পরিচিত মুখ হয়ে উঠিনি। বরং আমার বড় বোন সুচন্দা জনপ্রিয় নায়িকা তখন। আমরা পুরো পরিবার গেন্ডারিয়ায় থাকি। হঠাৎ একটি চিঠি এলো ভারতের অ্যাম্বেসি থেকে আমার নামে। চিঠির বিষয় সত্যজিৎ রায় তার ‘অশনিসংকেত’ সিনেমার জন্য আমাকে ভাবছেন। প্রথমে বিষয়টি আমি সিরিয়াসভাবে নেইনি। কারণ আমার মতো অচেনা আনকোরা বাংলাদেশের অভিনেত্রীকে উনার মতো ডাকসাইডে পরিচালকের তো চেনারই কথা না? চিঠিটা ওভাবেই পড়ে রইলো। আমি ভাবলাম কেউ হয়তো মজা করেছে। সময় গড়িয়ে যায়। একদিন হঠাৎ ল্যান্ডফোনে ভারতীয় দূতাবাস থেকে কল এলো। ও প্রান্ত থেকে বলা হলো মিস ববিতাকে মি. রায় পত্র দিয়েছিলেন, আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তার সঙ্গে দেখা করতে। দু’দিন হয়ে গেল চিঠি পৌঁছানোর কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। সুচন্দা আপা তো অনেক আগেই আমাকে বলেছিলেন এই চিঠির বিষয়টি সিরিয়াসলি নিতে আমাকে। কিন্তু আমি হালকাভাবে নিয়েছিলাম। দূতাবাসের একটি কলে শুধু আমি না পুরো পরিবারে আনন্দ বয়ে গেল। দিন-তারিখ ঠিক করে সুচন্দা আপা আমি কলকাতায় গেলাম। হাসতে হাসতে ববিতা বললেন, আমি তো আমার বিউটি বক্স ভর্তি মেকআপ নিয়েই গেলাম। প্রথম যেদিন বিশ্বখ্যাত পরিচালকের বাসায় গেলাম, আমি আমার মনের মাধুরী মিশিয়ে চড়া মেকআপ করে গেলাম। প্রথম দেখাতেই আমাকে বললেন, এত মেকআপ দিয়েছেন কেন? আমি তো লজ্জায় পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ আলাপ করলেন। বললেন আগামীকাল ইন্দ্রপুরি স্টুডিওতে মেকআপ ছাড়া আসবেন, আপনার স্ক্রিনটেস্ট নেয়া হবে।
আমরা হোটেলে ফিরে গেলাম। সেদিন সারারাত আমার ঘুম হয়নি আগামীকালের স্ক্রিন টেস্টের বিষয় নিয়ে। পরেরদিন যথারীতি গেলাম ইন্দ্রপুরিতে। সেদিন মেকআপ ছাড়া আমাকে দেখে সত্যজিৎ রায় বললেন, আমি তো আপনাকে এভাবেই দেখতে চাইছিলাম। উনি খুশি হলেন এবং ক্যামেরায় লুক দিয়ে আমার অভিব্যক্তি দেখে নিলেন। এইভাবেই আমি খ্যাতিমান পরিচালকের সিনেমায় সুযোগ পেয়েছিলাম, যা আমাকে আন্তর্জাতিক অভিনেত্রীর সম্মান এনে দিয়েছে। যেখানে ওই সময় ভারতের বিখ্যাত সব অভিনেতা-অভিনেত্রী মুখিয়ে থাকতো যদি একবার সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় সুযোগ পেতাম। আমার জীবনে ব্যতিক্রম হলো। সুযোগ আমার দোরগোড়ায় নিজেই ধরা দিয়েছিল। এর জন্য আমি সত্যজিৎ রায় যাকে আমি মানিক দা বলে ডাকতাম, তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। সেই সিনেমায় আমার সহশিল্পী সন্ধ্যা রায়, সৌমিত্র দাদা সহযোগিতা না করলে হয়তো দেশের গণ্ডির মধ্যেই আমার নাম থেকে যেত।
১৯৮০-৯০’র দশকে স্কুল-কলেজের তরুণীদের মাঝে ববিতার চুলের স্টাইল, বেলবটম প্যান্ট, ব্লাউজের কাট সবকিছু ফলো করা হতো- বিষয়টি ভাবতে কেমন লাগে?
ববিতা: মজার বিষয় কী জানেন? সবাই যখন ডানদিকে নাকফুল পরতো, আমি বামদিকে পরতাম। আমার দেখাদেখি আমার বান্ধবীরাও শুরু করলো বাম নাকে ছিদ্র করা। বিউটি পার্লারে তরুণীরা দলবেঁধে যেতেন। তাদের একটাই আবদার ববিতার মতো চুলের কাট করে দিতে হবে।
বাংলাদেশে একমাত্র অভিনেত্রী আপনি, আপনার নামের আগে অনেকগুলো সম্মান যুক্ত রয়েছে। যেমন প্রথম আন্তর্জাতিক অভিনেত্রী, জাতীয় পুরস্কার টানা তিনবার (হ্যাট্টিক) অর্জন করেছেন, প্রথম যৌথ প্রযোজনার সিনেমা ‘দূরদেশ’- এ অভিনয় এবং সবচেয়ে যে সম্মানজনক বিষয়টি রয়েছে ইউনিসেফের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হয়েছেন? এত সম্মান বিষয়টি ভাবতে কেমন লাগে?
ববিতা: আমি সর্বপ্রথমেই মহান আল্লাহ্র নিকট শুকরিয়া জানাই, তারপর আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি বিশেষ করে জহির রায়হানের প্রতি, তিনি যদি আমাকে শিল্পী হিসেবে আবিষ্কার না করতেন তাহলে তো সবকিছু বৃথা যেত।
খান আতাউর রহমান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, আমজাদ হোসেনের মতো বিখ্যাত সব নির্মাতাদের সঙ্গে আপনার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু আমজাদ হোসেন আপনার জন্য লাকি প্রমাণ হয়েছে। যেমন- নয়নমণি, সুন্দরী কসাই কিংবা গোলাপী এখন ট্রেনে; যা আপনাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে?
ববিতা: আমজাদ হোসেন যে সিনেমাগুলো নির্মাণ করেছেন তার সবগুলো গল্পেই বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষ নিপীড়িত, বঞ্চিতদের গল্প ফুটে উঠতো। শুধু যে গল্প তা নয় লোকেশন, পোশাক, ডায়ালগ দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত। আমি সৌভাগ্যবান আমজাদ ভাই আমাকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন প্রতিবাদী, নিপীড়িত নারী চরিত্রগুলো পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে। উনার সিনেমা মানেই শক্তিশালী টিম যেমন- এটিএম শামসুজ্জামান, রওশন জামিল, আনোয়ার- তাদের বাস্তবধর্মী অভিনয় দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত।
আপনার বলয় থেকে আমজাদ হোসেনকে সরিয়ে নেয়ার জন্য ওই সময় অভিনেত্রী শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিক সিনে পলিটিক্স করেছিলেন, যা ওই সময় চিত্রালী পূর্বানীতে ফলাও করে ছাপা হয়েছিল?
ববিতা: সত্য-মিথ্যা যাই হোক, এ বয়সে এসে এসব বিষয়ে বলাটা শোভনীয় দেখায় না। কারণ আমজাদ হোসেনের সিনেমা মানেই আলোচনা, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তির সম্ভাবনা। আমজাদ ভাইয়ের সঙ্গে নতুন একটি সিনেমায় চুক্তি করেছি। হঠাৎ একদিন কোনোরকম সৌজন্যবোধ না দেখিয়েই আমাকে বাদ দেয়া হলো। পরবর্তীতে ওইসব সিনেমা যেমন- ভাত দে, সখিনার যুদ্ধ- সাদেক ভাইয়ের এসএস থেকে নির্মিত হয়েছিল শাবানা সুযোগ পেয়েছিলেন। শুধু যে সুযোগ পেয়েছিলেন তা নয়, প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হয়েছিলেন। অবশ্যই শাবানা শক্তিশালী অভিনেত্রী, আমার সহযোদ্ধা। আমার সঙ্গে আজও যোগাযোগ রয়েছে। তার প্রথম সন্তান জন্মের খবর শুনে আমি ফুল নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এমনিতেই অলিখিত দ্বন্দ্ব সব সময়ই ছিল। বরং আমি সিনেমার নোংরা রাজনীতিতে কখনোই জড়াইনি। আমি আমার কাজকে ফোকাস দিতাম।
অভিনয় করতে গিয়ে কি কখনো সত্যিকারের প্রেমে পড়েছিল সহশিল্পীর?
