শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের নামে বরাদ্দ দেয়া বাড়ি আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ইব্রাহিম খানসহ চারজনের সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব, আমানত ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য জানতে দেশের সব ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে তাদের নামে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর সম্পদ রয়েছে কিনা, তা জানতে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কাছেও তথ্য চাওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় থাকা অন্য তিনজন হলেনÑ ডিএমপি’র বংশাল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাহিদুর রহমান, শেখ মো. জাবেদ উদ্দিন ও মিরাজ মো. জাকির উদ্দিন। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নামেও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক।
দুদক সূত্র জানায়, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক বিলকিস আক্তারকে দলনেতা এবং উপ-সহকারী পরিচালক সাবিকুন নাহারকে সদস্য করে দুই সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান দলটি অভিযুক্তদের সম্পদের উৎস, মালিকানা, আর্থিক লেনদেন এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দেশের সব ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
সব ব্যাংকে চিঠি, খোঁজা হচ্ছে অর্থের উৎস: অনুসন্ধানের শুরুতেই অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেনের ওপর নজর দিয়েছে দুদক। তাদের নামে দেশের কোনো ব্যাংকে হিসাব রয়েছে কিনা, কী পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে, কী পরিমাণ অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তর করা হয়েছে, এসব তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য দেশের সব ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ব্যাংক হিসাবের তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হবে। দুদকের অনুসন্ধানে ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি আমানত ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুদক মনে করছে, শুধু দৃশ্যমান সম্পত্তি নয়, ব্যাংকে জমা অর্থ ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও প্রকৃত সম্পদের চিত্র পাওয়া সম্ভব।
জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাটের দলিল তলব: অভিযুক্তদের স্থাবর সম্পদের প্রকৃত চিত্র পেতে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কাছেও তথ্য চেয়েছে দুদক। প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি নিবন্ধিত হয়েছে কিনা, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে তাদের নামে সম্পত্তি নিবন্ধিত হয়ে থাকলে দলিলের দাতা ও গ্রহীতার নাম, দলিলের ধরন, দলিল নম্বর ও তারিখ, জমির মৌজা, দাগ নম্বর, পরিমাণ এবং দলিলে ঘোষিত মূল্যসহ বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। এসব তথ্য পাওয়ার পর অভিযুক্তদের নামে থাকা সম্পত্তির পরিমাণ ও মালিকানার ইতিহাস পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে।
পরিবারের সদস্যদের সম্পদও নজরদারিতে: অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তি। দুদকের চিঠিতে অভিযুক্তদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শেখ মো. জাবেদ উদ্দিনের স্ত্রী মোসাম্মৎ রিতা ফারজানা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পত্তিসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। দুদক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের সম্পদের মালিকানা ও অর্জনের উৎস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তিও পর্যালোচনা করা হবে।
হুন্ডিতে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ: অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম গুরুতর দিক হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের কোনো অংশ বিদেশে পাঠানো হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে চায় দুদক। এক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, অর্থ স্থানান্তর, সম্পদ অর্জনের সময়কাল এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস এবং সম্ভাব্য গন্তব্য শনাক্তের বিষয়টিও অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বিশেষ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের নামে বরাদ্দ করা বাড়ি আত্মসাতের অভিযোগের সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পদ অর্জন ও আর্থিক লেনদেনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা, তা বের করার চেষ্টা চলছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সম্পদ অর্জন, অর্থের উৎস এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সাবেক ডিসি ইব্রাহিমসহ চারজনের সম্পদের খোঁজে দুদক
স্টাফ রিপোর্টার
৫ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
