যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘পোশাক খাত নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন: অস্থিরতার নেপথ্যে আ.লীগ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতার নেপথ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পতিত আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী এবং কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা। রোববার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। ওই ঘটনা ও দায়ীদের বিস্তারিত পরিচয়সংবলিত প্রতিবেদন সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কাছে রয়েছে। জড়িতদের অনেককে গ্রেফতার ও বাকিদের নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত ডিসেম্বর মাসকে টার্গেট করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসাবে পরিচিত গার্মেন্টশিল্পকে টার্গেট করেছেন তারা। মজুরি বাড়ানোর শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এমনকি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন মেট্রোরেল, কেপিআইভুক্ত এলাকায় অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক ছড়ানো এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন নেপথ্যে থাকা এসব ব্যক্তি। যুগান্তরের অনুসন্ধান, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, গার্মেন্ট মালিক ও সাধারণ শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিল্প এলাকার মেট্রোরেল, ব্যাংক ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলা হতে পারে। এমনকি গুজব ছড়িয়ে সহিংস ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এ অবস্থায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, নিরাপত্তা জোরদার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে।
জানা গেছে, ১ নভেম্বর মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নামে আইডিয়াস ফ্যাশন, ভিশন, জকি ফ্যাশন, মিড এশিয়া গার্মেন্ট, লোডস্টার ফ্যাশন ও এর আশপাশের গার্মেন্টের ১০ হাজার শ্রমিক। অবরোধ তুলে নিতে পুলিশ আহ্বান জানালেও শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান করায় একপর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়। মল্লিক টাওয়ারের জানালার কাচ ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেন শ্রমিকরা। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মাদারল্যান্ড গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি সালেহা ইসলাম শান্তনা ও সাধারণ সম্পাদক আল আমিন ইসলাম। গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে স্টারলিং অ্যাপারেলস, এপেক্স ফুটওয়্যার, ট্রপিক্যাল নেটেক্স, অ্যাসেন্সিয়াল ক্লোদিং, শিশির নিটিং অ্যান্ড ডায়িং, লাকি স্টার অ্যাপারেল, এইচবিএস অ্যাপারেল, স্টাফ লিমিটেডের কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। শ্রমিকদের হামলায় ২২ পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশ বক্সে আগুন এবং এটিএম বুথে ভাঙচুর চালানো হয়। এই নাশকতার পেছনে কলকাঠি নাড়েন স্থানীয় যুবলীগ নেতা খাত্তাম মোল্লা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সেলিম। শ্রমিকদের উসকে দেন বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম মাজহার, বাহার উদ্দিন, আক্কাস, শাহ আলম, মনির, শাহনাজ, সুমি, মাসুদ, আসাদ, ফিরোজ, রোজিনা, আল আমিন, ডলি আক্তার, একতা গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের শ্রমিক নেত্রী সীমা আক্তার, গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের শ্রমিক নেতা জহির উদ্দিন, বাংলাদেশ শ্রমিক গার্মেন্ট টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের শ্রমিক নেতা রাশেদুল।
আশুলিয়ায় অনন্ত গার্মেন্ট, উইন্ডো গ্রুপ. আয়শা ক্লোথিং, শারমিন গ্রুপ, নিউএজ গার্মেন্ট, আল মুসলিম গ্রুপ, এভারস্টার সোয়েটার, বিডি স্কাইলাইন. এনার্জিপ্যাক ফ্যাক্টরি, লুসাকা গ্রুপ, অ্যাক্টিভ গ্রুপের শ্রমিকরা নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে নামধারী শ্রমিক নেতাদের উসকানিতে গার্মেন্টে ভাঙচুর করেন শ্রমিকরা। গার্মেন্টে ভাঙচুরে উসকানি দেন স্বাধীন বাংলা গার্মেন্ট কর্মচারী ফেডারেশনের আঞ্চলিক সভাপতি আল কামরান, গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য লীগের সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি তুহিন চৌধুরী, গার্মেন্ট ঐক্য ফেডারেশনের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি খোরশেদ আলম, পোশাকশিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসমাইল হোসেন ঠাণ্ডু।
সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অংশ নেন। মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পকারখানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মেট্রোরেল স্টেশন, ব্যাংক ও অন্যান্য স্থাপনা নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গার্মেন্ট মালিকদের সম্পৃক্ততার কথা জানান। তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকরা যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারাও অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছেন। সাবেক সংসদ-সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীও এর সঙ্গে জড়িত আছেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন ফেসবুক পোস্টে বলেন, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না। সহিংসতা, ভাঙচুর ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
৬৭৯ কারখানা বন্ধ : শ্রমিক অসন্তোষের কারণে থমকে গেছে গার্মেন্টের উৎপাদন কার্যক্রম। সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকার মোট ৬৭৯টি কারখানা শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বন্ধ রয়েছে।
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার, আশুলিয়া, জিরানি বাজার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৫৫টি কারখানা খোলা ছিল। ৬৭৯টি কারখানার শ্রমিকরা কাজে অংশ না নিয়ে চলে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। মিরপুরের ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৫৫টি কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে গেছেন। কাজ না করে চলে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ৫৩ হাজার ৮৪০ জন। গাজীপুর এবং ময়মনসিংহ এলাকার ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টি কারখানা বন্ধ ছিল। সাভার-আশুলিয়া এবং জিরানী শিল্পাঞ্চলে ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টি কারখানার ৭ লাখ ৪৩ হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ রাখেন। নারায়াণগঞ্জে ১৯৯টি কারখানার মধ্যে ৯টি কারখানা থেকে শ্রমিক বের হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম এলাকায় ৩৪০টি কারখানা থাকলেও সেখানে কোনো শ্রমিক অসন্তোষ বা কাজ বন্ধের ঘটনা ঘটেনি। শিল্পাঞ্চলগুলোতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।
প্রথম আলো
‘তৈরি পোশাকশিল্প: চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যবসা বাড়ছে, মজুরিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, একের পর এক সংকট সামলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। শুধু ব্যবসা বৃদ্ধি নয়, সরকারের সহায়তা পাওয়ার দিক থেকেও তৈরি পোশাকশিল্প অন্যান্য খাতের চেয়ে এগিয়ে আছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিতে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া শ্রমিকেরা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শীর্ষ ক্রেতা সুইডেনভিত্তিক এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চীন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ভারত ও তুরস্ক—এই সাত দেশেই পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। দেশের ট্যানারি, জাহাজভাঙা, স মিল এবং নির্মাণ—এই চার খাতে ন্যূনতম মজুরি পোশাকশিল্পের চেয়ে বেশি।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত রোববার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। এরপরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকনেতারা বলছেন, আগে বোর্ড গঠন করে মজুরি নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নিলে এই অস্থিরতা এড়ানো যেত। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, শ্রমিকের কম উৎপাদনশীলতা, কম দামের পোশাক এবং পোশাক তৈরিতে কম মুনাফা হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন তুলনামূলক কম।
