ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন সিনথেটিক ড্রাগে মত্ত তরুণ-তরুণীরা। এসব ভয়ঙ্কর মাদকে আসক্ত হয়ে বিপথগামী হচ্ছে ধনীর দুলালেরা। শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এসব মাদক। বিশেষ করে কিশোরদের কাছে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। মাদক সেবন থেকে শুরু করে বিক্রিতে জড়িয়ে কিশোর গ্যাং সদস্যরা বেপরোয়া হয়েছে। মাদকের টাকার জোগান দিতে ছিনতাই, খুন-খারাবিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়াচ্ছে কিশোররা। অথচ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিনই ঢুকছে কোটি কোটি টাকার ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ঙ্কর মাদকের চালান। দেশে প্রবেশের পর এসব চালান দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে। বাজারে যে পরিমাণ ইয়াবা আছে, তার মাত্র ১০-১৫ শতাংশ ধরা পড়ে, বাকি ৮৫ শতাংশ নির্বিঘ্নে চলে যায় গন্তব্যে। দেশে যখন অবাধে মাদকের ছড়াছড়ি তখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংস্থাগুলো দেশের বৈধবারে অভিযানে ব্যস্ত। অভিযানে গিয়ে বারের ভেতরে সেবনকারীদের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা বারমুখী হচ্ছেন না। আর ক্রেতারা বারমুখী না হওয়াতে বার ও রেস্টুরেন্ট মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা এসব অভিযানকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন।
সূত্রগুলো বলছে, গত ছয় মাসে ঢাকার নিবন্ধিত বার, ক্লাব ও পাঁচ তারকা হোটেলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪২টি অভিযান চালানো হয়েছে। বনানীর তারকা হোটেল আমারী, আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল হলিডে ইন, গুলশানের জার্মান ক্লাব, মিডিয়া ক্লাব, র-ক্যানভাস, তেজগাঁওয়ের ফুয়াং ক্লাব, রুচিতা ও ব্লেজার ক্লাউসে অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল অ্যালকোহল ও অনুমোদিত অ্যালকোহল বিক্রির লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন বা অতিরিক্ত মজুতের মত প্রশাসনিক অনিয়ম ধরা। এসব অভিযানে কেরু অ্যান্ড কোং এবং ক্রাউন বেভারেজ এর হান্টার, বিয়ার ও বৈধভাবে আমদানি করা অ্যালকোহল জব্দ দেখিয়ে সেগুলোকে মাদকবিরোধী অভিযানের সফলতা বলে প্রচারণা চালিয়ে পর্যটন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। জনমনে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। বার ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈধবারে একের পর এক অভিযান চালানো হচ্ছে, কিন্তু ইয়াবা বা আইসের কোনো আস্তানায় ঘটা করে কোনো অভিযানের খবর আমাদের কাছে আসে না।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা শহরেই প্রতিদিন বিভিন্ন রুট দিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ইয়াবা এবং আইসের ছোটবড় চালান প্রবেশ করে। এই বিশাল সরবারহ চেইন সচল রাখতে দেশজুড়ে কাজ করছে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। দেশের ১৮টি জেলার অন্তত ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট মাদক চোরাচালানের প্রধান রুট হিসাবে ব্যববহৃত হচ্ছে। এরমধ্যে টেকনাফ, উখিয়া ও শাহ্পরীর দ্বীপের নাফ নদী এবং সাতক্ষীরা, যশোর ও কুমিল্লার সীমান্ত অন্যতম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাড়া-মহল্লার খুচরা মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে গডফাদারদের নাম সবাই জানে। কিন্তু এদের নাম মুখে নিতে কেউ সাহস পায় না। কারণ এসব মাদক বিক্রেতাদের পেছনে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, রাষ্ট্র যদি মাদকের গডফাদারদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তবে শুধু চুনোপুঁটি ধরে এই সামাজিক অবক্ষয় ঠেকানো সম্ভব নয়। একইসঙ্গে মাদক প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত বারে যেভাবে অভিযান চালানো হয়, অবৈধ ও নিষিদ্ধ মাদকের বিরুদ্ধে সেভাবে অভিযান চোখে পড়ে না। সরকারকে এ বিষয়ে নজর বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স এসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান খান শোভন বলেন, ১৮ কোটি জনগণের দেশে মাত্র ৫৮টা বার। সবগুলো বার ঢাকা শহরে। সব বারে সবাই যেতে পারে না। একটা-বারে যদি ১০০ জন যায় তবে ৩ থেকে ১২ রেগুলার এডিকেট হয়। আর বাকি ৭০ থেকে ৯০ জন এরা ইরেগুলার। কিন্তু ইয়াবা যারা খায় তারা এডিকটেড হয়ে যায়। মাদক আর অ্যালকোহল এক নয়। কিন্তু দু’টা জিনিসকে এক করা হচ্ছে। আমরা দু’টা আলাদা করার জন্য ফাইট করছি। কিন্তু কোনো ফিডব্যাক পাচ্ছি না। তিনি বলেন, নারকোটিক্স বা অন্যান্য সংস্থা অভিযান চালানোর সময় নেগেটিভভাবে এটাকে উপস্থাপন করছে। সঙ্গে আরও ৫-১০ জন ইউটিউবার নিয়ে ঢুকছে। সামাজিকভাবে এই জিনিসটাকে কালার করা হয়। লাখ লাখ পিস ইয়াবা ধরছে সেটা কেউ চোখেই দেখছে না। অথচ বারে অভিযান চালানোর সময় ঘটাও করে ফলোআপ করা হয়।
বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর (অব.) জাহাঙ্গীর হোসেইন বলেন, অযথা বৈধ বার বা হোটেলকে মাদক উদ্ধারের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। বৈধভাবে লাইসেন্স ফি ও ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চরম ব্যবসায়িক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বারবার এ ধরনের অভিযানে আগত অতিথিদের মামলা, গ্রেপ্তার লাইভ ভিডিও প্রচারণা করে অদ্ভুত ও ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করা হয়েছে। তারকা হোটেল, ক্লাব বারের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। পর্যটন ও বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার বড় অংকের রাজস্ব পেয়ে থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো (উত্তর) উপ- পরিচালক মো. রাজিউর রহমান বলেন, বারে অভিযান নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ। বৈধ বার নিয়ম মেনে চলছে কি না সেটি আমরা দেখি। পারমিট ছাড়া কোনো ব্যক্তি মদ সেবন বা কম বয়সের কোনো বাচ্চা সেবন করছে কি না সেটি দেখা হয়। নানা অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা পরিদর্শন করেছি। আর ভিডিও প্রকাশ আমরা করিনি। বিশেষ করে আমার মেট্রোর কেউ এই ভিডিওটা প্রকাশ করেনি।
