মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মধ্যেও বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মধ্যেও বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি

ফন্ট সাইজ:

কয়েক মাস কমার পর আবারো বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। ইতিমধ্যেই ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। তবে এর মধ্যেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পরিমাণ ৬ হাজার ৬৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বেশি ছিল। অর্থাৎ গত বছরের ৩০শে জুন শেষ হওয়া ওই আর্থিক বছরে (২০২৪ সালের ১লা জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০শে জুন) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ঋণাত্মক বা নেগেটিভ (-)। অর্থাৎ গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো ঋণ পায়নি সরকার; উল্টো ওই পরিমাণ অর্থ কোষাগার থেকে অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের শোধ করতে হয়েছিল সরকারকে। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছর নয়, গত তিন অর্থবছর ধরে সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো ঋণ পাচ্ছিল না সরকার। অথচ বাজেট ঘাটতি মেটাতে বরাবরই এ খাতে মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের গড়পড়তা আয় কমে গেছে; ফলে সঞ্চয় করতে পারছে না। অন্যদিকে সুদের হার হ্রাস ও নানা কড়াকড়ির কারণেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল। এসব কারণেই আগের দুই অর্থবছরের (২০২২-২৩ ও ২-২৩-২৪) মতো গত অর্থবছরেও (২০২৪-২৫) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক (-) হয়েছিল। তবে পাল্টে গেছে সেই চিত্র। দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পরও সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ছে। যার ফলে এই খাত থেকে সরকার ঋণও পাচ্ছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সঞ্চয়পত্র বিক্রির হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, গত বছরের ১লা জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সপ্তম মাস জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৫১ কোটি ৩ লাখ টাকা ধনাত্মক (+)। অর্থাৎ এই মাসে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল গ্রাহকদের পরিশোধের পরও ১ হাজার ৮৫১ কোটি ৩ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা ছিল। এই টাকা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য খাতে খরচ করতে পেরেছে সরকার। অথচ গত বছরের জানুয়ারিতে নিট বিক্রি ৪ হাজার ৭৬৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ঋণাত্মক (-) ছিল। অর্থাৎ ওই মাসে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল, তার থেকে ৪ হাজার ৭৬৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বেশি গ্রাহকদের সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছিল। অর্থাৎ ওই পরিমাণ অর্থ কোষাগার থেকে অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শোধ করতে হয়েছিল সরকারকে। ডিসেম্বরে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩৮৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ধনাত্মক (+)। আগের মাস নভেম্বরে অবশ্য নিট বিক্রি ২৯৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঋণাত্মক বা নেগেটিভ (-) ছিল। অক্টোবরে নিট বিক্রি ছিল ৪২৪ কোটি ৮ লাখ টাকা ধনাত্মক (+)। সেপ্টেম্বর ও আগস্টে ছিল যথাক্রমে ৩৭৩ কোটি ৩৮ লাখ ও ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা ধনাত্মক (+)। সবমিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬১০ কোটি টাকা ধনাত্মক (+)। অর্থাৎ এই সাত মাসে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগ আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পরও ৬১০ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা ছিল।
অথচ গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই বিক্রি ৭ হাজার ১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা ঋণাত্মক (-) ছিল। তার মানে, ওই সাত মাসে ৭ হাজার ১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা কোষাগার থেকে গ্রাহকদের সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করেছিল সরকার।
আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল গ্রাহকদের পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাহলে বলা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৬১০ কোটি টাকা ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ নিতে পেরেছে। দেশের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা রাখে ব্যাংকে। তারপর নিরাপত্তা ও অধিক মুনাফার আশায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ বলা হয়ে থাকে।
মূল্যস্ফীতির পারদ আরও চড়েছে; ছাড়িয়েছে ৯ শতাংশ। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারিতেও বেড়েছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই সূচক। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম এবং ২০২৬ সালের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। ৯ মাস পর মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশের ঘরে গেল। গত বছরের মে মাসে ৯ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। এর পর থেকে এই সূচক ৯ শতাংশের নিচেই ছিল। গত বছরের এপ্রিলে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। জুনে এই হার ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে কেন- জানতে চাইলে অর্থনীতির গবেষক বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এ কথা ঠিক যে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সঞ্চয় প্রবণতা কমে গেছে। তাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমার কথা। কিন্তু না কমে, উল্টো বাড়ছে। এর কারণ হচ্ছে- মানুষ এখন ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ বিনিয়োগ খুঁজছে। যার কাছে যতটুকু সঞ্চয় আছে তা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনছে। তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুরবস্থার কথা আমরা সবাই জানি ও দেখছি। দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে মন্দা চলছে। তাই সবাই এখন তাদের জমানো টাকা ব্যাংকে রাখছে না। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছে না। সব টাকাই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। তুলনামূলকভাবে এখনো সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বেশি। তাই সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে সবাই সঞ্চয়পত্র কিনছেন বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন