দেশ জুড়ে উদ্বেগ

লাগামহীন ‘মব কালচার’

দেশ জুড়ে উদ্বেগ

ফন্ট সাইজ:

জমি দখল, ব্যক্তিগত আক্রোশ, কাউকে ফাঁসানো কিংবা প্রতিশোধ। সবকিছুর সহজ সমাধান ‘মব সহিংসতা’। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ধর্মকে কাজে লাগিয়ে দেদারছে চলছে মবের ঘটনা। সরাসরি মবে যুক্ত থেকেও অপরাধীরা নানা কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে। মবের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপেরও দুর্বলতা রয়েছে। অভিযুক্ত ও আসামির সংখ্যা বেশি থাকায় বেগ পেতে হয় বিচারকার্যে। আর এতে করেই দেশ জুড়ে মব কালচারের ভয়ঙ্কর বিস্তার ঘটেছে। দেশে মব কালচারের ভয়াবহতা বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়েছে। গত ১১ই অক্টোবর থেকে ১৬ দিনে মব সহিংসতায় ও গণপিটুনির ৯টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ জন নিহতসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। একটি বেসরকারি সংগঠনের তথ্য বলছে, গত ১০ দিনে সাতটি মব সহিংসতায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১৭ই অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ৫৩৭টি মবের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছেন ২৫৬ জন আর আহত হয়েছেন ৫৭৫ জন।

সংগঠনটি বলছে, গত বছর মবের এই সংখ্যা ছিল ৪২৮টি আর ২০২৪ সালে ছিল ১৬৯টি। আর আইন ও বিচার কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, এ বছর মব সহিংসতায় ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬৩ জন, খুলনা বিভাগে ২২ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৮ জন, রংপুর বিভাগে ৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৯ জন, বরিশাল বিভাগে ১১ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১২ জন রয়েছেন। সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরের তুলনায় চলতি বছর মবের ঘটনা বেশি। অথচ ধারণা করা হয়েছিল- ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর প্রায় দুই বছর নির্বাচিত সরকার না থাকায় মবের ঘটনা বেড়েছিল। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে সেটি কমবে। কিন্তু আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যানে দেশে আগের তুলনায় চলতি বছর মবের ঘটনা কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসের মব সহিংসতার ১০৭টি ঘটনায় ৬৩ জন নিহত ও ৮২ জন আহত হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসের ৬৩টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হয়েছেন।

গত সোমবার রংপুরের মিঠাপুকুরে চোর সন্দেহে জোড়গাছ দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা মো. মাহবুব হোসেনের ছেলে মো. খালিদ হাসানকে (২৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে সকালে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ে রিকশা গ্যারেজে চুরির অভিযোগে মো. হাসান (৩০) নামের আরেক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। রাতে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থায় আপন শ্যালিকাকে বিয়ে করায় এক যুবক ও তার দুই স্ত্রীর মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রামছাড়া করার ঘটনা ঘটে। রোববার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে এজারুল হক (৪৬) ও সাদিকুল ইসলাম (২৫) নামে দু’জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন রাতে কক্সবাজার উখিয়ার ময়নারঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৮ তে চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে আল আমিন (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা নিহত ও নারীসহ তিনজন আহত হয়েছেন। ২২শে অক্টোবর রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শিশু চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মো. আলম শেখকে (৪১)। ১৮ই অক্টোবর ভোলার সদরের রাজাপুরে বিএনপি নেতা হোসেন মাঝিকে ছুরিকাঘাতে আহত করার ঘটনায় আসিফ (২৩) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৪ই অক্টোবর নোয়াখালীর সোনাপুরে হাসিব ওয়ার্কশপ থেকে ব্যাগ চুরির অভিযোগে প্রতিবন্ধী কবির হোসেনকে (২৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ১২ই অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের হোটেলকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) কয়েক দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন মানবজমিনকে বলেন, আগে চুরি, পকেটমারির অভিযোগে গণপিটুনি দেয়া হতো। বর্তমানে এটার নতুন সংস্করণ হচ্ছে মব সন্ত্রাস। এসবের পেছনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। কারও ঘরবাড়ি, বালুমহাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের অফিস দখলের উদ্দেশ্যেই এসব হামলা করা। এমনকি ধর্মীয় অনুভূতির আঘাত বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা অপবাদ দিয়েও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সাতক্ষীরায় ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে হাসপাতালে গিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যা চরম বর্বরতা। এই মব সংস্কৃতির পেছনে কিছুটা রাজনৈতিক কারণও এর সঙ্গে যুক্ত থাকে।

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন বলেন, মব কালচার কখনোই আইনসম্মত নয়। আমাদের কখনোই এই মব কালচারকে সমর্থন করা উচিত নয়। এটা আইনের শাসনের বিরোধী। আমাদেরকে অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে এবং কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আমাদেরকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য সবসময় অ্যাকক্টিভ থাকতে হবে। এবং জনগণকে আইনের প্রতি অনুগত এবং আন্তরিক হতে হবে।