ইরানের স্থলপথের সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করতে একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই লক্ষ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) একটি নতুন টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোতে চলমান মার্কিন নৌ অবরোধ আরও সম্প্রসারিত করা হলো। সেন্টকম শনিবার এ তথ্য প্রকাশ করে। তারা জানায়, ইরান যেন স্থলপথ ব্যবহার করে উন্নত অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরিবহন করতে না পারে, সেজন্য এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইসরাইলের সাথে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আট মাসেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপ সামনে এলো।
‘টাস্কফোর্স আয়রন গেট’: ফ্লোরিডার টাম্পাভিত্তিক এই টাস্কফোর্সের নাম দেয়া হয়েছে ‘টাস্কফোর্স আয়রন গেট’। সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, এটি সমুদ্রে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবরোধের সাফল্যকে আরও জোরদার করবে। এই টাস্কফোর্স মার্কিন সরকারের অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে। তারা ইরানের স্থল সীমান্ত এবং কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত উপাদান এবং অবৈধ আয়ের প্রবাহ বন্ধ করতে নজরদারি চালাবে। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সাবেক মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় জানান, এই টাস্কফোর্সের কাজ হবে অস্ত্র কোথা থেকে আসছে এবং কীভাবে তা আটকানো যায় তা খুঁজে বের করা। তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যদি যুদ্ধ সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন, তবে মূলত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হতে পারে।
পৃথক এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে ওমান উপসাগরে এম/ভি হুদা নামের একটি বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজ অকেজো করে দেয়া হয়েছে। সেন্টকম বাহিনী জাহাজটির ক্রুদের নির্দিষ্ট স্থানগুলো ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়ার পর মার্কিন সামরিক বিমান সেটিতে আঘাত করে। জুলাই থেকে মার্কিন বাহিনী ১৪৭টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং নির্দেশ অমান্য করায় পাঁচটি জাহাজ অকেজো করেছে।
শনিবার ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপে দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর প্রকাশ করে। জাস্ক, সিরিক এবং বন্দর আব্বাস শহরেও কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর একদিন আগে ট্রাম্প কেশম দ্বীপে নতুন হামলার কথা নিশ্চিত করলেও সেগুলোকে ছোটখাটো হামলা বলে উল্লেখ করেন। কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলার মাঝে ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরান এখনো একটি চুক্তি করতে চায়। অন্যদিকে ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী জানায়, শনিবার হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি তেলের ট্যাংকার মাইন বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে যায়, মার্কিন নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ইরান অন্তত ২ বিলিয়ন ডলারের ( প্রায় ২৪ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা) হার্ডওয়্যার, বিস্ফোরক এবং ভারী ট্রাক আমদানি করেছে। কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়া থেকে কার্গো জাহাজে, মধ্য এশিয়া থেকে ট্রাকে এবং চীন থেকে মালবাহী বিমানে করে এসব সরঞ্জাম ইরানে প্রবেশ করেছে। তবে সেন্টকমের হিসাব অনুযায়ী, তাদের নৌ অবরোধের কারণে ইরান ২৫ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা) বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এত কিছুর পরও ইরান নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বিপর্যয় এবং ডেমোক্রেট দলের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর ইরান উল্লাস প্রকাশ করে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই নির্বাচনি বিপর্যয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুদ্ধ নতুন করে জ্বলে ওঠার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত অবসানে মধ্যস্থতাকারীরা তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করেছেন। রয়টার্স জানায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে যে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালালেও তেহরানের আলোচনার অবস্থানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না এবং তাদের সরকারের পতন ঘটবে না।
