কী বার্তা নিয়ে ঢাকায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

কী বার্তা নিয়ে ঢাকায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। মঙ্গলবার রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও রাজনৈতিক সংলাপে অংশ নেবেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা।

ঢাকা ও বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারে লিউ হাইশিংয়ের এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সফরটি পূর্বনির্ধারিত। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে চীনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সে কারণে সফরসূচিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সাক্ষাতের পাশাপাশি দলীয় পর্যায়ের একাধিক কর্মসূচি রাখা হয়েছে। চীনা প্রতিনিধিদলে কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালকসহ একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।

বিমানবন্দরে লিউ হাইশিংকে স্বাগত জানান বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, দলের ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ও অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদসহ শীর্ষ নেতারা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার কামরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

আজ বুধবার সকালে শেরেবাংলা নগরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করবেন লিউ হাইশিং। সকাল ১০টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে থাকবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িন এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক পেং শিউবিনসহ প্রতিনিধিদলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর সকাল ১১টায় বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন লিউ। সেখানে প্রেসিডেন্টের দেয়া মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন তিনি।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে ‘হোয়্যার হিস্ট্রি ইলুমিনেটস দ্য ফিউচার: চায়না-বাংলাদেশ পলিটিক্যাল পার্টিজ প্লাস’ শীর্ষক বৈঠক। একই অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করা হবে ‘বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’। দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে যৌথ গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করবেন লিউ হাইশিং। এরপর ঢাকায় চীনা দূতাবাসের সাবেক ও বর্তমান চ্যান্সারি ভবন পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে তার। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন চীনা প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।

সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার সকালে একটি জীবিকাসহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে লিউর। পরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করবেন তিনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে তার ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।

বাবার সূত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে পারিবারিক যোগ:
লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি পারিবারিক যোগসূত্র রয়েছে। তার বাবা লিউ শুচিং ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ১৯৮০ সালের আগস্টে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন। গত সেপ্টেম্বরে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ তথ্য উল্লেখ করে বাংলাদেশের সঙ্গে লিউ হাইশিংয়ের পারিবারিক যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে লিউ হাইশিংয়ের যোগাযোগ অবশ্য এবারই শুরু হচ্ছে না। গত জুনে বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দুই দলের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার আগ্রহও প্রকাশ করেন লিউ।

গত ৭ মে বেইজিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা। সেখানে যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়েও তারা একমত হন।

আগের এসব বৈঠক ও যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় এবার ঢাকায় এসেছেন লিউ হাইশিং। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জুনের বৈঠক এবং বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এবারের সফর দুই দলের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

লিউ হাইশিংয়ের এই সফরের মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দলীয় যোগাযোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কয়েক মাসের মাথায় এই সফর দুই দলের যোগাযোগকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করেছে।