ববিতা: একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে প্রেম হতেই পারে- এটাই স্বাভাবিক। বরং না হওয়াটা অস্বাভাবিক বিষয়। আমি যে নায়কের সঙ্গেই অভিনয় করতাম, গণমাধ্যমে তাকে নিয়েই গুঞ্জন উঠতো। জাফর ইকবাল, সোহেল রানা, ফারুক- সবার সঙ্গেই আমার প্রেমের গুঞ্জন উঠেছিল। তখন আমাদের অল্প বয়স। একে-অন্যের প্রতি একতরফা অনুরাগ জমেছে। আমার আর জাফর ইকবালের মিডিয়ায় বানানো প্রেম তো ইতিহাস হয়ে আজও রয়ে গেছে। জাফর আমার ভালো বন্ধু- এটা ধ্রুবতারার মতো সত্য। এর বাইরে অন্য কিছু নয়।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শাবানা-ববিতা-কবরী হাইভোল্টের নায়িকা, একসঙ্গে খুব বেশি সিনেমায় অভিনয় করেননি কেন?
ববিতা: বোধহয় আমরা তিনজন প্রথম ও শেষ সোনার হরিণ নামে সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলাম। তবে আমি ও শাবানা ‘সোহাগ’ সিনেমায় অভিনয় করেছি। কবরীর সঙ্গে বেশকিছু কাজ হয়েছে তার মধ্যে- নওজোয়ান, রাজা সূর্য খাঁ অন্যতম।
‘বাঁদী থেকে বেগম’Ñ সিনেমাটিতে আপনার অভিনীত চরিত্রটি বাস্তব রূপ দিতে সেই সময় আপনি প্রখ্যাত নৃত্যগুরু গহর জামিল, রওশন জামিলের কাছে ক্ল্যাসিকাল নাচের তালিম নিয়েছিলেন; যা আজকালের অভিনেত্রীদের মধ্যে ডেডিকেশনের বিষয়টি দেখাই যায় না।
ববিতা: দারুণ একটি সিনেমার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। বিখ্যাত সিনে সাংবাদিক আহমেদ জামান খোকা ভাইয়ের গল্প ও চিত্রনাট্য ‘বাঁদী থেকে বেগম’ যে কিনা সকালে বাঁদী রাতে বেগমের রোল প্লে করছে। দারুণ গল্প। তখন আমি দারুণ ব্যস্ত সময় পার করছি। সিনেমায় ব্যস্ত শিডিউল। এর মাঝেই যখন সুযোগ পেতাম পুরান ঢাকায় স্বামীবাগ এলাকায় জাগো আর্ট একাডেমিতে গিয়ে নাচের প্রশিক্ষণ নিতাম। সিনেমাটি যখন রিলিজ হয়েছিল পর্দায় আমার ক্ল্যাসিকাল নাচ দেখে দর্শকরা সত্যিই মনে করতেন যে, ববিতা নৃত্যশিল্পী হিসেবেও দারুণ। শিল্পীর সদিচ্ছা এবং পরিচালকের সহযোগিতাতেই সেই সময়ের সিনেমাগুলো আজও ইতিহাস হয়ে রয়েছে।
আপনি কি মনে করেন আপনার আগেই সুচন্দা আপার একুশে পদক পাওয়া উচিত ছিল?