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের এখন ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হয়। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর এই নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়ন হয়। আগে পাঁচ বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠিত হতো। বর্তমান বিএনপি সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়কাল কমিয়ে তিন বছর করেছে। সেই হিসাবে আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জানতে চাইলে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে শ্রমিকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। তাঁরা খাবারের খরচ কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু তা–ই নয়, সংসারের খরচ মেটাতে ঋণ করার প্রবণতাও বেড়েছে। সব মিলিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছেন।
গত দেড় দশকে অন্তত সাতটি চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি বেড়েছে। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড এবং পরের বছর রানা প্লাজা ধসের কারণে পোশাক রপ্তানিতে সাময়িক মন্দা আসে। তবে পোশাক কারখানায় কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কাজ করায় ক্রেতাদের আস্থা ফেরে। রপ্তানিও বাড়ে। মাঝে কোভিড মহামারির কারণে পোশাকশিল্পে কঠিন সময় গেছে। তারপর আবার ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ায়। গত পাঁচ বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানি ধরে রেখেছে।
তৈরি পোশাকের রপ্তানি ২০১১ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি এর আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি।
গত জুলাইয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববাজারে গত বছর তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি হিস্যা (মার্কেট শেয়ার) ছিল চীনের, ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তারপরই বাংলাদেশের অবস্থান, ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া ভিয়েতনামের হিস্যা ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৩ শতাংশ এবং তুরস্কের ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
ছয় হাজার কোটি টাকার করছাড়
তিন দশকের বেশি সময় ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরনের করসুবিধা পেয়ে আসছেন। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা ধরে রাখার লক্ষ্যের কথা বলে মালিকেরা এখনো প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার করছাড় আদায় করে নিচ্ছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত শুধু করপোরেট করে ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ছাড় পেয়েছে। এর কারণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পোশাক খাতে করপোরেট করহার সবচেয়ে কম, মাত্র ১২ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব কারখানা হলে করপোরেট করহার মাত্র ১০ শতাংশ। যদিও অন্য খাতের প্রতিষ্ঠানকে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়।
আয়কর ছাড়াও বিভিন্ন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা পায় পোশাকশিল্প। বন্ড সুবিধাও পান পোশাকমালিকেরা। এই সুবিধার আওতায় পোশাক খাতের কাঁচামাল যেমন সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য বিদেশ থেকে আনতে কোনো শুল্ক-কর দিতে হয় না। চামড়া খাতসহ হাতে গোনা কয়েকটি খাত শুধু বন্ডসুবিধা পায়। অন্য খাতগুলো এসব সুবিধা পায় না।
প্রতিযোগী দেশের তুলনায় মজুরি কম
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যখন তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা কার্যকর হয়, তখন ডলারের বিনিময় হার ছিল ১১০ দশমিক ৫০ টাকা। সেই হিসাবে ন্যূনতম মজুরি দাঁড়ায় ১১৩ ডলার। তিন বছরের ব্যবধানে প্রতি ডলারের দাম বেড়ে হয়ে হয়েছে ১২৪ টাকা। অর্থাৎ ডলারের হিসাবে এখন ন্যূনতম মজুরি দাঁড়ায় ১০১ ডলার।
যদিও এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০২ ডলার। পার্শ্ববতী দেশ ভারতে নিম্নতম মজুরি ১২৪ মার্কিন ডলার। এ ছাড়া চীনে ২৯৪, কম্বোডিয়ায় ২০৮, ইন্দোনেশিয়ায় ১৭২, ভিয়েতনামে ১৬৩ এবং পাকিস্তানে ১৩৫ ডলার।
মজুরি কম কেন জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিযোগী কোনো দেশে পোশাকশিল্পে হেলপার পদ না থাকলেও আমাদের দেশে আছে। কাজের কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকলেও এই পদে সাড়ে ১২ হাজার টাকায় নিয়োগ পাচ্ছেন যে কেউ। ওভারটাইম ছাড়া মাসে বেতন ১৮ হাজার টাকা পাচ্ছেন মেশিন অপারেটররা। যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁরা ২৫ হাজার টাকাও পান। তা ছাড়া অন্য দেশের তুলনায় আমাদের শ্রমিকদের উৎপাদশীলতা কম। কম দামের তৈরি পোশাক ও সিএম (কাটিং-মেকিং) কম হওয়ার কারণেও শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক কম হয়।’
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে
তিন বছর আগে তৈরি পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধি হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকেরা সেটির সুফল পাননি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে পৌনে ১০ শতাংশে দাঁড়ায়। তারপর আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পরিবর্তনের পর শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে নামেন। সেই আন্দোলনের মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে শ্রমিকেরা ৫ শতাংশের পরিবর্তে ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট (মজুরি বৃদ্ধি) পান।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ দাঁড়ায়। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম ছিল। চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রকট হওয়ার পর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ে।
গত মাসে প্রকাশিত বিবিএসের এক জরিপে উঠে এসেছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি, ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। আর শহরাঞ্চলে প্রতি পরিবারের মাসিক ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মাসিক ব্যয়ের অর্ধেক খাবার এবং অর্ধেক খাবারবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়।
জানতে চাইলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, প্রতিযোগী দেশের মজুরি, উৎপাদশীলতাসহ ১১টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এসব বিষয় বিবেচনা নিয়ে তিন বছর আগে আমরা বলেছিলাম, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উপযোগী ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মজুরি অনেক বৃদ্ধির সুযোগ আছে।’ খাদ্য ও চিকিৎসা ভাতার পাশাপাশি শিক্ষা, যাতায়াত ও বিনোদন ভাতা যুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কালের কণ্ঠ
‘অস্থিরতার নেপথ্যে দৃষ্টি সরকারের’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, পোশাক শ্রমিক আন্দোলনে অস্থিরতার বিষয়ে গোয়েন্দাদের কাছে আগাম তথ্য ছিল বলে জানা গেছে। এর পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যথাযথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া ও নাশকতার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনসংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে।
তিনি বলেন, এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের আলোচনা চলার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে এ অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। সহিংসতা, ভাঙচুর ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
