সূর্যোদয়ের দেশে নতুন ভোরের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর ঘিরে যে আশার সঞ্চার হয়েছে, তা কেবল স্বাক্ষরিত চুক্তি কিংবা প্রত্যাশিত আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই সফরে উঠে এসেছে এমন এক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা, যে দেশ কর্তৃত্ববাদী শাসন পেরিয়ে ফিরে পাওয়া রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকে কাজে লাগাতে চায় বৃহত্তর অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং নিজের পথ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা বাড়াতে।
জনগণের নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, যে মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সরকারকে বেছে নিয়েছে , তাদের জীবন কীভাবে আরও ভালো হবে? বাংলাদেশের প্রয়োজন কর্মসংস্থান, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, শক্তিশালী শিল্প খাত এবং মানুষের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান। দেশের কূটনীতিকে এসব লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে নিজের পথ নিজেই নির্ধারণের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা।
এই প্রচেষ্টায় জাপানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন পুনর্গঠনের সংগ্রামে, তখন দেশটি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে জাপানের সহায়তায় গড়ে উঠেছে সড়ক, বন্দরসহ অর্থনীতির বিকাশে প্রয়োজনীয় নানা অবকাঠামো। ঢাকার মেট্রোরেল, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী বন্দরের উন্নয়ন এমন এক বন্ধুত্বের নিদর্শন, যা সরকার ও প্রজন্মের পরিবর্তন পেরিয়েও অটুট রয়েছে।
এই ধারাবাহিক অংশীদারত্বই এবারের সফরকে এতটা তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। গণতন্ত্রে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন দেশের ভেতরে জবাবদিহি বাড়িয়ে পুরোনো বন্ধুত্বকে আরও এগিয়ে নেয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো, সেই আস্থাকে বাস্তব সুফলে রূপ দেয়া, সড়ক ও বন্দরের সঙ্গে শিল্পকারখানার সংযোগ গড়ে তোলা, প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো এবং পারস্পরিক সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যারা বিশ্ববাজারে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
২৭ অক্টোবর তাঁদের বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথ উঠে এসেছে। বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা বিগ-বি উদ্যোগের উন্নীত সংস্করণ—‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’, যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বকে একসূত্রে এনেছে। এতে বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগর ঘিরে শিল্প, জ্বালানি ও বাণিজ্যের সংযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো কতটা সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেয়া যায়, তার ওপর।
আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে, অর্থাৎ প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এটি একটি প্রাক্কলন হলেও অঙ্কটি সুযোগের ব্যাপকতা বোঝায়। এই সম্ভাবনাকে কর্মসংস্থানে রূপ দিতে শুল্ক ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সুস্পষ্ট বিধিবিধান নিশ্চিত করার কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।
জাপানও এই অংশীদারত্ব থেকে লাভবান হতে পারে। উৎপাদনশীল বাংলাদেশ দেশটিকে শিল্পোৎপাদনের সুযোগ, পণ্যের চাহিদা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে উন্নত সংযোগ দিতে পারে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো আনতে পারে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। বাংলাদেশের রয়েছে শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা এবং ক্রমবর্ধমান বাজার। এই পারস্পরিক বিনিময় এবং আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা শেষ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর এখানে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিক কারণই বন্ধুত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করবে।
এই অংশীদারত্ব বাংলাদেশের এমন এক পূর্বমুখী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে চীনও রয়েছে। জুনে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে শিল্প, বাণিজ্য, সবুজ জ্বালানি ও যোগাযোগে সহযোগিতা এগিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এসব অঙ্গীকারের গুরুত্ব অটুট রয়েছে। টোকিওর সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান বন্ধুত্বে প্রভাব ফেলবে না। দুই দেশের ভূমিকা একে অন্যের পরিপূরক হওয়ার সুযোগও রয়েছে। উন্নত পরিবহনব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহ সব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করতে পারে, তাদের বিনিয়োগ যে দেশ থেকেই আসুক। চীনের যন্ত্রপাতি, জাপানের শিল্পদক্ষতা এবং বাংলাদেশের উদ্যোক্তা উদ্যোগ একই অর্থনীতির বিকাশে অবদান রাখতে পারে। এই সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট চুক্তি, সুদৃঢ় মানদণ্ড এবং বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক বিবেচনা। আর যেখানে প্রতিযোগিতা হবে, সেখানে বাংলাদেশকে ব্যয়, নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং শ্রমিক ও সরবরাহকারীদের প্রাপ্ত সুফল বিবেচনায় নিতে হবে।
ভারত এখনো শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং নিজের ভূখণ্ড থেকে তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিচ্ছে, যা বাংলাদেশের অস্বস্তি বাড়িয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে হয় একটি দেশের জনগণের সঙ্গে, কোনো এক নেতা বা দলের সঙ্গে নয়। নয়াদিল্লি বলছে, ঢাকার প্রত্যর্পণ অনুরোধ এখনো আইনি পর্যালোচনাধীন। তবে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশের মানুষের ভোগান্তি ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও প্রয়োজন। ভারত কীভাবে এতে সাড়া দেয়, তার ওপর নির্ভর করবে সমতা, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা।
দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারকে চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং অর্থনৈতিক সুযোগ যেন বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন নিয়মকানুনের ওপর আস্থা। নাগরিকদের প্রয়োজন এই বিশ্বাস যে, সেসব নিয়ম জনস্বার্থ রক্ষা করবে। জবাবদিহি যখন অগ্রাধিকার ও নিয়মিত চর্চায় পরিণত হবে, তখন গণতান্ত্রিক নবযাত্রা উভয়ের আস্থাই বাড়াতে পারবে।
অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্ট। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহকারী হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করতে হবে। প্রশিক্ষণকে যুক্ত করতে হবে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে। যেসব নতুন প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেগুলো হাতে নেওয়ার আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করতে হবে এবং হিসাব রাখতে হবে, প্রকৃত বিনিয়োগ কত এসেছে, রপ্তানি কত হয়েছে এবং কত কর্মসংস্থান টিকে রয়েছে। জাপানের সঙ্গে কৃষি সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় একটি কর্মী বাহিনী রয়েছে, যা বড় পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে পারে।
দীর্ঘ ১৭ বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রবলভাবে ভারতমুখী ছিল। গণতান্ত্রিক নবযাত্রা এখন জনগণের নিজস্ব ইচ্ছাকে ভিত্তি করে এই অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণের সুযোগ এনে দিয়েছে। এসব আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাপানের সঙ্গে অংশীদারত্ব অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে চীন ও বৃহত্তর অঞ্চলের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা। নতুন ভোর তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই ভোরের আলো মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে ।
