সম্মিলিত দায়িত্ববোধের প্রত্যয়ে আনসার-ভিডিপিতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন

সম্মিলিত দায়িত্ববোধের প্রত্যয়ে আনসার-ভিডিপিতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন

ফন্ট সাইজ:

জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেতনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। দিবসটি উপলক্ষ্যে বাহিনীর সদর দপ্তরসহ সারাদেশে সকল ইউনিটে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এ উপলক্ষ্যে সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী পাঠ, দরবার এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। দরবার অনুষ্ঠানে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জাতীয় জীবনে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন এবং বাহিনীর উন্নয়ন, সদস্যকল্যাণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

মহাপরিচালক বলেন, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা এবং সম্মিলিত আত্মজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার প্রত্যয় থেকে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার সম্মিলিত সংহতির প্রকাশ ঘটেছিল। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার যে দৃঢ় প্রত্যয় এবং জাতীয় ঐক্যের চেতনা বিকশিত হয়েছিল, তা জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে। ঐতিহাসিক এ দিবসের অন্যতম শিক্ষা হলো, জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যেকোনো সংকট ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনে গড়ে ওঠা সেই সংহতির চেতনা এবং শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সূচিত গণতান্ত্রিক উত্তরণ আমাদের জাতীয় জীবনে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে নবজীবন দিয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘পিপলস ওয়ারফেয়ার ডকট্রিন’ বা গণপ্রতিরক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি) জনগণের অংশগ্রহণমূলক প্রতিরক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাঠামো। এ দর্শনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রায় ৬০ লাখ সদস্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নগরজীবন পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা, দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। ফলে বাহিনীর ভূমিকা কেবল নিরাপত্তা দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আত্মকর্মসংস্থান, আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক রূপান্তরেও বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করছে।

বাহিনীর উন্নয়ন ও সদস্যকল্যাণ প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে-বিদেশে বাহিনীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সুনাম অর্জন করছে, যার মাধ্যমে সদস্যদের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে ভিডিপি সদস্যদের জীবনমান উন্নয়ন, আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দূরদর্শী উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ব্যাংকটির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ও কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ভূমিকা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। এ সময় বাহিনীর ভিত্তি সুসংহতকরণ ও ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।

৭ নভেম্বরের জাতীয় ঐক্য ও সংহতির চেতনা এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রত্যয়কে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, জাতীয় স্বার্থ, জননিরাপত্তা ও জনকল্যাণই হতে হবে সকল কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, নাশকতা ও উসকানি প্রতিহত করে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের নিরপেক্ষতা, সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মহাপরিচালক আনসার-ভিডিপি সদস্যদের জীবন ও কর্মপরিকল্পনাকে ‘কমপ্লিট প্যাকেজ অব লাইফ’হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আত্মোৎসর্গ, কর্মনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, দক্ষতা অর্জন ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা- এসবের সমন্বয়েই একজন সদস্যের পরিপূর্ণ জীবন গড়ে ওঠে। বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, আর্থিক সহযোগিতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সমন্বিত জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ দর্শনের মূল লক্ষ্য। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করলে ব্যক্তি, পরিবার, বাহিনী ও রাষ্ট্র—সকল পর্যায়েই তার ইতিবাচক সুফল প্রতিফলিত হবে।

পরিশেষে মহাপরিচালক যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও জাতীয় গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে একটি আধুনিক, দক্ষ, জনবান্ধব ও মানবিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শৃঙ্খলাবোধ, আনুগত্য, দেশপ্রেম, সততা ও আত্মত্যাগের চেতনায় উজ্জীবিত থেকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনূর রশীদসহ সদর দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বাহিনীর সদস্য-সদস্যাগণ উপস্থিত ছিলেন।