মাহদী আমিন বলেন, একটি চিহ্নিত মহল গার্মেন্টসশিল্পকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না। গতকাল দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে এ কথা বলেন মাহদী আমিন।
ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকাসহ অন্যান্য দাবিতে গত কয়েক দিনে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে।
এসব ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১১টি মামলায় ১০ হাজারের বেশি লোককে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার শতাধিক। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব এলাকার সাড়ে ছয় শর বেশি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এর মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী কারখানা চালু রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
পোশাক কারখানা মালিকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উর্ধ্বতনদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো আন্দোলন এখন চলছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এখন যারা আন্দোলনের নামে সহিংসতা করছে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। শ্রমিকদের দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠনের, সেটি গঠন করা হয়েছে।
গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ডের জন্য শ্রমিকরা কখনো সড়ক-মহামসড়ক অবরোধ করেননি। গত কয়েক দিনে আন্দোলনের ফুটেজ পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি, সেখানে শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের সংযোগ নেই। মুখোশধারী যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা ওখানে অনুপ্রবেশ করেছে। তারাই সড়কের আন্দোলনে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে।
এর আগে সকালে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং বিকেলে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গার্মেন্টস মালিকদের বৈঠক: গতকাল সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন গার্মেন্টস মালিক নেতারা। ওই বৈঠক শেষে ব্রিফিংকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে রবিবার মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। শিগগিরই বোর্ডের প্রথম সভা হতে পারে অথবা সম্ভাব্য খুব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তাঁরা বসবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন যেন শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ হয় এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়। শ্রমিকদের বিষয়গুলো যেন অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হয়। সুতরাং বাস্তবতার নিরিখে মজুরি নির্ধারিত হবে। এখানে অসন্তোষের কিছু নেই।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে বড় লাফ, আয় বেড়েছে ৩ গুণ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে রপ্তানিমুখী এ খাতের আয়ও বেড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ ডলার। আগের ছয় মাসের তুলনায় আয় বেড়েছে ২১৭ দশমিক ২০ শতাংশ।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬২ ডলার। পরবর্তী ছয় মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ ডলারে। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫ ডলার।
মাসভিত্তিক হিসাবেও রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের মার্চে আয় হয়েছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ১২৯ ডলার। এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৩ ডলারে। মে মাসে আয় কিছুটা কমে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৮০৮ ডলার হলেও জুনে তা বেড়ে হয় ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৮ ডলার। জুলাইয়ে আয় হয় ১৯ লাখ ৫ হাজার ১৪ ডলার। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ৯৫ ডলারে। শুধু আগস্ট মাসের রপ্তানি আয় আগের ছয় মাসের সম্মিলিত আয়ের চেয়েও বেশি।
রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধি পরবর্তী অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩০৯ কোটি ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮১ টাকা।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই অবস্থান তৈরি করতে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
ছয় বছরে রপ্তানি আয় তিন গুণের বেশি
প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতের রপ্তানি বিবরণী অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে হয় ৯৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে পরের অর্থবছরে তা কমে ৫৮ কোটি ৫২ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয় ৭২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই আগের অর্থবছরের পুরো সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ রপ্তানি আয় হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মাংস ও মাংসজাত পণ্য, বুল স্টিক, দধি, রসমালাই, মিষ্টি, হাঁসের পালক, জিলেটিন, গরুর লেজের লোম, কবুতর, ওম্যাজাম, মোগলাই পরোটা, মহিষ ও গরুর শিং, টুকরা চামড়া এবং ভেটেরিনারি মেডিসিন সাপ্লিমেন্ট। এসব পণ্যের আমদানিকারক দেশের মধ্যে রয়েছে মালদ্বীপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, মিসর, কুয়েত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও নেপাল।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরে সরকার কাজ করছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী নিরাপদ, মানসম্মত ও হালাল প্রাণিজ পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে প্রাণীরোগ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও সনদায়ন ব্যবস্থা এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হ্যাচিং এগ রপ্তানির মাধ্যমে এ খাতের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা ইতোমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই সরকারের লক্ষ্য।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধি, নিরাপদ ও রোগমুক্ত উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাণিজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি খামারি ও উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদানও আরও বাড়বে।
বাড়ছে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এ সময়ে দুধ উৎপাদিত হয়েছে ১৫৭ দশমিক ৫৩ লাখ টন। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ টন। এক বছরে দুধ উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ১৫ লাখ টন।
দুধ উৎপাদন বাড়াতে গবাদি পশুর জাত উন্নয়ন, উন্নত পশুখাদ্য সরবরাহ, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও খামার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাজারসংযোগ, প্রাণী বীমা ও দুধের ভোক্তা তৈরিতে কাজ করা হয়েছে। স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের মাধ্যমেও শিশুদের মধ্যে দুধ পানের অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইত্তেফাক
‘পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে এবার যুক্ত হলো নারায়ণগঞ্জ’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। বরং নতুন করে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা। বিক্ষোভের পাশাপাশি সড়ক, মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগও অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগে পাঁচটি মামলা হয়েছে। এই মামলায় ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়ক দীর্ঘক্ষণ অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকরা। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরাও ঢাকা-কাঁচপুর মহাসড়কও অবরোধ করেন। গাজীপুরে পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আগুন দেওয়া হয়েছে একটি কাভার্ড ভ্যানসহ আরেকটি গাড়িতে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে কার্যক্রম কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ডিসেম্বরকে সামনে রেখে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে সরকারের একাধিক মন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদ গতকাল বলেছেন, এই আন্দোলনে কিছু শিল্প মালিক, সাবেক এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীদেরও ইন্ধন রয়েছে। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া কথা ফেসবুকে স্বীকার করায় রাজীব চন্দ্র দাস নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।
পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন-ভাঙচুরের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। গত রবিবার দুপুরে ঐ ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গতকাল সোমবার এসব মামলা করে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, পাঁচটি মামলার প্রতিটিতে অজ্ঞাতনামা ১ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে গতকাল সকালে বিচ্ছিন্নভাবে সড়কে নামার চেষ্টা করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি গলি দিয়ে শ্রমিকেরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের কয়েকটি শেল ছোড়া হয়। পরে শ্রমিকরা সেখান থেকে সরে যান। এছাড়া সকালে রূপনগর এলাকা থেকে শ্রমিকেরা বিচ্ছিন্নভাবে মিরপুর ২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রশিকা মোড়ের দিকে আসতে থাকেন। তারা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়। মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের টানা দুই দিনের বিক্ষোভ-সংঘর্ষের পর গতকাল সকাল থেকে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সকাল থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়। গোলচত্বরে পুলিশের দাঙ্গা দমনের যান, জলকামানসহ বিভিন্ন যান প্রস্তুত রাখা হয়। মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের পরিস্থিতি ও পুলিশের সতর্ক অবস্থান নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন-উত্তর) মহিদুল ইসলাম।
মহিদুল ইসলাম বলেন, মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। গত রবিবারের সংঘর্ষ ও পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, তা শনাক্তে তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় শুধু শ্রমিকেরাই জড়িত ছিলেন, এমন নয়। তদন্তে শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্য অপরাধীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ ৬৭০ কারখানা-বিজিএমইএ: আন্দোলনের মুখে দেশের প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে চরম শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এবং শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে যাওয়ায় রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া-জিরানী অঞ্চলের ৬৭০টি পোশাককারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কাজ না করেই কারখানা থেকে বাসায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক। গতকাল বিজিএমইএ এ তথ্য জানিয়েছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী বেলা সাড়ে ১১টার হিসাব অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে মোট ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৬৪টি খোলা ছিল। শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে। সেখানকার ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টির শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে যান। ফলে এ দুই এলাকায় কাজ না করে ফিরে গেছেন ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭২ জন শ্রমিক। একই চিত্র সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকাতেও। সেখানে ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টি কারখানায় কাজ বন্ধ রয়েছে এবং কাজ না করে ফিরে গেছেন ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ জন শ্রমিক। এছাড়া রাজধানী মিরপুরে ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৬৫টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফেরেন ৫৩ হাজার ৪৫০ জন শ্রমিক।
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের ছাড় নয়—ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি: গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিক আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান। গতকাল সোমবার বিকালে সাভারের বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। নাশকতাকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে। গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুলিশ। কেউ বিভ্রান্ত বা চাপ সৃষ্টি করলে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। পাশাপাশি কারখানা মালিকদের প্রতিষ্ঠান চালু রাখার আহ্বান জানিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাসও দেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ঢাকা জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, এপিবিএন ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। সিসিটিভি ও বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘পোশাকশ্রমিক-হকারদের মাঠে নামিয়ে আ’লীগের ভয়ঙ্কর ছক’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসেম্বর ঘিরে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের নভেম্বর মাসজুড়ে সঙ্ঘাত-সহিংসতার পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে দেয়ার পরও তেমন প্রস্তুতি নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে সীমান্তের ওপারে কলকাতায় বসে নাশকতার ছক তৈরি করার বিষয়েও সরকারের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল।
এরপরও আগাম প্রস্তুতি না থাকায় গত রোববার থেকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে শুরু হওয়া পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে সহিংস রূপ নেয়। সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করতে আন্দোলনে ঢুকে পড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা। এর নেপথ্যে শক্তি ও অর্থের জোগানদাতা খোদ শিল্পমালিকরা। গাজীপুর অঞ্চলে শিল্প কারখানার ২৬৭ জন মালিক আওয়ামীপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো ভূমিকা না থাকায় বর্তমানে খেসারত দিতে হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালী নেতারা বিদেশে বসে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। অনেকেই কলকাতায় বসে নাশকতার ছক আঁটছেন। দলটির প্রভাবশালী নেতারা নাশকতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে উসকানি দিচ্ছেন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে বসে। এরই মধ্যে তাদের দেড় শতাধিক নেতাকর্মী শ্রমিক আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়ে উসকানি দিয়ে নাশকতা সৃষ্টি করেছে বলে প্রমাণ মিলেছে।ৎ
তবে গোয়েন্দাদের এসব তথ্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে গেলেও আগে তা আমলে নেয়া হয়নি। ঘটনা ঘটার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে টনক নড়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগানো হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এই অস্থিরতার সাথে কিছু শিল্প মালিকও জড়িত। এদের কেউ কেউ আগের সরকারের আমলে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ছিলেন। আন্দোলনে ঢুকে পড়া মুখোশধারীদের পাশাপাশি অর্থদাতাদেরও কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ দিকে সম্প্রতি উচ্ছেদ হওয়া হকারদের একটি অংশও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন শেষ হওয়ার পর বৃহৎ আকারে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে সহিংস কর্মসূচির প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এই আন্দোলন জোরদার করতে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে নাশকতার ছক তৈরি করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।