ববিতা: সত্যি বলতে আমারও কষ্ট লেগেছে সুচন্দা আপা এমন অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন, যেখানে একুশে পদক প্রাপ্তির তালিকায় অনেক আগেই তার নাম দেখার ইচ্ছা করতাম আমি। দেরিতে হলেও আমি পেয়েছি তাতেও সুচন্দা আপা দারুণ খুশি হয়েছেন। আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। উনার উৎসাহেই তো সিনেমায় এসেছি।
আপনার রাজনীতিতে বরাবরই অনাগ্রহ কেন?
ববিতা: শিল্পীর কাজ তো অভিনয় করা। হৃদয়ে মননে অভিনয় ঘিরেই চিন্তা-চেতনা। যার যে জায়গা সেই জায়গায় তার থাকা ভালো দেখায়। বিতর্কিত কোনো বিষয়ই আমি পছন্দ করি না। এই যে দেখেন ফেরদৌস, রিয়াজ আরও অনেক শিল্পী রয়েছেন, যারা সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে দেশছাড়া হয়েছেন। এটা কি হওয়া উচিত ছিল? আমরা বাঙালি সবাই রাজনৈতিকভাবে সচেতন। সবার প্রতিই আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। প্রতিবেশী দেশ ভারতে দেখেন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট বা জাতীয় ফিল্ম সেন্সর বোর্ড এসব প্রতিষ্ঠানে বড় পদে শর্মিলা ঠাকুরের মতো শিল্পীদের বসানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে আমলাদের বসানো হয়, আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি- উনারা অনেকেই অভিনয়ের বিষয়ে অভিজ্ঞ নয়। বিএফডিসি এখানে সুযোগ দিয়ে আমলাদের মহাপরিচালকের পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে সময় যত গড়িয়েছে চলচ্চিত্রে ধস নেমেছে। আমি এর সঙ্গে যুক্ত করতে চাই যে, আমাদের চলচ্চিত্রের অনেক রথী-মহারথীরাও এর জন্য দায়ী।
বর্তমান সরকারের নিকট আপনি বা আপনার প্রাণের জায়গা চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য কী প্রত্যাশা রাখেন?
ববিতা: সরকার তো সব সময়ই চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, অসুবিধা তো আমাদের মাঝেই রয়েছে। এফডিসিকে রাজনীতি করার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছি। শিল্পীরা তো সহজ-সরল হয়। এই সুযোগে তাদের অনেককেই সরকারি দল-বিরোধী দলের তকমা জুড়ে দেন।
চলচ্চিত্র শিল্পীকে এই করুণ দশা থেকে বাঁচাতে হলে ছোট-বড় প্রত্যেকটা সেক্টর থেকে সম্মিলিতভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিটি সরকারের মাঝেই একজন রাজ্জাক, সোহেল রানা, শাবানা, কবরী, ববিতার অনুরাগী রয়েছেন। তারাও চান আমাদের চলচ্চিত্র আবার প্রাণ ফিরে পাক। আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি- শিল্পীদের ভালোবাসে না- এমন লোক সারা পৃথিবীতে নেই।
আমি আমার পুরো চলচ্চিত্র পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ। আপনাদের সবার ভালোবাসায় আজ আমি সামান্য শিল্পী থেকে ববিতা হতে পেরেছি। যদি কখনো এফডিসিতে যাই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। আমার কৈশোর এবং তারুণ্য- এই আঙিনায় কেটেছে।
ফরিদা আখতার পপি ১৯৫৩ সালে বাগেরহাটে জন্ম। বাবা নিজামউদ্দিন আইয়ুব সরকারি কর্মকর্তা, মা জাহানারা বেগম চিকিৎসক। শৈশব-কৈশোর কেটেছে যশোরে সার্কিট হাউজের সামনে রাবেয়া মঞ্জিলে। তিন বোন, তিন ভাই। পরবর্তীতে বাগেরহাট থেকে ঢাকায় চলে আসেন গেন্ডারিয়াতে। সুচন্দার সিনেমায় যুক্ত হওয়ার সূত্র ধরে তাদের পরিবারের ঢাকায় চলে আসা। তিনি পড়াশোনা করেছেন যশোর দাউদ পাবলিক স্কুলে। ঢাকায় চলে আসার পর তিনি গেন্ডারিয়া মনিজা রহমান স্কুলে ভর্তি হন। চলচ্চিত্রে ধীরে ধীরে ব্যস্ত হওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জন সম্ভব হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগত চেষ্টায় নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন। ইংরেজিসহ বেশ কিছু বিদেশি ভাষায় তিনি দক্ষতা অর্জন করেন।
পর্দায় ববিতা সফল অভিনেত্রী, স্ত্রী এবং মা হিসেবে আপনি কতোটা সফল?
