শিশু স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র বাংলাদেশ শিশু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। শিশু চিকিৎসার ভরসার এই হাসপাতালের ‘এ’ ব্লকের চার তলা ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও শত শত শিশুর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। খোদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই বিষয়টি জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের পুরনো আর জরাজীর্ণ হওয়ায় হাসপাতালের এই ভবনটি অনেক আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শিশু হাসপাতালের ‘এ’ ব্লকের ভবনটির নিচ তলায় রয়েছে জরুরি বিভাগ, হাম ও ডেঙ্গুর বিশেষায়িত ওয়ার্ড, সমাজসেবা কার্যালয় ও প্রশাসনিক ব্লক। ২য় তলায় ৩ ও ৪নং ওয়ার্ড, ময়লা শোধনাগার, ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইকোলজি বিভাগ, পিডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট রয়েছে। তৃতীয় তলায় রয়েছে কেবিন ব্লক, বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড ও অপারেশন থিয়েটার। ওই ভবনের চতুর্থ তলায় একাডেমিক ব্লকসহ রয়েছে কেবিন ও টেনাল অ্যান্ড ডায়ালাইসিস ইউনিট। ২০১৭ সালে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি যেসব হাসপাতাল অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে- সেগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। তালিকায় নাম আসে ৪২২টি হাসপাতালের। এতে ১৭৪টিকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ২৪৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তালিকার ঝুঁকপূর্ণ হাসপাতালের মধ্যে শিশু ইনস্টিটিউটও ছিল। সরজমিন হাসপাতালের এই ভবনটি ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন জায়গার টাইলস খসে পড়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ডসহ পুরো ভবনের বিভিন্ন জায়গার রং স্তরে স্তরে খসে পড়ছে।
বিভিন্ন স্থানে ইলেকট্রিক তার প্রবাহের পাইপ ভাঙাচোরা। হাসপাতালের একাধিক ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই ছারপোকা ও তেলাপোকার উপদ্রব রয়েছে। ‘চায়না তেলাপোকা’র অত্যাচারে অতিষ্ঠ রোগী-স্বজনরা। ভবন পুরাতন হওয়ায় পোকামাকড় বাসা বেঁধেছে।
পুরো ভবনের সবক’টি ওয়ার্ড ও কেবিন ঘুরে দেখেছে এই প্রতিবেদক। দেখা গেছে, হাম ও ডেঙ্গুর বিশেষায়িত ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে ডেঙ্গুর জন্য নিচ তলায় ২৬ শয্যা বরাদ্দ রাখা আছে। সেখানে ২৬ জন শিশুই ভর্তি ছিল। হামের রোগীদের জন্য ৩০টি শয্যা বরাদ্দ ছিল ভবনের। ৩০টি শয্যাতেই শিশু ভর্তি ছিল শনিবার। ওই ভবনের ওয়ার্ড ৩-এ ১৬টি এনআইসিইউতে ২৮ শয্যার আছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। সবগুলো শয্যাতেই রোগী। ৩০১-৩১২ কেবিনগুলোতে ২২ জন শিশু ভর্তি ছিল। ওয়ার্ড ৫-এ ৫৩ শয্যায় সার্জারি, বার্ন ও ইএনটি-এর ৫৩টি শিশু ভর্তি ছিল। ওয়ার্ড ৬-এ সবগুলো শিশুই সার্জারি করানো রোগী। যেখানে ৫২টি শিশু রয়েছে। ৪০১-৪১৭নং কেবিন ও টেনাল অ্যান্ড ডায়ালাইসিস ইউনিট ১৫ শয্যাতেই রোগী ভর্তি ছিল। প্রতিটি ওয়ার্ড ও কেবিনেই বরাদ্দকৃত নির্দিষ্টসংখ্যক শয্যার বাইরেও অসংখ্য শিশু ভর্তির জন্য অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরত সেবিকারা।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ভবনটি ৫২ বছরের পুরাতন। যা ২০১৬ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। ভবনে প্রায়ই শর্টসার্কিট হয়। ২০২৪-এর মার্চ মাসে কার্ডিয়াক আইসিইউ আগুনে পুড়ে গেলেও তখনো সেটি সংস্কার করা হয়নি বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে হাসপাতালে ৯টি আইসিইউ রয়েছে। ৯টি আইসিওতে এয়ারকন্ডিশনের প্রয়োজন। ইলেকট্রিসিটির তারগুলো ঠিক হয়নি বলে বাড়তি সমস্যা পোহাতে হচ্ছে বলেও জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভবনটিতে কোনো ফায়ার এক্সিটও নেই। সূত্র জানায়, এই ভবনের অবকাঠামো তৈরিতে কোনো বিম ছিল না, কোনো সয়েল টেস্টও ছিল না, কোনো পিলার ছিল না। এর মধ্যেই গত ২১শে নভেম্বর ভূমিকম্পে বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে ভবনে। ফাটল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে, ঢোকার পর বিভিন্ন ইলেকট্রিসিটির তারের মধ্যে পানি ঢুকে শর্টসার্কিট হয়। হাসপাতাল সূত্রের অভিযোগ, পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের কেউ এই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখতো না, কিংবা এই বিষয়ে কথা বলতো না, বরং নিজেদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলতো। ফলে এই পরিত্যক্ত ভবন দিয়েই চালিয়ে যেতে হচ্ছে চিকিৎসা।
শিশু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এই ভবনটিতে ১১১ জন হামের রোগী, ৭০ জন ডেঙ্গু রোগী আছে। ‘এ’ ব্লকই আমাদের প্রধান ভবন। সবমিলিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ শিশু ওখানে আছে। আমরাও সেখানে বসি। এই বিল্ডিংটা ডিমোলিশ করতে হবে, না হলে আমরা একদিন ওই বিল্ডিং ভেঙে মাটিচাপা পড়ে মারা যাবো। আমি যে রুমে বসি, এটা আরও ভয়াবহ। আমরা আতঙ্কে থাকি, যদি আগুন লাগে ওখানে ভেতরে কলেমা পড়ে বসে থাকতে হবে, আর বের হওয়ার জায়গা নাই। আমরা যেকোনো সময় মারা যেতে পারি, আমরা বাসা থেকে বিদায় নিয়ে আসি। তিনি বলেন, আমি ফায়ার সার্ভিসকে বলছি, হঠাৎ করে যদি আগুন লাগে এতগুলো বাচ্চাকে নিয়ে আমরা কীভাবে রেসকিউ করবো, আমাদের একটু ট্রেনিং দেন।
তিনি আরও বলেন, আমি আসার পর মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি, এই বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। এবার সরকার সিরিয়াস। ‘সি’ ব্লকে ১০ তলা হবে বিল্ডিং, ওইখানে আরও ১১০ রোগীকে চিকিৎসা দেয়া যাবে। আইসিইউ হবে অনেকগুলো, অপারেশন থিয়েটার হবে, ক্যাথল্যাব হবে হার্টের। সবমিলিয়ে আড়াই থেকে তিন বছরের ব্যাপার।