গতকাল হকার্স সমিতির পক্ষ থেকে ৭০০ থেকে ৮০০ হকার মানববন্ধন করেছে। পরে তারা গুলশান-২ এ উত্তর সিটি করপোরেশন অফিসে স্মারকলিপি জমা দেন। পাশাপাশি আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হয়ে সহিংসতাকারীদের পেছনে অর্থদাতা হিসেবে কাজ করছে। মদদ দিচ্ছেন খোদ গার্মেন্ট মালিকরাও।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। তাদের টার্গেট নভেম্বরজুড়ে ব্যাপক নাশকতা-অস্থিরতা এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে টার্গেট কিলিংয়েরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনেক নেতাকর্মী এরই মধ্যে কলকাতা থেকে এসে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রেকি করেছেন। এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করা হচ্ছে বলেও গোয়েন্দা সূত্র জানায়।
দুই দিনে রণক্ষেত্র : গত রোববার সকাল থেকে মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে একযোগে কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধ শুরু হয়। মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। গাজীপুরের চন্দ্রায় পুলিশ বক্সে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। কালিয়াকৈরে ঝুটের একটি গুদামে আগুন দেয়া হয়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুরের একটি মেট্রো স্টেশন কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। এরমধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ওইদিন পুলিশ মিরপুরে ২৯ জন ও গাজীপুরে ২০ জনকে গ্রেফতার করে।
গতকাল সোমবারও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নেন। পুলিশ ও বিজিবির সাথে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য গুরুতর আহত হন। দু’টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং ৩০ জনকে আটক করা হয়। গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি ও ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হয়েছে। দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। দুপুর ১টার পর শ্রমিকরা সরে গেলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
দাবি কী, সরকার কী করেছে : শ্রমিকদের মূল দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। এর পাশাপাশি তারা কালো তালিকা বন্ধ, অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বন্ধ এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ চান। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
সরকার গত রোববার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে আছেন বিজিএমইএ পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, শুক্রবার শ্রমিক নেতাদের সাথে পাঁচ ঘণ্টার আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত হয়। আগামী ৭ তারিখের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তার ভাষ্য, এ অবস্থায় আন্দোলনে থাকার কারণ নেই।
তবু রাস্তা শান্ত হয়নি। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, ৩০ হাজার টাকা তাদের দীর্ঘদিনের দাবি। শ্রমিকদের একটি অংশের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করছে বহিরাগতরা।
গ্রেফতারদের পরিচয়, পুলিশের দাবি : পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি- শ্রমিকদের আড়ালে সুপরিকল্পিতভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছে। মিরপুর থেকে গ্রেফতার ১১ জন এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে গ্রেফতার নয়জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে পুলিশ জানিয়েছে। কালিয়াকৈরে ছাত্রলীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদকের নেতৃত্বে মিছিলের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকার বাইরে থেকে লোক এনে মিরপুর ও আশুলিয়ায় জড়ো করা হয়েছিল, যাদের কাজ ছিল শ্রমিকদের উসকানি দেয়া এবং আন্দোলনকে সহিংস করা।
মালিকদের ভূমিকা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সাথে বৈঠক শেষে বলেন, কারা অস্থিরতার পেছনে রয়েছে তা এখন স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি মালিকদের কারখানা চালু রাখার আহবান জানান এবং আতঙ্কে হঠাৎ কারখানা বন্ধ না করতে বলেন।
এ দিকে মালিকপক্ষও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি বলেছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও সহিংসতা চললে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন তারা।
সংগঠনটির তথ্য মতে, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৫২৯টি কারখানা তখন বন্ধ ছিল।
শিল্প পুলিশের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু টঙ্গীর কারখানা মালিকদের মধ্যে ২৬৭ জন আওয়ামীপন্থী, বিএনপিপন্থী মাত্র পাঁচজন এবং রাজনীতির বাইরে ১১৫ জন। গাছা, বাসন, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরের চিত্রও প্রায় একই বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এদের অনেকে এখনো গোপনে আওয়ামী লীগকে আর্থিক জোগান দিচ্ছেন। সরকারের হাতে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রফতানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
মামলা-গ্রেফতার : পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার নয়া দিগন্তকে বলেন, মিরপুরে ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোমবারও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের যাচাই-বাছাই চলছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে পল্লবী থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলার বাদি পুলিশ। প্রতিটি মামলায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে অজ্ঞাত পরিচয় আসামি করা হয়েছে। তিন মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়াও কাফরুল থানায় আরো একটি মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ দিকে ডিবি পুলিশ বলছে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে রাজধানীর মিরপুরে সহিংসতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের একটি অংশ অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল। আন্দোলনের আড়ালে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।
নেপথ্যে শিল্প মালিকরা : গোয়েন্দাদের তথ্যে আগেই জানা গেছে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিল্প কারখানার ২৬৭ জন মালিক আওয়ামীপন্থী। টঙ্গীর বিসিক, গাছা, বাসন, কোনাবাড়ি, কাশিমপুরসহ অন্যান্য এলাকায় আওয়ামীপন্থী শিল্প মালিকরা গোপনে দলকে আর্থিক জোগান দিচ্ছেন। শিল্প পুলিশের প্রতিবেদনেও এমনটি উঠে এসেছে। এ ছাড়া আওয়ামীপন্থী ঝুট ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে রাখতে খোদ বিএনপি নেতারাও ভূমিকা পালন করছেন। সরকারের পট পরিবর্তনের পর ঝুটসহ অন্যান্য ব্যবসা দখলে বিএনপির অনেকে হানা দিলেও মূলত আওয়ামীপন্থী মালিকদের কারণে বেশির ভাগই সফল হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার থেকে পোশাক শ্রমিকদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বণিক বার্তা
