ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি এবং বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানি। এর আগে ইসরাইল দাবি করে, এই দুটি হত্যাকাণ্ড তারা পরিচালনা করেছে। এর জবাবে ইসরাইলে ভয়াবহ হামলা করেছে ইরান। তেল আবিবের কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। সেখানে তীব্র শার্পনেলের আঘাতে কমপক্ষে দু’জন নিহত হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
আইআরজিসি বলেছে, তেল আবিবে হামলা ছিল লারিজানিকে হত্যার প্রতিশোধ। ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের কেন্দ্রস্থলে ১০০টিরও বেশি সামরিক ও নিরাপত্তা লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। ফার্স নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করে, ইসরাইলের বহুস্তরীয় ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার কারণেই এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে। আইআরজিসি জানায়, প্রতিশোধমূলক এই হামলায় তারা খোররামশাহর-৪, কাদর, এমাদ এবং খাইবারশেকান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
ইসরাইলের জরুরি সেবা বিভাগ বলেছে- তেল আবিব জেলার রামাত গান এলাকায় পতিত শার্পনেলের আঘাতে একজন পুরুষ ও একজন নারী নিহত হয়েছে। রাজধানী তেহরান থেকে সাংবাদিক আলি হাসেম জানান- ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সূত্রে বলা হয়েছে, আলি লারিজানির সঙ্গে নিহত হয়েছেন তার ছেলে মোর্তেজা এবং এক সহকারী। এছাড়া বাসিজ প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানিকেও লক্ষ্য করে আরেকটি হামলা চালানো হয়। এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন ইরানি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ একাধিক বিবৃতি দিয়েছেন।
আল জাজিরাকে দেয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ফলে প্রশাসনিক কোনো পরিবর্তন আসবে না এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাও নড়বড়ে হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে এমনকি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সুপ্রিম লিডারের মৃত্যুও এই ব্যবস্থাকে টলাতে পারেনি। কারণ এটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। তেহরানে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমনই প্রতিক্রিয়া শোনা যাচ্ছে। তবে এখন সবাই অপেক্ষা করছে আলি লারিজানির স্থলাভিষিক্ত কে হবেন? প্রোটোকল অনুযায়ী কি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দ্বিতীয় প্রতিনিধি সাঈদ জালিলি দায়িত্ব নেবেন? নাকি নতুন ইরানি সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি নতুন কাউকে নিয়োগ দেবেন?
ইরানের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সাঈদ জালিলি নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ও বাসিজ কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা তাসনিমকে তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড ইসলামি বিপ্লবের লক্ষ্যে ‘গৌরবময় আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতা’। তিনি দাবি করেন, এসব হত্যাকাণ্ড ইরানিদের আরও দৃঢ় করবে এবং শত্রুর পরাজয় ও অপমানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। অন্যদিকে, লারিজানিকে একজন ‘বিপ্লবী’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলি আকবর ভেলায়াতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অপরাধমূলক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। সতর্ক করে বলেন- তারা ভুল হিসাব করছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, লারিজানিকে হত্যার মাধ্যমে ইসরাইল কৌশলগতভাবে সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইছে। তিনি বলেন, ইসরাইল এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ সম্ভব চালিয়ে যেতে চায়। তারা ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে- নেতানিয়াহু নিজেও- যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করেছে। এখন যখন তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে, তারা নিশ্চিত করতে চাইবে যেন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে আগেভাগে যুদ্ধ শেষ না করে। তাই তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে। এই হত্যাকাণ্ডগুলো সেই পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইসরাইল ইরানকে বহু দশক পিছিয়ে দিতে চাইছে এবং সেখানে ভবিষ্যতে কেমন সরকার আসবে, তা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
তার ভাষায়, তাদের লক্ষ্য হলো ইসরাইল যেন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে থাকতে পারে, সেই পথে ইরান কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে না পারে। তাদের দৃষ্টিতে, এই লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে কৌশলগত কোনো সাফল্য পাচ্ছে না। ত্রিতা পার্সি আরও বলেন, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে লারিজানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তিনি সরাসরি সিদ্ধান্তগ্রহণকারী না হলেও, পুরো ব্যবস্থায় ঐকমত্য তৈরির প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি জানান, গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকেই ইরানি নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ সব পদে বিকল্প প্রস্তুত রেখেছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, ইসরাইল এই ধরনের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারে।
তার মতে, এই হত্যাকাণ্ড ইরানের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতায় বড় প্রভাব ফেলবে না। বরং এটি ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথকে কঠিন করে তুলবে। কারণ আলোচনার জন্য এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন, যারা পুরো ইরানি ব্যবস্থাকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে পারেন। তিনি বলেন, এই ধরনের ব্যক্তিরাই ইসরাইলি হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্য হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সুযোগ নষ্ট করা হোক বা না হোক- এটাই এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম বড় ফলাফল।
