প্রথম ধাপে ১০৫০টি ইউনিয়নে ভোট, জানুয়ারি ঘিরে পরিকল্পনা

ফন্ট সাইজ:

দেশের তৃণমূলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সামনে রেখে আগামী ২১শে জানুয়ারিকে লক্ষ্য ধরে বড় ধরনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম ধাপে প্রায় ১ হাজার ৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করছে কমিশন। পর্যায়ক্রমে প্রথম দুই ধাপেই সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের সিংহভাগ নির্বাচন শেষ করতে চায় ইসি। শুধু নির্বাচনের সময়সূচি নয়, ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবস্থাপনাতেও আসছে পরিবর্তন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকেই শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ ভোটার ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা করছে কমিশন। পাশাপাশি ভোটার নিবন্ধন ফরমে যুক্ত হতে পারে পারিবারিক পরিচিতি বা ‘ফ্যামিলি ট্রি’। এতে একজন ভোটারের বাবা-মায়ের পরিচয়ের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্যও সংরক্ষিত থাকবে।

রোববার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব পরিকল্পনার কথা জানান ইসি’র সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, একই উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদে একসঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী সরঞ্জাম ব্যবহারে সুবিধা হবে বলে মনে করছে ইসি।

গত ১২ই অক্টোবর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১শে জানুয়ারি প্রথম ধাপ, ৪ঠা ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯শে এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ই মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭শে মে পঞ্চম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, আগামী ২৭শে মের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হবে। আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০’র মতো ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদপূর্ণ হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী এই ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচন ২০২৭ সালের মে মাসের ২৭ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন হবে।

প্রথম দুই ধাপেই সিংহভাগ নির্বাচন: দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া এবং নির্বাচনী সময়সীমার মধ্যে চলে আসা ইউনিয়নগুলোতে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজন করতে চায় কমিশন। প্রথম ধাপে প্রায় ১ হাজার ৫০টি ইউনিয়ন পরিষদকে নির্বাচনের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। প্রাথমিক তালিকা মাঠপর্যায়ে যাচাই বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবারের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত করার আশা করছে কমিশন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নির্বাচনের ধাপ নির্ধারণে শুধু আইনগত সময়সীমা বিবেচনা করা হচ্ছে না। আবহাওয়া, উপকূলীয় এলাকার পরিস্থিতি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নির্বাচনী সরঞ্জামের প্রাপ্যতাও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। প্রথম দুই ধাপেই ইউনিয়ন পরিষদের সিংহভাগ নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলোতে নির্বাচনের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমবে।

একই উপজেলার সব ইউনিয়নে একসঙ্গে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বা নির্বাচনী সময়সীমার মধ্যে চলে এলে ওই উপজেলার সব ইউনিয়নে একই সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের চিন্তা রয়েছে। এতে প্রশাসনিক ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। তবে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতাও রয়েছে। কয়েকটি ইউনিয়নে মামলা ও সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধ থাকায় সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কমিশন। এসব ইউনিয়নের তথ্য যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কারণে কোনো ইউনিয়ন নির্বাচনের আওতায় এলে সেটিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব। অর্থাৎ আসন্ন ইউপি নির্বাচনে প্রচলিত ব্যালট পদ্ধতিতেই ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। এ লক্ষ্যে নির্বাচনী সামগ্রীর মজুত পর্যালোচনার পাশাপাশি তিন ধরনের ব্যালট পেপার ছাপানোর প্রস্তুতিও চলছে। সরকারি বিজি প্রেস ও সিকিউরিটি প্রেসের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছে ইসি। তবে ইভিএমের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। কমিশনের গুদামে থাকা এসব যন্ত্রের সংখ্যা ও বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ে চূড়ান্ত স্টক টেকিং শুরু হয়েছে। এজন্য গঠিত কমিটি কাজ করছে। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর ইভিএমগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এক্ষেত্রে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পরিবেশগত উদ্বেগ। ইভিএমের ব্যাটারিতে থাকা উপাদানের কারণে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই শুধু যন্ত্রগুলোর সংখ্যা নির্ধারণ নয়, পরিবেশবান্ধব উপায়ে সেগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, সেটিও পর্যালোচনা করছে কমিশন। ইভিএম সংরক্ষণে ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নে সচিব জানান, বিষয়টি নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।