‘জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্ভাব্য হামলা ও ইরানের পাল্টা আক্রমণের জন্য আঞ্চলিক মিত্রদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সংঘাতের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। থাইল্যান্ড জরুরি নিরাপত্তা পরিকল্পনা পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে ফিলিপাইন, জাপানসহ কয়েকটি দেশ জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়াও।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা আরো বড় আকারে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৌশলগত প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানির বিকল্প উৎস আরো বাড়ানো, জ্বালানি সংগ্রহ, জরুরি মজুদ ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আর্থিক চাপ মোকাবেলায় এখন থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আজ। বার্তা সংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও আঞ্চলিক মিত্রকে জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে ইরান ও তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য পাল্টা হামলার জন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা আঞ্চলিক মিত্রদের জানিয়েছেন, নতুন অভিযান কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। যদিও ইরান ও তার সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর পাল্টা আক্রমণের কারণে সংঘাত আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ স্থাপনা, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষদিকে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট, মেরিন সেনাসহ একাধিক উভচর যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগর অভিমুখে পাঠানো হয়েছে। এসব জাহাজে প্রায় নয় হাজার সেনাসদস্য রয়েছেন। এ মোতায়েনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও মেরিন সদস্যের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সম্ভাব্য এ সংঘাতের প্রভাব মোকাবেলায় থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এনএসসি) জরুরি প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব জেনারেল চাইয়াপ্রুয়েক দুয়াংপ্রাফাত জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন সংঘাত শুরু হলে জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা পর্যালোচনা করছে সরকার। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামীকাল এ বৈঠক হতে পারে।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্ভাব্য সংকটের মাত্রা অনুযায়ী সরকারি সংস্থাগুলোর করণীয় নির্ধারণ করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সময় তৈরি করা জরুরি জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ পরিকল্পনা নতুন পরিস্থিতির আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত থাই নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হবে। জ্বালানি ও নাগরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সাইবার হামলার আশঙ্কাও বিবেচনায় নিয়েছে থাইল্যান্ড। দেশটির ডিজিটাল ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নতুন করে আবার সংঘাত আরো বেশি ছড়ালে বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা; বিশেষ করে সংকট আরো বেড়ে গেলে বিকল্প অপশনগুলো কীভাবে এবং কত দ্রুত চালু করা যায় সেই পরিস্থিতি তৈরি করা।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আবারো বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে কৌশলগত মজুদ কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রাখা যেতে পারে; বিশেষ করে জ্বালানি পণ্য আমদানির বহুমুখী উৎস তৈরি করা। যাতে কোনো একটা জায়গায় সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বকল্প অপশনগুলো সঙ্গে সঙ্গে চালু করা যেতে পারে। আমাদের আবার মজুদ অবকাঠামোও ওই অর্থে নেই। এ কারণে খুব বেশি সুযোগ আমরা নিতে পারব এটাও বলা যাবে না। তবে সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি থাকতে হবে।’
এরই মধ্যে আমদানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। নভেম্বরের জন্য প্রয়োজনীয় নয়টি এলএনজি কার্গোর ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি ও তিনটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসার কথা। তবে সংঘাত নতুন করে তীব্র হলে পরবর্তী মাসগুলোয় এলএনজি ও জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়েছে সরকার। গত ২৮ জুলাই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় বাংলাদেশের গ্যাস সংকট মোকাবেলায় দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে গত ২০ অক্টোবর আলজেরিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সিফি ঘরিয়েবের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সফরে এলএনজি, এলপিজি, অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিসহ জ্বালানি খাতে সহযোগিতার সমঝোতা বিষয়ে একটি স্মারক সই হয়।
কাতারের সঙ্গেও নতুন দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। গত ১১ অক্টোবর সৌদি আরবে কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ বিন শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৈঠকে নতুন সরবরাহ চুক্তি ও বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। গত ২৭ অক্টোবর জাপান সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে তিনি জাপানের জেরা কোম্পানির স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শন করেন।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার খবর ‘সংসদীয় কমিটির বৈঠক: বিমানের টিকিটের দাম ও ফ্লাইট বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিটের দাম বেশি কেন, তা জানতে চেয়েছে সংসদীয় কমিটি। আবার অনলাইনে টিকিট না পাওয়া সত্ত্বেও ফ্লাইটে আসন ফাঁকা কেন থাকে এবং ফ্লাইট কেন বিলম্ব হয়, সেসব প্রশ্নও উঠেছে কমিটির বৈঠকে।
জাতীয় সংসদে গতকাল সোমবার সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কার্যক্রম ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজে বারবার ত্রুটি ও বিমানের ৭৩৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিটি।
আর চেক-ইন কাউন্টার ও বোর্ডিং গেটের সংকট, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা এবং স্থায়ী ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকাকে ফ্লাইট বিলম্বের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বিমানের উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, কুয়ালালামপুর থেকে ম্যানিলার দূরত্বের সঙ্গে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের দূরত্ব প্রায় সমান। অথচ ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটের টিকিটের দাম কুয়ালালামপুর-ম্যানিলা রুটের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এই তারতম্যের কারণ এবং ভাড়া নির্ধারণে কোনো নীতিমালা রয়েছে কি না, তা জানতে চায় কমিটি।
জবাবে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক গন্তব্যে উড়োজাহাজের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কোনো নীতিমালা নেই। এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলো নিজেরাই ভাড়া নির্ধারণ করে। পরে ভাড়া নির্ধারণে নীতিমালা করা যায় কি না, তা দেখার পরামর্শ দেয় কমিটি।
জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। গত ২৯ অক্টোবর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়নের প্রস্তুতিকালে উড়োজাহাজটিতে ত্রুটি ধরা পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ত্রুটির বিষয়টিও বৈঠকে আলোচনায় আসে। এর আগেও এ ধরনের সমস্যা হওয়ায় বারবার কেন এমন ঘটনা ঘটছে, তা জানতে চায় কমিটি।
জবাবে বিমানের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণের জন্য সব সময় বহরের আধুনিক উড়োজাহাজ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে আগের এক মাসের ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ করে কোনো ধরনের ত্রুটি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
এ ছাড়া বিমানের উড়োজাহাজ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের দায় নির্ধারণ এবং আইটি ব্যবস্থার দুর্বলতায় সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের লিফট, সেবা ও পরিবেশ নিয়ে কমিটির কয়েকজন সদস্য অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বৈঠকে একজন সদস্য বলেন, অনলাইনে বিমানের টিকিট পাওয়া যায় না। কিন্তু উড়োজাহাজে ওঠার পর অনেক আসন ফাঁকা দেখা যায়।
বৈঠকে বিমানের অডিট আপত্তি নিয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি জানতে চান, ঢাকা-গুয়াংজু-ঢাকা রুটে চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইট ও রাজস্ব আদায়ে ৭৩৬ কোটি টাকার অনিয়ম কীভাবে হয়েছে। ১৮টি অডিট আপত্তির বিপরীতে প্রমাণসহ সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা দেওয়া সম্ভব কি না, তা জানতে চান তিনি।
এ ছাড়া ত্রুটিযুক্ত উড়োজাহাজ, অচল যন্ত্রপাতি, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনা এবং পুরোনো উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও জানতে চায় কমিটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে উত্থাপিত নিরীক্ষা আপত্তির বিপরীতে কত টাকা আদায় হয়েছে, কত টাকা অনাদায়ি রয়েছে এবং এই ঘটনায় কতজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।
বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চেক-ইন কাউন্টারের স্বল্পতা, বোর্ডিং গেটে সংকট, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা এবং স্থায়ী ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকার বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসঙ্গে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চেক-ইন পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কাউন্টার নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাউন্টার বন্ধ করা সম্ভব হয় না, যা ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও সময়ানুবর্তিতা (ওটিপি) ব্যাহত করে। গেট বরাদ্দে বিলম্ব, একই গেট একাধিক ফ্লাইটে ব্যবহার এবং বোর্ডিং ব্রিজের স্বল্পতায় যাত্রী ওঠানামায় সমস্যা হয়। বিশেষ করে ৩০০ থেকে ৪০০ যাত্রী ধারণক্ষমতার ওয়াইডবডি উড়োজাহাজে বোর্ডিংয়ে বেশি সময় লাগে।
ডিপারচার ব্যাগেজ এলাকায় জায়গার সংকট এবং আগমনী ব্যাগেজ বেল্টের স্বল্পতায় লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি ফ্লাইট এলে এই সমস্যা বাড়ে। স্থায়ী ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকায় বিমান ও বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর ইউএলডি ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে, হচ্ছে আর্থিক ক্ষতিও। এ ছাড়া রিমোট বে বরাদ্দে বে নম্বর উল্লেখ না করা এবং জিএসই রাখার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিলম্ব হয়।
বৈঠকে গত ১০ অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০১ কোটি ৪৭ লাখ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি অর্থবছরগুলোতে লাভ করেছে বিমান। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৮২২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা (নিরীক্ষাধীন) লাভ হয়েছে বলে জানানো হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লাভ ছিল ৭৮৫ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮২ কোটি টাকা।
কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন।
দেশ রূপান্তর
‘নিষিদ্ধ আ.লীগ নাশকতায়’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, গত কয়েক মাস ধরে পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতামূলক কর্মকান্ডের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অসন্তোষ উসকে দেওয়া এবং তা সহিংসতায় রূপ দেওয়ার পেছনে কাজ করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ইতিমধ্যে একাধিক নেতাকর্মীর তালিকা করা হয়েছে। তা ছাড়া বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস মালিকের সম্পৃক্ত থাকার তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিরাও বলছেন শ্রমিক বেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নাশকতা চালানোর পাঁয়তারা করছেন।
এদিকে সরকারবিরোধীদের তৎপরতা রোধে ঢাকা ও গাজীপুরে বিএনপি, শ্রমিক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মহড়া দিচ্ছেন। গত কয়েক দিন ধরে যেসব এলাকায় ভাঙচুর, লুটপাট, আগুন ও সংঘর্ষ হয়েছে, ওইসব এলাকার ভিডিও ফুটেজ ধরে হামলাকারীদের ধরার চেষ্টা করছে পুলিশ।
পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার শিল্পাঞ্চলগুলোতে একের পর এক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। পুলিশের তথ্য বলছে, শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে বহিরাগতরা ঢুকে পড়ছে। তারা পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের উত্তেজিত করছে এবং কারখানা ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধ করতে বাধ্য করছে। আবার বিভিন্ন কারখানার ঝুট ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সরকার পরিবর্তনের পর তাদের প্রকাশ্যে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকলেও স্থানীয় প্রভাব বজায় রাখতে এবং সরকারকে বিপদে ফেলার কৌশল নিয়েছেন তারা।
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে গত রবিবার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় ঢাকার মিরপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের তিন শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। গতকালও কয়েকটি স্থানে শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে।
অনুপ্রবেশ করে নাশকতা : কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ শ্রমিকদের আন্দোলনে ঢুকে তাণ্ডব চালাচ্ছে। তারা ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সহিংসতা কর্মকা- করছে। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে দলটি। এমনকি ঢাকার বাইরে থেকে লোকজন জড়ো করে মিরপুরের বিভিন্ন মেসে ও আশপাশে রাখা হয়েছিল গত কয়েক দিন ধরে। তারাই শ্রমিকদের ঢাল বানিয়ে যানবাহনে হামলা ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর, ১১ নম্বর, কালশী ও আশুলিয়া, গাজীপুরসহ বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করে সড়ক অবরোধ করছে। এমনকি পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে। ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাট হয়েছে শপিংমল ও কারখানার মালামাল।
অন্তরালে থেকে অর্থ সরবরাহ: গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে আত্মগোপনে থাকা সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু পদধারী নেতা অন্তরালে থেকে অর্থ সরবরাহ করছেন। তাদের অনুসারী এবং কারখানার অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। শ্রমিকদের অবাস্তব দাবিদাওয়া সামনে এনে হুটহাট কাজ বন্ধের প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, কারখানা মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার পরও একটি বিশেষ গোষ্ঠী পর দিনই অন্য কোনো ইস্যু সামনে এনে আন্দোলন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক ডিআইজি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি মনে হলেও আমরা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট আলামত পেয়েছি। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেটওয়ার্কটি অত্যন্ত কৌশলে শ্রমিকদের ক্ষোভকে ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলে একটি স্থায়ী বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চাচ্ছে, যাতে সরকার ও অর্থনীতি উভয়েই চাপে পড়ে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নতুন উদ্বেগ : শিল্পাঞ্চলের এই ধারাবাহিক অস্থিরতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাধারণত শ্রমিক আন্দোলন নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ আন্দোলনের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকরা কারখানা ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতায় সহজে জড়ান না। কিন্তু কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, আন্দোলন চলাকালে পেট্রোল বোমা, ইট-পাটকেল সংরক্ষণ করা এবং খুব দ্রুত কারখানা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের ক্ষতি চালাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে বিদেশিরা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার বাতিল করে অন্য দেশে স্থানান্তর করবে এমন আত্মঘাতী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শ্রমিক বেশে বহিরাগত: ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, হামলার ঘটনায় আমরা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করছি। যারা এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। শ্রমিক বেশে বহিরাগতরা হামলায় অংশ নিয়েছে। এতে জড়িতদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।
