সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা করেন না এলপিজি বিক্রেতারা

সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা করেন না এলপিজি বিক্রেতারা

ফন্ট সাইজ:

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি)-এর বাজারে অস্থিরতা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে দাম। তার ওপর সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এছাড়া ১২ কেজি’র সিলিন্ডার আগে থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি করে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। এলপিজি আমদানির পরিমাণ চাহিদা অনুযায়ী থাকলেও বাড়তি দামে বিক্রির অজুহাত দেখানো হয় সরবরাহ সংকটের। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে খুচরা ক্রেতারা। স্থানীয় বাজারে দোকানিরা যে যেভাবে পারছেন পকেট কাটছে ক্রেতাদের। সর্বশেষ গত ২রা নভেম্বর এলপিজি’র দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিইআরসি। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২০৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত ৪ঠা অক্টোবর একই পরিমাণ সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল।

দফায় দফায় এই দাম বৃদ্ধির ফলে বিপাকে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই। এখন পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে ২২০০ থেকে ২৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বিক্রেতারা বাড়তি দামের বিষয়টি অস্বীকার করছেন। ঢাকার একাধিক এলাকার গ্যাসের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব চিত্র দেখা গেছে। ক্রেতারা জানান, সমপ্রতি সরকার নির্ধারিত দামেও তারা কিনতে পারছেন না সিলিন্ডার। এর আগে সিলিন্ডারের দাম দুই হাজার টাকার গণ্ডি না পেরুলেও তারা ২২০০ টাকার বেশি দিয়ে কিনেছেন। এবার ফের দাম বাড়ানোর পর অনেক দোকানেই উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে সিলিন্ডার। দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন, আর ব্যবহৃত এলপিজি’র ৮০ শতাংশ যায় রান্নায়। ২০১৫ সাল থেকে বাসাবাড়িতে নতুন পাইপলাইনের গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রয়েছে। কয়েক মাস আগে পাইপলাইনের গ্যাসে সংকট দেখা দিলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অনেক পরিবার সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন আছিয়া আক্তার।

তিনি বলেন, গত ১ তারিখ আমি ইউনিগ্যাসের ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনেছি ২৩৫০ টাকা দিয়ে। একদিন পরই সরকার আবার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। লালবাগ এলাকার বাসিন্দা হাসনাত আহমেদ জানান, তিনি ১২ কেজি’র সিলিন্ডার কিনেছেন ২২৫০ টাকা দিয়ে। এরমধ্যে ডেলিভারি চার্জও রয়েছে। নিয়মিত সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করেন মগবাজার এলাকার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সাকিব। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কয়েকমাস আগে সিলিন্ডারের দাম অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু আমরাতো সরকারের দামে গ্যাস পাই না। এখন যা কমেছে তাতেও কয়েকশ’ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়। মগবাজার এলাকার আরেক বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, লাইনের গ্যাস সংকটের পর থেকে সিলিন্ডার ব্যবহার করা শুরু করি। মঙ্গলবার সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ২৬০০ টাকা দিয়ে। পরে অন্য জায়গায় যাচাই করে দেখি আরও ১০০ টাকা কমে কেনা যাচ্ছে।

এদিকে, ব্যবসায়ীরা জানান, তারা সরকারের বর্তমান নির্ধারিত দামেই বিক্রি করছেন। তবে শুধুমাত্র ক্রেতা সেজে কথা বললে বাড়তি দামে বিক্রি বিষয়ে সত্যতা পাওয়া যায়। আগ থেকে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি না করার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের কিনতেই হয় নির্ধারিত বিক্রয় মূল্যের চেয়ে বেশী দিয়ে। তার উপর চাহিদা অনুযায়ী তারা গ্যাস পান না। তেজগাঁও এলাকার জুয়েল এন্ড ব্রাদার্সের বিক্রেতা দীপক মজুমদার বলেন, গত দশ দিন আগে এক গাড়ি গ্যাস আমরা পেয়েছিলাম। সাত দিন আগে ওই গাড়ি পাঠিয়েছি। এখনও গাড়ি আসেনি। সমপ্রতি দাম বাড়ানোর আগেই গ্যাস বিক্রি করা হয়েছে প্রতি ১২ কেজি’র সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকায়। এবার গ্যাস নিয়ে গাড়ি এলে কমপক্ষে ২ হাজার ৪শ’ টাকায় বিক্রি করতে হবে।
হাতিরঝিলের প্রবেশমুখে ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিবেশক আহমেদ এন্টারপ্রাইজ।

ওই দোকানের বিক্রেতা আব্দুল লতিফ রেজা বলেন, এখন আমরা ঠিক সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে সামান্য অর্থাৎ ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতে পারছি। শুধুমাত্র ওমেরা ও যমুনা গ্যাসের সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। তবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গ্যাসে হলে আরও দুই থেকে ৩শ’ টাকা বেশিতে বিক্রি করতে হয়। মগবাজার এলাকার এসএইচ এন্টারপ্রাইজের একজন কর্মচারী জানান, তারা নির্দিষ্ট কোম্পানির গ্যাস কিনতে খরচ হয় ২২৫০ টাকা। আর বিক্রি করতে হলে কমপক্ষে ২০০ টাকা বেশিতে বিক্রি করতে হয়। ওই দোকানের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, ‘আমরা সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করছি। ২১০০ টাকার বেশি রাখছি না।

তবে বাসায় সিলিন্ডার পৌঁছে দিতে হলে আরও কিছু টাকা বেশি নিতে হয়’। গত ৫ই অক্টোবর একই বিক্রেতা ১২ কেজি সিলিন্ডার ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানিয়েছিলেন। বাজারে এলপিজি’র সংকটের কথা বলা হলেও আমদানির চিত্র থেকে জানা যায়, চাহিদার তুলনায় বরং বাড়তি এলপি গ্যাস আমদানি হয়েছে। গত আগস্টে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, সেপ্টেম্বরে এক লাখ ৫৮ হাজার টন এবং অক্টোবরেও প্রায় সমপরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে। দেশে প্রতি মাসে এলপিজি’র চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন।
বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, অন্তত তিনটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছে বলে প্রমাণ এসেছে। তবে এসব কোম্পানি সরাসরি আমদানি না করে অন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিনে বোতলজাত করছে।