যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয়ের প্রত্যাশা করছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। ঐতিহাসিকভাবে কম জনপ্রিয় একজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাড়তি দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট মার্কিন জনগণ এবং কয়েক মাস ধরে অনুকূলে থাকা জনমত জরিপ—সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভালো ফলের আশা করছে দলটি।
জনমত জরিপ বলছে, কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের চেয়ে অনেক বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ডেমোক্র্যাটরা সমানে সমান কিংবা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের এক জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় সিনেট নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্প এই রাজ্যে ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে সিএনএনের সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপে টেক্সাস, কানসাস ও মেইনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
কিন্তু জনমত জরিপ কতটা নির্ভুল?
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগের জনমত জরিপও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৬ ও ২০২৪ সালে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পথে জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো ফল করেছিলেন ট্রাম্প। ২০২০ সালে তার সামান্য ব্যবধানে পরাজয়ের আগে অধিকাংশ জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের বড় জয়ের আভাস দেয়া হয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুতেও মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক নির্বাচনে আবদুল এল-সায়েদের দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল জরিপগুলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যবধান ছিল মাত্র ১ শতাংশ। উইসকনসিনে গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনেও জরিপে প্রায় ২০ পয়েন্টে এগিয়ে থাকা প্রার্থী এক শতাংশেরও কম ব্যবধানে হেরে যান।
রাজনৈতিক ও বাজার গবেষণাভিত্তিক জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইপসোস পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট ক্লিফোর্ড ইয়ংয়ের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনমত জরিপ পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ, অনেক মার্কিন নাগরিক ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছেন এবং অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোন ধরছেন না। আবার যাদের সঙ্গে জরিপকারীরা যোগাযোগ করতে পারছেন, তাদের অনেকেই মতামত জানাতে আগ্রহী নন।
ইয়ং বলেন, ‘রক্ষণশীলরা, বিশেষ করে কট্টর ডানপন্থিরা স্বভাবগতভাবেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি অনেক বেশি বিরোধী। তারা কোনো কিছুতেই অংশ নিতে চান না। তারা পুরো ব্যবস্থাটিকেই ঘৃণা করেন। এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।’
যদি রিপাবলিকান ভোটারদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে জরিপে কম প্রতিনিধিত্ব করেন এবং জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভোটারদের মডেল তৈরির সময় বিষয়টি বিবেচনায় না নেয়, তাহলে জরিপের ফল ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ঝুঁকে পড়তে পারে।
এ কারণেই ভোটারদের প্রকৃত চেহারা ও নির্বাচনে কারা ভোট দিতে আসবেন, তা অনুমান করা জরিপকারীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
আগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জরিপের চেয়ে ভালো ফল করার একটি ব্যাখ্যা হলো, তার সমর্থকদের অনেকেই নিয়মিত ভোটার ছিলেন না। কিন্তু নির্বাচনের সময় তারা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে কেন্দ্রে হাজির হয়েছিলেন।
ভোটারদের এই অনিশ্চিত আচরণই সাম্প্রতিক সময়ে জনমত জরিপের বড় ধরনের ভুলের অন্যতম কারণ। যদিও অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য জরিপে ভুলের ব্যবধান ছিল কয়েক শতাংশ পয়েন্টের মধ্যে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন খুব কাছাকাছি হয়, তখন এই সামান্য ব্যবধানই কোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দিতে পারে।
চলতি বছরের গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনগুলোর অনেকগুলোতেই এমন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সাধারণ নির্বাচনে জনমত জরিপ তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এর একটি কারণ, এসব নির্বাচনে ট্রাম্পের মতো ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সরাসরি ব্যালটে থাকেননি।
২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জরিপগুলো ইঙ্গিত দিয়েছিল, বাইডেনের জনপ্রিয়তা কম থাকলেও ডেমোক্র্যাটরা প্রচলিত রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয় এড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত দলটি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ব্যবধান ছিল সামান্য। তবে সিনেটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয় তারা।