শিল্পাঞ্চলে হামলা ও নাশকতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, নাশকতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে ধৃত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী শ্রমিক বেশে নাশকতা চালিয়েছে। গাজীপুর শিল্পপুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা চালানোর পাঁয়তারা করছে। গত দুই দিন তারা এসব অপকর্ম করেছে। ইতিমধ্যে আমরা তাদের পরিচয় উদ্ঘাটন করেছি। বর্তমানে গাজীপুরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।
গার্মেন্টস মালিকরাও সম্পৃক্ত: কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস মালিকের ইন্ধন থাকার তথ্য পেয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ইতিমধ্যে তাদের নজরদারি করা হচ্ছে। ডিএমপি ও শিল্পপুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে তারা মালিক-শ্রমিকের সঙ্গে বৈঠক করছেন। কিন্তু কিছু গার্মেন্টস মালিক রহস্যজনক আচরণ করছেন। তারা সহায়তা করছেন না।
সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ: নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে তদন্ত সংস্থাগুলো। যেসব কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন ক্যামেরা এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, আন্দোলনের সামনে থাকা বা ইট-পাটকেল নিক্ষেপে নেতৃত্ব দেওয়া অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক ছিল না। তারা বহিরাগত এবং অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। ভিডিওর ঝাপসা ছবিগুলোকে আধুনিক ফেস রিকগনিশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে উন্নত করে পুরনো অপরাধী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ছবির ডেটাবেজের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অনেকের মোবাইলে সন্দেহজনক যোগাযোগ বা অর্থ লেনদেনের আলামত পাওয়া যাচ্ছে, তাদের ফোন ট্র্যাকিং এবং কল ডিটেইলস রেকর্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘অর্থদাতাদের খোঁজে গোয়েন্দারা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। জুলাই আন্দোলনে সরকার পতনের পর বিদেশে পালিয়ে যাওয়া দলটির শীর্ষ নেতারা নতুন করে নাশকতার ছক কষছে। শ্রমিকদের আন্দোলনকে পুঁজি করে সারা দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নাশকতায় নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করেছে ডজন খানেকের বেশি শীর্ষ নেতা। বিদেশে পলাতক এসব নেতার পক্ষে কর্মীদের এই টাকা পৌঁছে যাচ্ছে সমন্বয়কদের মাধ্যমে। শুধু যে বিদেশ থেকে টাকা আসছে তা নয়, দেশেও ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও ব্যবসায়ীরাও অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেছেন।
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনায় খুব বেশি সুবিধা করতে না পেরে এবার শ্রমিক আন্দোলনের মাঝে থেকে নাশকতা চালাতে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ার ঘটনার পর গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে অর্থদাতা, টাকা বণ্টনের কৌশল, ইন্ধনদাতা ও সমন্বয়কদের নাম। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা ও গাজীপুরে গা-ঢাকা দেওয়া কর্মীদের এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিনিময়ে থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ভালো পদ দেওয়ার প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। নাশকতাকারীদের মধ্যে বেশি উদ্বেগ ছড়াচ্ছে পদের প্রলোভনে নতুন করে দলে ভেড়ানো অতি উৎসাহী কিশোর বয়সি কর্মীরা।
গোয়েন্দা তথ্য জানিয়েছে, মিরপুর ১০ ও এর আশপাশ এলাকায় নাশকতায় আওয়ামী লীগের বড় একটি সমন্বয়ক টিম কাজ করেছে। এই টিমে ছিল ১২ জন সদস্য। যাদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে ছয়জন। মিরপুরে নাশকতার অর্থদাতা হিসেবে নাম এসেছে সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা, বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নান কচি ও শেখ হাসিনার একসময়ের পিয়ন বিপুল অর্থ পাচারে আলোচিত পানি জাহাঙ্গীর ওরফে জাহাঙ্গীর আলম। ৩টি ধাপে বিদেশ থেকে টাকা আসে নাশকতায় অংশ নেওয়া কর্মীদের হাতে। নাশকতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে আলাদা টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। প্রথমে অর্থদাতার কাছ থেকে সমন্বয়ক, তারপর বিভিন্ন এলাকা থেকে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের মাধ্যমে ৫-৭ জনের ছোট গ্রুপের দলনেতাদের কাছে, সেখান থেকে নাশকতায় অংশ নেওয়া কর্মীদের হাতে পৌঁছায় টাকা।
নির্দেশনা মেনে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর নিজের দলের সবাইকে নিয়ে গ্রুপ ছবি তুলে পাঠালেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে চলে আসে টাকা। সাতজনের একটি টিমের শুধু শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নিতেই বরাদ্দ থাকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এরপর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ভিডিও পাঠালে আরও টাকা পাঠানো হয়। ভাঙচুরে ৩ হাজার টাকা ও অগ্নিসংযোগে ৫-১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ভিডিও ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফের ফোনে পাঠানো হয় ৩টি মোবাইল থেকে। কিন্তু সেই টাকা আসার আগেই তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে মেহেদী নামে এক তরুণ রয়েছে। সূত্র জানায়, ঘটনার আগের দিন নাশকতার প্রস্তুতির কথা জানানো ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ শনাক্ত করেছে গোয়েন্দারা। যেসব গ্রুপে সকাল থেকেই নাশকতায় অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। ২ শতাধিক নিষিদ্ধ দলের কর্মীর সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন- সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা, মহানগর উত্তর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, যুবলীগ নেতা তাজুল ইসলাম বাপ্পি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের মামুন, পানি জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুল রহমান জুয়েল। ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ গ্রুপ বেশ শক্তিশালী হওয়ায় মিরপুরে আবারও বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছে গোয়েন্দারা। এদিকে রবিবার সকালে শ্রমিক বেশে তাদের কালসীতে জড়ো হতে বলা হয়। এরপর পাঠানো হয় মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে। সেখানে তারা বিচ্ছিন্নভাবে ঘোরাঘুরি করে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এর মধ্যে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ মুখোমুখি অবস্থানে গেলে তারা পুলিশের ওপর আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি বেশি থাকায় তাদের লাভ রোডে যেতে বলা হয়। লাভ রোড থেকে মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে নাশকতা শুরু করে তারা। মিরপুর-১০ নম্বর থেকে পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে আসতে আসতে নাশকতাকারীদের বড় অংশ মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থান নেয়। গ্রুপ নির্দেশনা অনুযায়ী সেখানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের কথা থাকলেও পুলিশের ধাওয়ায় সেটি করতে পারেনি। মিরপুরের ঘটনায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ১১ জনের মধ্যে মো. কামাল গাজী ও আরিফ আকন্দ মোবাইলে ছবি ও ভিডিও দেওয়ার পর তাদের মধ্যে কামালকে ৩৫০০ টাকা ও আরিফকে ৩ হাজার টাকা পাঠানো হয়। সূত্র বলছে, মিরপুর এলাকায় অর্থদাতা আওয়ামী লীগের ৩ নেতা ছাড়াও বিদেশে পলাতক ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান ও মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সাব্বির হোসেন অর্থায়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ডিবি মিরপুর বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মিরপুরে নাশকতার পেছনে বেশ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তদন্তে যাদের নাম আসছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কে দেশে আছে, আর কে বিদেশে আছে- আইন সেটির ওপর নির্ভর করে চলে না। সুতরাং নাশকতার চেষ্টা কিংবা ইন্ধন দিলেই ব্যবস্থা।