ববিতা: সত্যি বলতে বিয়েতে আমার ভীতি ছিল। এই অর্থে ভাবতাম যে আমাকে যে বিয়ে করবে সে হয়তো আমার যশ খ্যাতি এবং অর্থকে প্রাধান্য দেবে- তাই সংশয় কাজ করতো। আলম সাহেবের সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হলো তখন রাজ্জাক ভাই আমাকে সাহস জুগিয়েছিলেন বড় ভাইয়ের মতো।
বিয়ের পর আমার কোল জুড়ে আমার একমাত্র সন্তান অনিক এলো। পৃথিবী বদলে গেল, হয়ে উঠলাম মা। অভিনয়ের বাইরে আমার পুরো সত্ত্বা জুড়ে অনিক। সেই ছোট অনিক আজ বড় হয়েছে। যোগ্য সন্তান হিসেবে সে বেড়ে উঠেছে। কানাডায় উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সে তার কর্মজীবন শুরু করেছে। বছরের কিছুটা সময় আমি তার কাছে বেড়াতে যাই। সে কর্মব্যস্ত রুটিন থেকে সময় বের করে কানাডার নানা উল্লেখযোগ্য শহরে বেড়াতে নিয়ে যায়। মা হিসেবে আমিও তাকে তার পছন্দের রান্না করে খাওয়াই।
আজকাল একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে সিনেমা কিংবা নাটকে অভিনয় করে যশ-খ্যাতি অর্থ উপার্জন করে হঠাৎ করে ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে কেউ কেউ ধর্মীয় লেবাসে নিজেদের মেলে ধরছেন শুধু তাই নয়; তারা তাদের অতীতের অভিনয় পেশাকে গুনাহের কাজ মনে করছেন- এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
ববিতা: ধর্মের জায়গায় ধর্ম, পেশার জায়গায় পেশা। আমি আজও এ বিষয়টি বুঝতে পারিনি শিল্পীরা কি ধর্মের বাইরে! ধর্মের বিষয় তো একান্ত ব্যক্তিগত। ইবাদত গোপনীয়ভাবে পালন করতে হয়। এটা দেখানোর বিষয় নয়। যে পেশা আমাকে সমাজে সম্মান এনে দিয়েছে, মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে, তাকে কেন অশ্রদ্ধা করবো। আল্লাহ্ তো আপনার আমার ভালো কর্মের বিচার করবেন, পোশাকের নয়। আমি তো অনেক আগেই বড় হজ করেছি, কই আমি তো বলে বেড়াই না আমি হাজী। ধর্মীয় বিষয় তো আল্লাহ্ এবং তার বান্দার বিষয়। নিজ নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
আপনার সহশিল্পী ইলিয়াস কাঞ্চন অনেক সফল সিনেমায় আপনার জুটি। বর্তমানে অসুস্থ, তার সঙ্গে কি যোগাযোগ হয়?
