বাংলাদেশের উৎপাদন খাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত, উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

ফন্ট সাইজ:

উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কিনা- তা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫টি দেশ ও একটি জোটের নাম এসেছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, বিষয়টি যৌক্তিক নয় এবং এটি দেশের জন্য অস্বস্তিকর ও অসম্মানজনক।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশ ভেদে ভিন্ন হারে উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ায় অন্য কোনো পন্থা খুঁজছিল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে এবার বাংলাদেশসহ ১৫ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কিনা- তা নিয়ে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ইউএসটিআর। এসব দেশের আইন, নীতি এবং চর্চা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক বা প্রতিবন্ধকতামূলক কিনা-তা বের করা তদন্তের উদ্দেশ্য।

উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন-সংক্রান্ত তদন্তে বাংলাদেশের নাম থাকা কিছুটা অস্বস্তিকর বলে মনে করছেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। তারা মনে করেন, এ তদন্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিষয়টি স্বস্তিদায়ক? সম্মানজনক? যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত উৎপাদন করার কোনো কোটা ঠিক করে দেইনি। বিষয়টা হচ্ছে- আমরা এমন কিছু উৎপাদন করে রপ্তানি করছি, যাতে তাদের লোকাল ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু আমরা তো পোশাক তৈরি করি। যুক্তরাষ্ট্র তো আর পোশাকের ইন্ডাস্ট্রি নেই।’ ফলে তাদের ক্ষতি হওয়ার সুযোগ নেই। মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘তাদের মেইন কনসার্ন হচ্ছে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি, যেখানে কাউন্টারফিট গুডস তৈরি করা হয় কিনা, আমার জানামতে সবচেয়ে বেশি হয় থাইল্যান্ডে। বাংলাদেশে কাউন্টারফিট গুডসের চাহিদাও খুব কম। হলেও খুবই সামান্য। এটার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে। তারা লেবার ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারে। সেটাও ইতিমধ্যেই লেবার ল অ্যামেন্ডমেন্ট করা হয়ে গেছে। ইনসেন্টিভ নিয়ে কথা বলতে পারে। এরকম কিছু আমরা করি না। সুতরাং তদন্ত হওয়াটা, নাম আসাটা কমফর্টেবল না, স্বস্তিদায়ক না। তবে আমি মনে করি তদন্ত হলে আমাদের এখানে এ ধরনের কোনো কিছু পাবে না।

নিটওয়্যার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা এটিকে ওয়েলকাম করছি। কারণ বাংলাদেশে এরকম কোনো কিছু হচ্ছে না, যেটি অনৈতিক বা অতিরিক্ত প্রোডাকশন। যেটি তারা বলতে চাচ্ছে, সেটি বাংলাদেশে নেই। বরঞ্চ বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ রপ্তানি হচ্ছে তার চেয়ে বেশি আমাদের রপ্তানি কিন্তু ইইউ জোনে। তাছাড়া আমাদের এখানে যে উৎপাদন হচ্ছে, আমার যে ইন্ডাস্ট্রি সেই অনুযায়ী, বর্তমানে আমি বলবো রপ্তানি কম যাচ্ছে। তারা যে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে সেটা ওয়েলকাম করবো। আমরা এ ব্যাপারে সব রকমের সহযোগিতা তাদের করবো, করতে প্রস্তুত আছি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক চর্চা নিয়ে যে তদন্ত শুরু হয়েছে, ডিসিসিআই তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। আমরা মনে করি, এই তদন্ত তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসা মোটেও যৌক্তিক নয়। তিনি বলেন, তাছাড়া শ্রম অধিকার রক্ষা, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং রপ্তানি প্রণোদনার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে অভাবনীয় উন্নতি করেছে এবং কোনো অন্যায্য বাণিজ্যিক কৌশল অবলম্বন করছে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও বাণিজ্যচর্চা নিয়ে তদন্তের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা মূলত তাদের বাণিজ্যিক দরকষাকষির শক্তি বাড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে। তিনি বলেন, এটা তো নতুন কিছু না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে অন্য একটা সেকশনে এই ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে তারা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত একটা ট্যারিফ বসানোর কথা বলেছিল, যার মেয়াদ ছিল সীমিত-প্রায় পাঁচ মাস। এরপর যদি সেই ব্যবস্থা ধরে রাখতে হয়, তাহলে তাদের আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস দেখিয়ে দেশগুলোর একটি তালিকা করতে হবে। জাহিদ হোসেন আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। তাই আবার সেই বার্গেনিং পাওয়ার ফিরে পাওয়ার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ নিয়ে আপাতত উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে কোনো দেশে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে বা ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, সে বিষয়ে তারা তদন্ত করতে পারে। এলডিসি হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানিতে ভর্তুকি দিতে পারে। তাই তদন্তে বাংলাদেশের সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা নেই। বাণিজ্য সচিব বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যসংক্রান্ত সব আইনকানুন প্রকাশ্য এবং গেজেট আকারে প্রকাশিত। শ্রমআইনসহ এসব নথি অনলাইনেও উন্মুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে আগাম এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানতে চাওয়া হয়, তখন সরকার প্রয়োজনীয়ভাবে তা জানাবে। তিনি বলেন, তদন্ত শুরু হলেও এতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ঝুঁকি দেখছেন না। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রশ্ন বা তথ্য চাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন