উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় টানা দুই বছর ফলের নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছর পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সর্বনিম্ন। এবার পরীক্ষায় অংশ নেয়া প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। তাদের মধ্যে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েই ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। একইসঙ্গে গত ৮ বছরের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও সর্বনিম্ন। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ২৯ হাজার।
শনিবার সারা দেশে একযোগে এই ফল প্রকাশিত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফল ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন। ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ বছর অংশ নেয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। সর্বশেষ ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এরপর গত ২২ বছরে পাসের হার আর এত নিচে নামেনি। গত ১০ বছরের পাসের হারে দেখা যায়, ২০১৬ সালে ৭২ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৭২ শতাংশ, ২০২০ সালে ১০০ শতাংশ (অটোপাস), ২০২১ সালে ৯৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ২০২৫ সালে ৫৮.৮৩ শতাংশ।
এদিকে, পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। শতকরা হিসাবে কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। এবারের ফল বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ইংরেজি ও আইসিটি। ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী। আর আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয় মিলিয়ে ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। অর্থাৎ মোট ফেল শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের ফল খারাপ হয়েছে এ দুই বিষয়ে।
ইংরেজিতে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। কুমিল্লায় ৬৪ দশমিক ৮৩, চট্টগ্রামে ৬৫ দশমিক ৭৭ এবং সিলেটে ৬৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বাকি বোর্ডগুলোতে ইংরেজিতে পাসের হার ৫০ শতাংশের ঘরে। আইসিটিতেও প্রায় একই চিত্র। ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৭০ শতাংশের ঘরে। অন্যদিকে বরিশাল, যশোর ও রাজশাহী বোর্ডে আইসিটিতে পাসের হার ৬০ শতাংশের ঘরে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বোর্ড, ৬১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম, ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। তৃতীয় ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং চতুর্থ সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার বরিশাল বোর্ডে, ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যশোর বোর্ডে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২, রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ০৬, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ এবং কুমিল্লায় ৪৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এ হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২। এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৯টিতে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫। এবারের ফলাফলে পাসের হারে ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন মেয়েরা। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা এগিয়ে। এবার ২০ হাজার ৩৬৩ জন ছাত্র এবং ১৯ হাজার ৭২১ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন এবং দুই বিষয়ে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন। এসব শিক্ষার্থীর জন্য এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার আয়োজনের পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়াও খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন আগামী ১ থেকে ৭ই নভেম্বরের মধ্যে শুরু। এক বা দুই বিষয়ে ফেল করাদের পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখও গতকাল ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশের বাইরের কেন্দ্রগুলোতে ৯০ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। এসব কেন্দ্রে মোট ২৩০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২০৯ জন। বিদেশে মোট ৮টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে শতভাগ পাস করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের ঘটনা নেই।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ফলাফলের এমন পতন বা বিপর্যয় কখনোই প্রশংসনীয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জন, পাঠদান পদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা ও শিক্ষার পরিবেশে নানা ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ত্রুটি বা অসঙ্গতি হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুনর্নিরীক্ষণের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এর আগে এসএসসি পরীক্ষার প্রায় ১৩ লাখ উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। ফেল থেকে পাস করেছেন প্রায় পাঁচ হাজার এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৯ জন। পুরো পরীক্ষা ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। মূল্যায়নে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেয়া হবে। গত ১৭ বছরের শিক্ষক নিয়োগের জট ও দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি জানান, সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে শতভাগ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা হয়েছে। অতীতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে মেধার সঠিক মূল্যায়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো খাতার পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে একটি বছর বাঁচাতে সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার আয়োজন করা হবে। ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন রিমন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব কেরামত আলীসহ সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় ২রা জুলাই। ৮ই আগস্ট লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে স্থগিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