ববিতা: কাঞ্চন শুধু ভালো অভিনেতাই নয়, ভালো মনের মানুষ। সে এখন জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। টেলিফোনে তার শারীরিক অবস্থার খবর নেই। অনেক দোয়া তার সুস্থতার জন্য। ওর সঙ্গে আমার একটি সফল ছবির সহশিল্পী সদ্যপ্রয়াত জাবেদের কথাও মনে পড়ে। আমাদের জুটির ‘নিশান’ সিনেমাটি একটি সময় সাড়া ফেলেছিল। জাবেদ একজন পেশাদারি অভিনেতা ছিলেন। নাচ, অ্যাকশন এবং অভিনয়ে খুব ভালো মানের মানুষ ছিলেন। দুঃখের বিষয় তার প্রতি সুবিচার করা হয়নি, সে-ও রাষ্ট্রীয় পুরস্কার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সে নিজের মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে বাংলাকে ভালোবেসে এদেশে চিরস্থায়ী হয়েছিলেন, তার মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনি।
বিরল দৃষ্টান্ত একই পরিবারে তিন বোন সিনেমার জনপ্রিয় তারকা এবং তিনজনই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। কেমন লাগে?
ববিতা: অবশ্যই। এ বিষয়টি আমাদের পরিবারের জন্য অনেক সম্মানের। আর এটা অর্জনের পেছনে অগণিত দর্শকদের ভালোবাসা রয়েছে। তারা যদি আমাদের সাপোর্ট না করতেন, এটা সম্ভব হতো না। পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সহযোগিতা ছিল আমাদের প্রতি। আমাদের চেষ্টা এবং প্রযোজক-পরিচালকদের সহযোগিতা তারা আমাদের কাজের প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন। আমরা সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পেরেছি।
কোনো দুঃখের স্মৃতি?
ববিতা: শুধু যে আনন্দের স্মৃতি রয়েছে তা নয়; দুঃখেরও স্মৃতি রয়েছে। অমর প্রেমের কাহিনী ‘লাইলী মজনু’ আমার আর রাজ্জাক ভাই অভিনীত, এই সিনেমাটি যাতে সেন্সর ছাড়পত্র না পায়, সেই সময় বিখ্যাত এক প্রোডাকশন হাউজের কর্ণধার সবার দুলাভাই সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন প্রশাসনের মাধ্যমে নকল অভিযোগ এনে। তিনি ভয় পেয়েছিলেন যদি ছবিটি রিলিজ হয় তাহলে রাজ্জাক, ববিতা জুটি জনপ্রিয়তা পেয়ে যাবে। তাতে সেই সময়ের আমার প্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয় আরেক অভিনেত্রী হুমকির মধ্যে পড়ে যাবেন। ওই প্রযোজক কিছুটা সফল হতে পেরেছিলেন। দীর্ঘদিন এই সিনেমাটি বক্সবন্দি হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে এ ছবির পরিচালক বোম্বে গিয়ে হিন্দি ‘লাইলী মজনু’র পরিচালকের কাছ থেকে কপিরাইট স্বত্ব কিনে এনেছিলেন। আমার সঙ্গে এমনও হয়েছে প্রযোজক-পরিচালক নতুন সিনেমার জন্য চুক্তি করতে এসেছেন, পথের মধ্যে তাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে সেই সময়ের আরেক জনপ্রিয় নায়িকার বাসায় নিয়ে চলে গেছেন আমার অজান্তে সেই দুলাভাই। এই কর্মটি তিনি খুব সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতেন। পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়িকা শবনম যাতে বাংলাদেশে সিনেমা করতে না পারেন সরকারি লেবেলে কলকাঠি নেড়েছিলেন। ওই সময় জনপ্রিয় সিনেমা পত্রিকা চিত্রালী পূর্বানীতে ফলাও করে প্রতিবেদন হয়েছিল। এখনো অভিনয় থেকে দূরে রয়েছি। অবসর সময় যখন একা থাকি, অতীতে আমাকে নিয়ে নোংরা সিনে পলিটিক্সের কথাগুলো মনে পড়ে যায়। আমি কোনোদিন কোনো সহশিল্পীর বিরুদ্ধাচরণ করিনি। এটা আমার ধাতে নেই। এসব করিনি বলেই সৃষ্টিকর্তা আমাকে অনেক সম্মানিত করেছেন। অনেক সুযোগ-সুবিধা ছিল বিদেশে স্থায়ী হওয়ার। কিন্তু আমি এদেশ, এদেশের মানুষের ভালোবাসাকে ফেলে কোনোদিনই যাবো না। এদেশের মাটিতেই আমি মিশে থাকতে চাই। অভিনয় করে আমি যে অর্থ উপার্জন করেছি, সেটা আমি প্রযোজক হিসেবে লগ্নি করেছি। কখনো সফল হয়েছি আবার কখনো ব্যর্থ হয়েছি। আবার অর্থ ফেরত পাইনি এমনও হয়েছে অনেক।
আপনার সমসাময়িক অভিনেত্রী অনেকেই পারিবারিক জীবনে শ্বশুর-শাশুড়ি, নানি-দাদি হয়েছেন। দর্শকরা কবে আপনাকে ওই জায়গায় দেখবেন?
