সংবিধান সংস্কারে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো সংশোধন করতে হলে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। বিরোধী দলকে আলোচনায় আসতে হবে। আলোচনা না করে কথায় কথায় লংমার্চ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভবিষ্যতে যেন দেশে আর কখনো স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, কোনো স্বৈরশাসকের উত্থান না ঘটে, সেই পথগুলো বন্ধ করতে হবে। এমন সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কেউ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে। এটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা।
শনিবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মুনসুন থিয়েটারে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শীর্ষ এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাকে ‘মাস্টার অব অল সাবজেক্ট’ বলে অভিহিত করায় আমি শঙ্কিত। প্রকৃতপক্ষে আমি নিজেকে এত বিষয়ে পারদর্শী মনে করি না। আগামী ২০ বছর পর বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। বিচার বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, বিচার বিভাগ সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্বেই পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় মূলত ডাকপিয়নের কাজ করে; তারা শুধু চিঠি ইস্যু করে। বিচার বিভাগ তার নিজস্ব নিয়মেই পরিচালিত হয়। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থার ধারণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংশোধনী আনা গেলে তা জাতির জন্য কল্যাণকর হবে। রাজনৈতিক বিভক্তি, ধর্মীয় বিভাজন কিংবা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে সমাজকে বিভক্ত করা উচিত নয়। দেশের নাগরিক হিসেবে সবার পরিচয় বাংলাদেশি। তাই দেশের স্বার্থ, জাতীয় ঐক্য এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাংবিধানিক সংশোধনীর ক্ষেত্রে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত, আলোচনা ও ঐকমত্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে বিভাজন তৈরি হোক, তা কাম্য নয়। দেশের নাগরিক হিসেবে সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ, জাতীয় ঐক্য এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি উদ্যোগে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বর্তমান সময়ের বাস্তবতা ও তরুণ প্রজন্মের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এমন রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা সুরক্ষিত থাকবে। এ লক্ষ্য অর্জনে দল-মত নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সংবিধান। তবে এতে কিছু ভালো বিধানও ছিল। তার মতে, সংবিধানে অসাধারণ কিছু বিষয় থাকলেও চতুর্থ সংশোধনী ছিল সবচেয়ে জঘন্য। উচ্চকক্ষ গঠন প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, উচ্চকক্ষ যদি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গঠন করা না হয়, তাহলে এ খাতে অর্থ ব্যয় না করার অনুরোধ জানাচ্ছেন তিনি। উচ্চকক্ষের সদস্যদের বেতন, গাড়ি কিংবা বাড়ির মতো সুযোগ-সুবিধা দেয়ারও বিরোধিতা করেন তিনি। তার মতে, দেশের জন্য কাজ করতে আগ্রহী ব্যক্তিরা নিজ উদ্যোগে এ দায়িত্ব পালন করবেন। সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলে তাদের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। বিচারক নিয়োগব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, তার হাতে বিকল্প থাকলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের মধ্য থেকে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থা করতেন। কারণ, উচ্চ আদালতের অনেক আইনজীবী কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
ফলে বিচারক হওয়ার পর তাদের পক্ষে স্বাধীনভাবে বিচার করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ কারণে আইনজীবীদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগের পক্ষে নন তিনি। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, সরকারকে প্রকৃত জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হলে বিচার বিভাগ স্বাধীন রাখতে হবে। বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বর্তমানে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, এমন ব্যক্তিকেও উচ্চ আদালতের বিচারক হতে দেখেছেন, যারা যথাযথ পড়াশোনা করেননি। তাদের কেউ কেউ তার সরাসরি ছাত্র ছিলেন। এ সময় নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ উচ্চ আদালতের হাতে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শও দেন তিনি। বাকশাল প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, বাকশালের মাধ্যমে এক ব্যক্তির শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, কোনো দলের নয়। তার মতে, বিচার বিভাগ ভালোভাবে পরিচালিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হলে তারা সরকারের প্রতি অনুগত হয়ে পড়েন। তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সাবেক সদস্য ফিরোজ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে দুর্বল করার মতো কোনো বিধান সংবিধান সংস্কার কমিশন করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীকে কার্যকর রেখে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কমিশন বিশেষভাবে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। এমনকি জরুরি অবস্থার মধ্যেও সরকারকে দুর্বল করার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সুযোগ পেয়েও তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, ওই সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইন অত্যন্ত বাজেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ আইনে অনেক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমান সরকারও একই ধরনের কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন ফিরোজ আলম। সেমিনারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ।
