সাইবার যুদ্ধের যুগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কোথায়

সাইবার যুদ্ধের যুগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কোথায়

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জগুলোর একটি আবারও বড় ধরনের সাইবার হামলার শিকার। তদন্তকারী সংস্থাগুলো আঙুল তুলছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র-সমর্থিত ল্যাজারাস গ্রুপের দিকে। অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু আরেকটি হ্যাকিংয়ের ঘটনা নয়; এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সাইবার অপরাধকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শোনা যাচ্ছে এই একই গোষ্ঠীর নাম জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, সনি পিকচার্সে হামলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত বহু আলোচিত সাইবার অপরাধের সঙ্গে।
বাংলাদেশের জন্য এ ঘটনা তাই নিছক আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়। এটি একটি আয়না, যেখানে আমাদের নিজেদের প্রস্তুতির ঘাটতিগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর দেশের নীতিনির্ধারকদের মুখে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়েছিল। বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না। কিন্তু এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা আসলে কতটা বদলেছি? আমাদের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি ডেটাবেজ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কি সত্যিই নিরাপদ? নাকি আমরা এখনো ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে আছি যে পরবর্তী আঘাতটি অন্য কোথাও গিয়ে লাগবে?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে, কিন্তু সেই গতিতে সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী হচ্ছে না। কোটি কোটি মানুষ ডিজিটাল লেনদেন করছে, সরকারি সেবা অনলাইনে চলে যাচ্ছে, নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য বিশাল ডেটাবেজে জমা হচ্ছে। অথচ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের সংকট এবং সমন্বয়ের অভাব নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যায়। ডিজিটাল অবকাঠামো যত বড় হচ্ছে, ঝুঁকির পরিধিও তত বিস্তৃত হচ্ছে।

বিশ্ব এখন বুঝে গেছে, সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একক বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি সফল সাইবার হামলা কখনো কখনো একটি সামরিক হামলার চেয়েও বেশি ক্ষতি করতে পারে। ব্যাংকের অর্থ উধাও হয়ে যেতে পারে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল হতে পারে, রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস হতে পারে, এমনকি জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দুঃখজনকভাবে, আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তাকে খরচ হিসেবে দেখি, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, কিন্তু নিরাপত্তা অডিট, নিয়মিত পরীক্ষণ কিংবা দক্ষ সাইবার বিশেষজ্ঞ তৈরির ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব দেখা যায় না। ফলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর যেন বালির বাঁধ তুলে রাখা হচ্ছে, যা যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের এখন অবিলম্বে কয়েকটি বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমত, সাইবার নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আপসের কোনো সুযোগ রাখা যাবে না। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাইবার নিরাপত্তা শিক্ষা ও গবেষণায় বড় বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে বিদেশি বিশেষজ্ঞের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়। চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি, কারণ হ্যাকাররাও এখন এআই ব্যবহার করছে। আর পঞ্চমত, নাগরিক পর্যায়ে ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া কোনো নিরাপত্তা কৌশলই সফল হবে না।

উত্তর কোরিয়ার ঘটনা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রাকৃতিক সম্পদ বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, জ্ঞান ও দক্ষতাই ভবিষ্যতের ক্ষমতার উৎস। একটি ছোট ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র যখন সাইবার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, তখন বাংলাদেশও চাইলে দক্ষ জনশক্তিকে সম্পদে পরিণত করতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত কি না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ছিল সতর্কবার্তা। বাইন্যান্সে হামলা সেই সতর্কবার্তার পুনরাবৃত্তি। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, সতর্কবার্তা যারা উপেক্ষা করে, তারা শেষ পর্যন্ত মূল্য দেয় সবচেয়ে বেশি। তাই এখন আর আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে টেকসই করতে হলে সাইবার নিরাপত্তাকে প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় এজেন্ডায় পরিণত করতে হবে।

কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ডাকাত হয়তো ব্যাংকের দরজা ভেঙে ঢুকবে না; সে ঢুকবে একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড, একটি অসতর্ক ক্লিক কিংবা একটি অরক্ষিত সার্ভারের মাধ্যমে। আর তখন অনুশোচনার সুযোগ থাকবে না, থাকবে শুধু ক্ষতির হিসাব।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।

ই-মেইল: [email protected]