ছয় বছর বয়স থেকেই ভোটার ডাটাবেজের তথ্য!
ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে এবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়ার কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভোটার হওয়ার বয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন নাগরিকের মৌলিক তথ্য কমিশনের ডাটাবেজে যুক্ত হতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় দেয়া তথ্য সংগ্রহ করে তা ভবিষ্যৎ ভোটার নিবন্ধনের কাজে ব্যবহারের চিন্তা করছে ইসি। ইসি সচিব জানান, ছয় বছর বয়স থেকেই এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় জন্মনিবন্ধন সনদে যে তথ্য দেয়া হয়, তা সংগ্রহ করে ডাটাবেজের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে পরবর্তী সময়ে ভোটার নিবন্ধনের সময় তথ্য যাচাই সহজ হবে। এতে বয়স, জন্মতারিখ ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের অসঙ্গতি কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কমিশন। এ ছাড়া ভোটার নিবন্ধন ফরম ও সফটওয়্যারে পারিবারিক তথ্য বা ‘ফ্যামিলি ট্রি’ যুক্ত করার কাজ চলছে। একজন ব্যক্তি বাবা-মায়ের কতোতম সন্তান, তার বড় ভাই বা বোনের নিবন্ধন নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ভোটারদের পাশাপাশি পুরনো ভোটারদের তথ্য নবায়নের সময়ও এসব তথ্য নেয়ার চিন্তা করছে কমিশন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাইয়ে পরিবারের সদস্যদের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পরিচয়সংক্রান্ত জালিয়াতি ও তথ্যের অসঙ্গতি শনাক্ত করাও সহজ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এনআইডি সংশোধনে বয়স কমানোর আবেদন!
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন নিয়ে ভোগান্তি ও জটিলতার বিষয়টিও সামনে এনেছেন ইসি সচিব। বিশেষ করে জন্মতারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক আবেদন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আবেদনকারীদের সঠিক ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় একই তথ্য সংশোধনের আবেদন একাধিক পর্যায়ে নাকচ হয়। এতে আবেদনকারীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অথচ প্রয়োজনীয় নথি ও সঠিক তথ্য দেয়া হলে অনেক সংশোধন সহজেই করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে একটি আবেদনের উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হওয়া এক নারী জন্মসাল ১৯৯৭ থেকে পরিবর্তন করে ২০০২ করার আবেদন করেছেন। এতে তার বয়স ১৮ বছর থেকে কমে ১৩ বছরে নেমে আসে। এ ধরনের সংশোধন আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে নাম বা জন্মতারিখে টাইপজনিত ভুল, অক্ষর কিংবা সংখ্যার স্থানবদলের মতো বিষয় যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু বাবা-মায়ের নাম কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবর্তনে গ্রহণযোগ্য নথি প্রয়োজন। ইসি সচিবের বক্তব্য, সঠিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করা যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় ডাটাবেজের নির্ভরযোগ্যতা রক্ষা করাও কমিশনের দায়িত্ব।

জাতীয় পরিচয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে- এমন ধারণাও সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব। স্মার্টকার্ড বিতরণে সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো সব ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্রও বৈধ রয়েছে। তিনি জানান, কার্ডের ১০ সংখ্যার নম্বরের মাধ্যমে ডাটাবেজ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য যাচাই করা যায়। ফলে স্মার্টকার্ড না থাকলেও লেমিনেটেড এনআইডি ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। সবমিলিয়ে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে একদিকে ভোটের মাঠের প্রস্তুতি, অন্যদিকে ভোটার তথ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের যাচাই, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।