ববিতা: অবশ্যই দেখবেন। সময় হলেই অনিকের জন্য ফুটফুটে একটি সুন্দর বউমা ঘরে তুলবো। আপনাদের সবার দোয়া চাই।
‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমায় সবচেয়ে সাহসী দৃশ্য ছিল আপনার এবং রাজ্জাকের চুম্বন দৃশ্য? আপনি এত সাহসী পদক্ষেপ কীভাবে নিয়েছিলেন?
ববিতা: গল্পের প্রয়োজনেই আমি এ দৃশ্যে অভিনয় করতে রাজি হই। বয়স কম তখন চিন্তার পরিধিও কম ছিল। তাই হুটহাট সিদ্ধান্ত। শুটিংয়ের পর সারা রাত কেঁদেছি আমি কেন এমন দৃশ্যে অংশ নিলাম। রাজ্জাক ভাই আমার কান্না দেখে ভড়কে গেলেন। পরিচালক কিন্তু আমাকে ফোর্স করেন নাই এমন দৃশ্য করতে। চুম্বনের দৃশ্যটি চিত্রনাট্যের ডিমান্ড ছিল। সেই সময় এমন দৃশ্যে অভিনয় করার ফলে পুরো ফিল্ম ইন্ড্রাস্টিতে হইচই ফেলে দিয়েছিল। চিত্রালী পূর্বানীতে ফলাও করে নিউজ করা হয়েছিল। হাসতে হাসতে বললেন, আমি পরবর্তীতে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম ছবি রিলিজ হলে এ দৃশ্য প্রদর্শিত হলে আমার আর বিয়ে হবে না। কিন্তু ‘অনন্ত প্রেম’ রিলিজের পর সারা দেশে আমাদের বাস্তবধর্মী অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়। পুরো সিনেমায় এই একমাত্র দৃশ্য ভূয়সী প্রশংসা হয়েছিল। এ ছবির একটি গান ‘এ চোখে চোখ পড়েছে’Ñ প্রেমিক-প্রেমিকাদের হৃদয়ে ঝড় তুলেছিল।
অভিনয়-অভিনেত্রীদের জীবনে সাফল্য-ব্যর্থতা পাশাপাশি চলে। আজ হিট কাল সুপার ফ্লপ। সিনেমা জগতটা খুব পিচ্ছিল একটি জায়গা, খুব হিসেব করে চলতে হয়। সামান্য ভুলে পুরো ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। একজন সফল অভিনেত্রী হতে হলে ব্যক্তিগতভাবে অনেক চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিতে হয়। এখন তো হিসেবের খেরো খাতা নিয়ে বসি। এত বছর অভিনয়ে পার করলাম ব্যর্থতার পাল্লা ভারি নাকি সাফল্যের- বেলা শেষে দেখি ববিতার সাফল্যের পাল্লাই ভারি। ব্যর্থতা সামান্য। অভিনয়কে পুঁজি করে এতদূর পথ চলেছি। সত্যি বলতে আঁচল ভরে শুধু সাফল্যই এসেছে। এক জীবনে এরচেয়ে আর কি চাওয়ার রয়েছে। Í

moinuddin naser
২ মাস আগেBabita is the icon of icons. Last time I saw her in New York. She is glamorous but in a very simplistic way like her cousin Nargis.