ইয়ং বলেন, চলতি বছরের প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলেও প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবেই বেশ অনিশ্চিত। এসব নির্বাচনে ভোটাররা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। তাই প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সাধারণ নির্বাচনের বর্তমান জরিপগুলো ভুল হচ্ছে বলে ধরে নেয়া ঠিক হবে না।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমলেও ডেমোক্র্যাটদের সামনে চ্যালেঞ্জ
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে খারাপ ফলের মুখোমুখি হতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ওই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৬০টিরও বেশি আসন নিজেদের দখলে নেয় এবং সিনেটেও আসন বাড়ায়।
তখন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছিল। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার নিয়ে রক্ষণশীলদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ের পূর্বাভাস থাকলেও পরাজয়ের মাত্রা এতটা বড় হবে, তা ধারণা করা হয়নি।
এবার পরিস্থিতি উল্টো। ডেমোক্র্যাটরা বিরোধী দলে এবং ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কম থাকা কিংবা ইতিহাসের প্রচলিত ধারা বিবেচনায় ডেমোক্র্যাটরা যতটা ভালো ফল আশা করছে, বাস্তবে তা নাও হতে পারে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এবারের নির্বাচনে যেসব এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, তার বড় একটি অংশেই মাত্র দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সহজে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। ফলে এসব এলাকাকে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বছরের পর বছর প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী এলাকার সীমানায় পরিবর্তনের ফলে দলগুলোর মধ্যে আসন হাতবদলের সুযোগ কমে এসেছে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর হওয়ায় দোদুল্যমান ভোটারের সংখ্যা কমেছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বর্তমান ভোটার পরিস্থিতিকে প্রায় স্থবির বা অপরিবর্তনীয় বলে বর্ণনা করছেন।
এ ছাড়া নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে রিপাবলিকানরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর সুযোগ পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে দলটি।
জরিপের গড় ফল কতটা নির্ভরযোগ্য?
জনমত জরিপের মডেলগুলো ভোটারদের পরিবর্তিত মনোভাব ও নির্বাচনের মৌলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা হয়। একটি ভালোভাবে পরিকল্পিত জরিপে এমন বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা হয়, যেগুলো ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে।
প্রতিটি জরিপেরই একটি নির্দিষ্ট ভুলের সীমা থাকে। নমুনা হিসেবে নেয়া মানুষের সংখ্যা এবং সামগ্রিক ভোটার জনগোষ্ঠীর আকারের তুলনার ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যানগত অনিশ্চয়তা নির্ধারিত হয়। তবে একক কোনো জরিপের পরিবর্তে একাধিক জরিপের গড় ফলাফল বিশ্লেষণ করলে তুলনামূলকভাবে নির্ভুল ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বর্তমান জরিপগুলোর প্রবণতা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে ধরনের জরিপগত বিচ্যুতি দেখা গেছে, সেটি থাকলেও ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভালো ফল করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আবার জরিপের ভুল সব সময় একদিকে যায় না। গত বছরের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন ও বিশেষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা অধিকাংশ জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো ফল করেছিল। কারণ, তাদের ভোটাররা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে এসেছিলেন।
প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে ২০২৪ সালে যেসব অঙ্গরাজ্যে সহজে জয় পেয়েছিলেন, সেসব এলাকায় ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশ করার ঘটনাও ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করেছে। তাদের ধারণা, রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ জরিপে দলটির প্রার্থীদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।
তবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তনের সুযোগ থেকেই যায়। অনেক সময় শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, যা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র বদলে দিতে পারে। আবার এখনো যারা সিদ্ধান্ত নেননি, তাদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত একই প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে পারেন।
জনমত জরিপে কিছুটা অনিশ্চয়তা সব সময়ই থাকবে। সেই অনিশ্চয়তা সামাল দেয়াই জরিপ পরিচালনার বিজ্ঞান ও কৌশলের অংশ।
ইয়ং বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা আগের চেয়ে ভালো কাজ করছি। তবে আমাদের সব সময়ের একটি সমস্যা হলো, বিষয়টি শুধু জরিপকারীদের নিয়ে নয়। আমরা মানুষের আচরণ নিয়ে কাজ করছি। আর মানুষকে বোঝা সহজ নয়।
