অক্টোবরেই প্রাণ গেল ১৫ জনের

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ থাবা

অক্টোবরেই প্রাণ গেল ১৫ জনের

ফন্ট সাইজ:

কুয়েত থেকে দেশে ফিরছিলেন বাবা। অসুস্থ মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাবেন- এমন আশাই ছিল তার মনে। কিন্তু মাঝ আকাশেই পেলেন আট বছরের মেয়ে ঐশীর মৃত্যু সংবাদ। মেয়েকে শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল মরদেহ। শুক্রবার সকালে বাড়িতে পৌঁছেই মেয়েকে দেখতে ছুটে যান তিনি। তার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরের উত্তর কাট্টলী সনদ দত্ত মহাশ্মশানে ঐশীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মারা যায় ঐশী দাস। কাট্টলী আইডিয়াল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল সে। নগরের কাট্টলী এলাকার বাসিন্দা কুয়েতপ্রবাসী লিটন দাস ও লিপি দাস দম্পতির দুই মেয়ের ছোটটি ঐশী। বড় মেয়ে রুহি দাস সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। জানা গেছে, জ্বর হওয়ার পর প্রথমে ঐশীকে নগরের মা ও শিশু হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে তাকে রয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত বুধবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউ’র প্রয়োজন হয়। এরপর তাকে নগরের সাজিনাস হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।

ঐশীর আগে ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে অন্তঃসত্ত্বা আনিসা দাশ মলির জীবনও। আগামী মাসেই দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেয়ার কথা ছিল তার। পরিবারে নতুন অতিথিকে ঘিরে চলছিল নানা আয়োজন। কিন্তু সেই আনন্দের অপেক্ষা আর পূরণ হলো না। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনাগত সন্তানসহ মারা যান মলি। মাতৃহারা হয়েছে তার ছয় মাসের কন্যাশিশু। স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা স্বামী রাজীব সরকার।

মলি আনোয়ারা উপজেলার ৭ নম্বর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলপাড়া গ্রামের মেয়ে। স্বামী ও ছয় মাসের মেয়েকে নিয়ে ছিল তার ছোট্ট সংসার। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে মলির। সংকটাপন্ন অবস্থায় গত ২৪শে অক্টোবর সকালে তাকে চট্টগ্রামের মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও ২৫শে অক্টোবর ভোরে সেখানে তার মৃত্যু হয়। রাজীব সরকার বলেন, ‘ডেঙ্গু পরীক্ষায় পজিটিভ এসেছিল। আগামী মাসে সন্তান জন্ম দেয়ার তারিখ ছিল। হঠাৎ জ্বরে এভাবে চলে যাবে, ভাবতে পারিনি। সে কোনো কথাও বলতে পারেনি। এখন মেয়েটাকে নিয়ে আমি আর আমার মা আছি।’

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে। এ দুই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১৬ জন। অক্টোবরের ১ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬০৮ জন এবং মারা গেছেন ১৫ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ডেঙ্গুতে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগর, ১৫টি উপজেলা এবং আশপাশের জেলা থেকে আসা রোগীসহ মোট ৭ হাজার ৭৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নগরীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬ হাজার ৮০০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৭৪ জন।

সেপ্টেম্বরে আক্রান্তদের মধ্যে নগরীর বাসিন্দা ১ হাজার ১৬৬ জন, ১৫টি উপজেলার ১ হাজার ৪৮ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে আসা ২১৬ জন। উপজেলা পর্যায়ে আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কর্ণফুলী। সেখানে এ পর্যন্ত ৩৩৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। বাকি ১৩টি উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ থেকে ২৩৪ জনের মধ্যে। নগরের আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা নুরুল কবির বলেন, দিনের বেলায় মশার উৎপাত তুলনামূলক কম থাকে। তবে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জানালা দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা ঘরে প্রবেশ করে। মশক নিধনে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে উপদ্রব কমছে না।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কারও জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এদিকে নগরীতে মশকনিধন কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। গত ২৯শে অক্টোবর চসিক প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্যিক প্রতিনিধিসহ তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। বৈঠকে মশকনিধনে বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন ও বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে চসিকের চলমান ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) প্রযুক্তির সঙ্গে অন্যান্য আধুনিক পদ্ধতির সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

চসিক প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মশকনিধন কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পরীক্ষিত, পরিবেশসম্মত ও কার্যকর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগাতে চায় চসিক। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
বিটিআই একটি জৈবিক লার্ভিসাইড, যা মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়। তবে এটি পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের বিকল্প নয়। তাই লার্ভা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মশক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই চসিকের লক্ষ্য বলে জানান প্রশাসক।