মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভরত পোশাকশ্রমিকদের বিরুদ্ধে পুলিশকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি এসব আহ্বান জানায় এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভরত হাজারো পোশাকশ্রমিককে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। এদিকে বিক্ষোভ চলাকালে অগ্নিসংযোগ, কারখানায় ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব সহিংসতায় কারখানার মালিকপক্ষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, পুলিশ কেবল প্রয়োজন হলেই বলপ্রয়োগ করবে এবং সেই বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হবে না। পাশাপাশি সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
প্রতিবেদনে ৩ নভেম্বর তৌফিক হোসেন নামের এক পোশাকশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। তার এক সহকর্মী এইচআরডব্লিউকে বলেন, ‘দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা কারখানায় ফিরছিলাম। এ সময় তৌফিক বিক্ষোভরত শ্রমিক এবং বিক্ষোভ দমনের জন্য অন্য একটি পোশাক কারখানা থেকে ভাড়া করে আনা লোকজনের মাঝে পড়ে যান। পেছনে ফিরে দেখি, তৌফিক মাটিতে পড়ে আছেন। ভাড়া করে আনা লোকজন তাকে নির্মমভাবে পিটিয়েছিল।’
আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকেরা মাসিক ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করছেন। ২০২৩ সালে তাদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ১ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
বোর্ড জানিয়েছে, নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর করা হবে। একজন ৩১ বছর বয়সী সেলাই মেশিন অপারেটর নিজের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার বাসাভাড়া ৬ হাজার টাকা। রান্নার গ্যাসের দাম এখন ২ হাজার ৩০০ টাকা। আমি মাসে বেতন পাই ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। এ বছর সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য আমার নেই। বলুন তো, খাবারের জন্য আর কত টাকা থাকে?’
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরির যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় না নিয়ে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে উসকানি দেয়ার জন্য রাজনৈতিক বিরোধীদের দায়ী করছে।
গত ৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছিল, নাশকতার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩৩ জন সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির যুব সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া ৩ নভেম্বর আশুলিয়ায় তিনজন শ্রমিকনেতাকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উসকানি দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে হাজারো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তির ২৮ বছর বয়সী স্ত্রী এইচআরডব্লিউকে বলেন, ‘তারা আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। সে অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল। কোনো ধরনের সহিংসতায় সে জড়িত ছিল না।’
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমনীতি ও মজুরি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ ছাড়া গত এপ্রিলে গৃহীত শ্রম আইনের একটি সংশোধনীতে প্রতি তিন বছর পরপর মজুরি পর্যালোচনার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। একই সংশোধনীতে ট্রেড ইউনিয়নের সংগঠকদের কালো তালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, মজুরি নিয়ে আলোচনা ও দর-কষাকষিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং দায়মুক্তির যে চক্র তৈরি হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি করার সময় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, চুক্তির শর্ত যেন কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনে উৎসাহ না জোগায়। একই সঙ্গে চুক্তির কারণে যেন শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি দেওয়া অসম্ভব হয়ে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিক্ষোভরত পোশাকশ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ নয়, পুলিশের প্রতি এইচআরডব্লিউ'র বার্তা
মানবজমিন ডেস্ক
বিশ্বজমিন
১ ঘন্টা আগে
৬ নভেম্বর (শুক্রবার), ২০২৬, ১২ঃ৩৭ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
