প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীর মাঠে যান তাহসিফ

রিমান্ডে দীপের ভাষ্য

প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীর মাঠে যান তাহসিফ

ফন্ট সাইজ:

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ৪ দিনের রিমান্ডে থাকা তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপ পুলিশকে জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর রাতে বান্ধবী জেরিকা তাসনীম দিশার সঙ্গে সোনারগাঁ জনপথের পাশের নেস্টবারে মদ্যপ অবস্থায় বিরোধের পর হেরোইন কিনতেই টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যান তাহসিফ। আর ওই তুরাগ তীরের মাঠে বসে মাদক (হেরোইন) সেবন করেই তাহসিফ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুলিশের ভয়ে নদীর দিকে দৌড় দেন।

তবে তাহসিফকে তুরাগ নদে পড়ে যাওয়া নিজে চোখে দেখেননি দীপ। একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজের সময় বলছে- দীপ রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে মাঠ থেকে একা বের হয়ে আসেন। আর ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মার ফোনে ভয়েজ পাঠিয়ে বলেন- রওনা হয়েছি। তাই তাহসিফ ঠিক কীভাবে পানিতে পড়ে মারা গেলেন, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশায় তদন্তকারীরা।

দীপের বরাত দিয়ে মামলাটির তদন্ত করা টঙ্গী নৌ পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নিহত তাহসিফের বান্ধবী দিশা কিছু দিন আগে অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে ওই যুবকের সঙ্গে দিশার শারীরিক সম্পর্কও হয়। আর এই পুরো বিষয়টি জেনে যান তাহসিফ। এরই প্রেক্ষিতে ২৭ অক্টোব দিশাকে ফোন করে দেখা করতে বলেন তাহসিফ। এরপর তাকে নিয়ে নেস্ট বারে যান। বারে প্রবেশের পর তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে স্যাড সং বাজাতে বলেন। এরপর বারের ওয়েটাররা তাদের মদ পরিবেশন করেন। প্রায় ঘন্টা দেড়েক তারা দুজনে মদ পান করেন। ওই সময়ে দীপও তাদের সঙ্গে মদ পান করেন। মদ্যপানের এক পর্যায়ে তাহসিফ অন্য এক যুবকের সঙ্গে ইয়াবা সেবন এবং তার সঙ্গে রাত কাটানোর বিষয়ে দিশাকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বেশ ঝগড়াও হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ দিশাকে বলেন, তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব। এরপর তারা তিনজনই বার থেকে বের হয়ে যান।
বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তার বাসায় পৌঁছে দেন। ওই সময় দীপও নিজের মোটরসাইকেলে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে যান। তাদের দুজনের বাসা সামনাসামনি। দীপ রিমান্ডে বলেছেন, শুধু ওইদিনই নয়, তারা প্রায়ই বিভিন্ন বার ও রেস্টুরেন্টে যেতেন। দিশাও যেতেন তাহসিফের সঙ্গে। ওইদিন দিশাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে তাহসিফ ও দীপ নিজ নিজ মোটরসাইকেলে টঙ্গী মাজার বস্তি সংলগ্ন মাঠের উদ্দেশে রওনা হন।

মাঠের পাশের বস্তির কাছেই দোকানের সামনে তারা দুজনই মোটরসাইকেল পার্ক করে। এরপর গলি দিয়ে মাঠের দিকে যায়। ওই সময় মাঠে আরও অনেক লোকজন উপস্থিত ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই স্থানীয় মাদকসেবী ও মাদক কারবারি।
মাঠে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, ‘কার কার কাছে হেরোইন আছে, নিয়ে আসো। যত টাকা লাগে আমি দেব।’ এ সময় উপস্থিত মাদক কারবারিদের একটি দল তাদের কাছে আসেন। পরে তাদের কাছ থেকে মাদক কিনে সেবন করেন তাহসিফ। বারে মদ্যপানের পর মাঠে গিয়ে মাদক সেবন করায় তাহসিফ ওই রাতে নিজের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। মাঠে তাহসিফ যখন মাদক সেবন করছিলেন, তখন সেখানে পুলিশের একটি টহল দল চলে আসে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা যে যার মতো পালিয়ে যান। একইসঙ্গে দীপও সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান। পরে নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকেন তিনি।
দুই থেকে তিন মিনিট পর পিলারের পেছনে গিয়ে দুই পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন। পুলিশ সদস্যরা তার নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি নিজের নাম-পরিচয় এবং বাসার ঠিকানা মোহাম্মদপুর বলে জানান। তখন পুলিশ সদস্যরা তাকে প্রশ্ন করেন, তার বাসা মোহাম্মদপুরে হলে এত রাতে সেখানে কেন এসেছেন। জবাবে দীপ বলেন, তিনি ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু, একটি কাজে সেখানে এসেছেন।
তখন পুলিশ সদস্যরা তাকে বলেন, এত রাতে সেখানে না থেকে বাসায় চলে যেতে। তবে পুলিশের পেছনে না গিয়ে দীপ বস্তির একটি সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যান। বস্তির ভেতরে ঢোকার পর তিনি রাস্তা চিনতে পারছিলেন না। তখন এক মাদকসেবীকে মূল সড়কে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে মূল সড়কে আসেন তিনি। মূল সড়কে পৌঁছানোর পর আগের রাস্তা চিনে চিনে মাঠের দিকে ফিরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় আসেন দীপ। এরপর তাহসিফের ফোনে একাধিকবার কল করেন। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান। পরে নিজের মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। তবে তাহসিফকে পানিতে পড়তে দেখেননি বলে দাবি করেছেন দীপ।

বিষয়টি নিয়ে মামলার তদন্তকারি ওই কর্মকর্তা বলেন,
দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। তার বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তাহসিফের লাশে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বারে গিয়েও যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সব কিছু যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এটি হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। হয়তো যখন সবাই পুলিশ দেখে দৌড়ে পালাতে চেয়েছিলেন, তখন তিনিও সেখান থেকে সরে যেতে গিয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে পড়ে যেতে পারেন। যেহেতু দীপ ও দিশা রিমান্ডে রয়েছেন, তাই তাদের এ বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে দীপের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনায় প্রাথমিক তদন্তে এই মৃত্যু হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে না।
এরপরও তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তে জানা যাবে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তিনি মাদক সেবন করেছিলেন কি না কিংবা তার শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও জানা যাবে। আর এই জন্যই তাহসিফের শরীরের রক্ত, পাকস্থলী, কিডনিসহ বিভিন্ন অর্গান নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ভিসেরা ও রক্তও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে সেই রাতের টঙ্গী মাজার বস্তির একটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখা যাচ্ছে, তাহসিফ ও দীপ রাস্তায় মোটরসাইকেল পার্ক করে বস্তির একটি গলির মধ্যে দিয়ে তুরাগ তীরের মাঠের দিকে যাচ্ছে। ওই সময়ে তিন মহিলা তাদেরকে যেতে নিষেধ করছেন। বলছেন - এই তোমরা চলে যাও। তবে ওই সময় তাহসিফ ইংরেজিতে দীপকে বলছেন, বেশি কথা বলো না, হাটো।

উল্লেখ্য, গত ২৭শে অক্টোবর জুনিয়র বন্ধু দীপের ফোনেই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাসা থেকে বের হন বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। এরপর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গভীর রাতে দীপকে সাথে নিয়েই টঙ্গী মাজার বস্তিতে যান তাহসিফ। ওই রাত থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। পর দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে স্থানীয়দের মাধ্যমে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর-৯৯৯ এ খবর পেয়ে মাজার বস্তি থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে রাজধানীর উত্তরখানের তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা।