মধ্যবর্তী নির্বাচনে দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানদের সাফল্য

প্রতিনিধিত্ব থেকে রাজনৈতিক প্রভাব

মধ্যবর্তী নির্বাচনে দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানদের সাফল্য

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীরা কংগ্রেস, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করেছেন।

ভারতীয়-আমেরিকান ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেস নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন, পাকিস্তানি-আমেরিকান প্রার্থীরা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব শক্তিশালী করেছেন এবং বাংলাদেশি-আমেরিকান রাজনীতিকরা জর্জিয়া ও কানেকটিকাটে তাদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে ওহাইওর গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান বিবেক রামাস্বামীর পরাজয় দেখিয়েছে, জাতিগত পরিচিতি কিংবা জাতীয় পর্যায়ের পরিচিতি সব সময় নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত করে না।
এই ফলাফল কমিউনিটিভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থেকে মার্কিন জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানদের ক্রমবর্ধমান সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন।

কংগ্রেস নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নতুন সাফল্য এসেছে ফ্লোরিডা থেকে। সেখানে ভারতীয় আমেরিকান ডেমোক্র্যাট প্রার্থী পিয়া দান্ডিয়া রিপাবলিকান প্রার্থী কেসি আসকারকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্যের ২২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন প্রায় ৫১.৯ শতাংশ ভোট। তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ভারতীয়-আমেরিকান প্রতিনিধিত্ব আরও বিস্তৃত হলো।

এ ছাড়া অভিজ্ঞ ভারতীয়-আমেরিকান ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতারাও তাদের আসন ধরে রেখেছেন। ভার্জিনিয়ার ১০ম ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেট দলীয় কংগ্রেসম্যান সুহাস সুব্রামানিয়াম প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ১৭তম ডিস্ট্রিক্টে ডেমেক্রেটিক কংগ্রেসম্যান রো খান্না ভারতীয় বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী রীতেশ ট্যান্ডনকে পরাজিত করে প্রায় ৭২ শতাংশ ভোটে পুননির্বাচিত হয়েছেন।

ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ৭ম ডিস্ট্রিক্টে ডেমক্রেটিক কংগ্রেসওম্যান প্রমিলা জয়পাল রিপাবলিকান নিরাভ শেঠকে পরাজিত করে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার ৩য় ডিস্ট্রিক্ট থেকে রিপাবলিকান রব টাকারকে পরাজিত করে অষ্টমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসম্যান অ্যামি বেরা।

এই বিজয়গুলো কংগ্রেসে ভারতীয়-আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বকে আরও সুসংহত করেছে। অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নীতি, নাগরিক অধিকার এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্কে এসব আইনপ্রণেতার অংশগ্রহণও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তাদের সাফল্য প্রমাণ করে, অভিবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা রাজনীতিকরাও দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনী ভিত্তি গড়ে তুলে জাতীয় নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন।

তবে নির্বাচনে শুধু ডেমোক্র্যাটরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। রিপাবলিকান দলের দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন, যা এই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল রিপাবলিকান বিবেক রামাস্বামীর ওহাইওর গভর্নর নির্বাচনে পরাজয়। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন এবং জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের কাছে পরাজিত হন। রামাস্বামী পেয়েছেন প্রায় ৪৫.৮ শতাংশ এবং অ্যাক্টন ৫০.৯ শতাংশ ভোট।
রামাস্বামী রিপাবলিকানদের রক্ষণশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে ভারতীয়-আমেরিকানদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তার পরাজয় দেখিয়েছে, প্রেসিডেন্টের সমর্থন, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা জাতীয় পরিচিতি—কোনোটিই এককভাবে নির্বাচনী জোট গড়ে তোলার বিকল্প নয়।

এ ছাড়া নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল নির্বাচনে ভারতীয় আমেরিকান প্রার্থী সরিথা কোমাটিরেড্ডি এবং নর্থ ক্যারোলাইনার ৪র্থ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে মহেশ গানরকার পরাজিত হয়েছেন।
এসব ফলাফল ভারতীয়-আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রত্যাখ্যান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক দলীয় ও আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রতিফলন।

পাকিস্তানি-আমেরিকান প্রার্থীরাও অঙ্গরাজ্য আইনসভায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। কানেকটিকাটে মেরিয়াম খান স্টেট সিনেটের ২ নম্বর ডিস্ট্রিক্টে বিজয়ী হয়েছেন এবং সৌদ আনোয়ার ৩ নম্বর ডিস্ট্রিক্টে প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। টেক্সাসে সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি, জর্জিয়ায় ফারুক মুঘল এবং নেভাদায় হানাদি নাদিম নিজ নিজ আসনে বিজয়ী হয়েছেন। পেনসিলভানিয়ায় মেরিয়াম সাবিহ প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে থাকলেও তার বিজয় তখনো চূড়ান্ত হয়নি। এসব ফলাফল বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে পাকিস্তানি-আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিস্তার তুলে ধরে।

দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বৃহত্তর চিত্রে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের সাফল্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী জর্জিয়ার স্টেট সিনেটর শেখ রহমান ৫ নম্বর ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রাথমিক ফলাফলে ৩৫,১০১ ভোট পেয়েছেন। ২০১৮ সালে প্রথম নির্বাচিত হওয়া শেখ রহমান জর্জিয়ার প্রথম মুসলিম ও এশীয় বংশোদ্ভূত স্টেট সিনেটর।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী ডেমোক্র্যাট দলীয় স্টেট সিনেটর মো. মাসুদুর রহমান কানেকটিকাটের ৪ নম্বর স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারের রকিংহাম ৩০ নম্বর হাউস ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী আবুল বি. খানও প্রাথমিক ফলাফলে বিজয়ীদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। প্রাথমিক হিসাবে তিনি ১,৮৭৩ ভোট পেয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জেসন জানভ্রিন পেয়েছেন ১,৭৬৪ এবং ডেমোক্র্যাট ডায়ানা ল্যাব্রেক চ্যাপম্যান পেয়েছেন ১,৫৪৫ ভোট।

এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রার্থী মার্কিন কংগ্রেসে বিজয়ী হতে পারেননি। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় এই প্রতিনিধিত্ব ধরে রাখা তুলনামূলকভাবে ছোট বাংলাদেশি অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।

কংগ্রেসের বাইরে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচনেও ভারতীয়-আমেরিকান প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। জর্জিয়ায় জ্যোত সিং এবং টেক্সাসে পুজা শেঠি নিজ নিজ স্টেট হাউস ডিস্ট্রিক্টে বিজয়ী হয়ে সংশ্লিষ্ট আইনসভায় প্রথম ভারতীয়-আমেরিকান প্রতিনিধি হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন ইলিনয়ের নাবিলা সৈয়দ, অ্যারিজোনার প্রিয়া সুন্দরেশন, মিনেসোটার কৃষ সুব্রামানিয়ান, নিউইয়র্কের লিসা কৌল ও জেরেমি কুনি।
এ ছাড়া পেনসিলভানিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, মিশিগান, ক্যালিফোর্নিয়া, জর্জিয়া, ইন্ডিয়ানা, ভারমন্ট, মেরিল্যান্ড ও ফ্লোরিডার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পরিষদে ভারতীয়-আমেরিকান প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাহী পর্যায়েও তাদের প্রতিনিধিত্ব অব্যাহত রয়েছে: মেরিল্যান্ডের লেফটেন্যান্ট গভর্নর অরুণা মিলার এবং উইসকনসিনের অ্যাটর্নি জেনারেল জশ কৌল পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।

এই ফলাফলকে দক্ষিণ এশীয়-আমেরিকান ভোটারদের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রবণতার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ২ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অক্টোবর ২০২৬-এর জরিপে ৬২ শতাংশ ভারতীয়-আমেরিকান নাগরিক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস প্রার্থীদের সমর্থনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে রিপাবলিকানদের সমর্থনের কথা বলেছেন ১৯ শতাংশ।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের এএপিআই ডেটা ও এপিআই ভোট জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত এশীয়-আমেরিকান ও প্যাসিফিক আইল্যান্ডার ভোটারদের ৯০ শতাংশ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জননিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও অভিবাসন ছিল তাঁদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়।

এসব তথ্য যে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে তাহলো দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানরা কোনো একক রাজনৈতিক আদর্শ বা দলীয় অবস্থানের জনগোষ্ঠী নন। প্রজন্ম, আর্থসামাজিক অবস্থা, অভিবাসনের অভিজ্ঞতা, ভৌগোলিক অবস্থান ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তাঁদের পছন্দ ভিন্ন। তাঁদের নির্বাচনী সাফল্য ক্রমেই বৃহত্তর জনস্বার্থের বিষয় গুলোতে অবস্থান গ্রহণ এবং জাতিগত পরিচয়ের বাইরে রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন দেখিয়েছে, দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ক্রমেই সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। কংগ্রেস, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা, নির্বাহী দপ্তর এবং স্থানীয় সরকার—সব পর্যায়েই তাদের প্রতিনিধিত্ব বিস্তৃত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাৎপর্য রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি নিয়ে কংগ্রেসের আলোচনায় দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত আইনপ্রণেতারা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারেন। তবে তাদের জাতিগত পরিচয়কে নিজ নিজ আদি দেশের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। তাদের প্রধান দায়বদ্ধতা মার্কিন সংবিধান ও নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতি।

৩ নভেম্বরের নির্বাচনের তাৎপর্য শুধু কতজন দক্ষিণ এশীয় প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব ও নীতি নির্ধারণে ক্রমবর্ধমান ভূমিকা রাখার পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই বর্ধিত প্রতিনিধিত্বকে কার্যকর নীতি নির্ধারণ, জনজবাবদিহি এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাবে রূপান্তর করা।