২০২৪ সালের ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসান হয়। এরপর দেশের নেতৃত্ব নির্ধারণে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় ঐতিহাসিক নির্বাচনে লাখো বাংলাদেশি তরুণ প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। দেশের ১২ কোটি ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী ভোটার প্রায় ৪৪ শতাংশ। তাদের অনেকেই বলছেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের কঠোর শাসনামলে তারা কখনো ভোট দেননি। হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ব্যাপক কারচুপি ও বিরোধী দলগুলোর ওপর দমনপীড়ন ও নিষেধাজ্ঞার অভিযোগে বিতর্কিত ছিল। ৩৩ বছর বয়সী ফয়জুল্লাহ ওয়াসিফ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা।
এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ভোট দেননি। কারণ তার মনে হয়েছিল এতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। তার ভাষায়, ভয় আর দুশ্চিন্তার কারণেই আমি যাইনি (ভোট দিতে)। আমার আগ্রহও ছিল না। তরুণ ভোটারদের এই জনমিতিক ঢেউ রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রচারকৌশল ও বার্তা পুনর্গঠনে বাধ্য করেছে। ডিজিটাল প্রচারণা এখন নির্বাচনী লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফেসবুক ভিডিও থেকে শুরু করে টিকটক রিল- অনলাইন প্রচারণায় দলগুলো বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এই নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে তার শাসনামলে দমনপীড়নের শিকার হওয়া দলগুলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের মিত্ররা এবং দেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আশফাহ বিনতে লতিফ বলেন, তার পিতামাতা তাকে হাসিনার আগের সময়ের নির্বাচনের গল্প শুনিয়েছেন, যখন ভোটের দিন ছিল উৎসবের মতো। লতিফ বলেন, এখন যেহেতু আমরা ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পেরেছি, আমি খুবই উচ্ছ্বসিত। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতাদের গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করেছে। লতিফ বলেন, তরুণ ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে তিনি আরও বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন।
তবে পরিবর্তনের আশায় তিনি এখনো আগ্রহী। তার ভাষায়, আমরা চেয়েছিলাম তরুণরাই আমাদের নেতৃত্ব দেবে। আর অনেক দিক থেকে তারা তা করেছে। তারা যদি ব্যর্থ হয়, তবে সেটি সব তরুণেরই ব্যর্থতা। ২০২৪ সালের অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী চাকরির সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করছিল। দেড় বছর পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং অনেক স্নাতক তরুণ তাদের প্রথম চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বাংলাদেশের নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলিম বলেন, তিনি তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি আশা করছেন। তিনি বলেন, এই তরুণ ভোটাররা তাদের বঞ্চনার অনুভূতি নিয়েই ভোটকেন্দ্রে যাবে এবং তারা ভোট দেবে। ৩৫০টি আসনের জন্য প্রায় ২০০০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তাদের মধ্যে প্রায় ১৪০০ জনই প্রথমবারের মতো প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬০০ জনের বেশি প্রার্থীর বয়স ৪৪ বা তার নিচে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা ওয়াসিফ মনে করেন, নতুন মুখগুলো বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তরুণদের ওপর আমাদের আস্থা অনেক এবং আমাদের প্রত্যাশাও অনেক। যেহেতু পরিবর্তন তরুণরাই এনেছে, আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও আমূল পরিবর্তন তাদের মাধ্যমেই আসবে। লতিফ আশা করেন, এই নির্বাচন আরও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের সূচনা করবে। এমন একটি সরকার, যারা ভিন্নমতকে শত্রু মনে করবে না, বরং তাদের সম্মান করবে।
