মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। আগামী ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচনে ভোটারদের রায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার বাকি সময়ের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি, নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে-এখন সেই প্রশ্নই আলোচনায়।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কী?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম। প্রতি দুই বছর পরপর কংগ্রেসের নির্বাচন হয়। আগামী ৩ নভেম্বর ভোটাররা দেশটির দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচন করবেন। এর দুটি কক্ষ হলো উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ।
যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন ও পাস করার প্রধান দায়িত্ব কংগ্রেসের। তাই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে আগামী দুই বছর কোন দল আইনসভা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ট্রাম্পের পক্ষে নিজের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কতটা সহজ হবে।
একই সঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জনগণের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
কাদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে এই নির্বাচনে?
এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই কক্ষের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সাধারণত প্রতিনিধি পরিষদেই নতুন আইনের প্রস্তাব উত্থাপন ও তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
অন্যদিকে, ১০০ সদস্যের সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া আইন অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগ ও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের দায়িত্বও রয়েছে সিনেটের।
ফেডারেল নির্বাচনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে গভর্নরসহ রাজ্য পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হবেন। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের গভর্নর নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু কী?
নির্বাচনী প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান খরচে চাপে রয়েছেন অনেক মার্কিন নাগরিক। মূল্যস্ফীতিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। এর পেছনে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাবও রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্পের আরোপ করা বাণিজ্য শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়েছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। অভিবাসনও নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু।
রিপাবলিকানদের দাবি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন। তবে এসব অভিযানের পদ্ধতি ও মানবিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দলের অনেক শীর্ষ নেতা এই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তবে ট্রাম্প এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারে নতুন আইনগত বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করেছেন।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে কী হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার একটি হলো আইনসভা বা কংগ্রেস। অন্য দুটি হলো নির্বাহী বিভাগ, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট, এবং বিচার বিভাগ। সরকারের নীতি ও আইন প্রণয়নে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-দুই কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। তবে উভয় কক্ষেই তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি নয়। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি। এর সঙ্গে একজন স্বতন্ত্র সদস্যও তাদের পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে সিনেটে দলটির আসনসংখ্যা ৫৩।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত ৫১টি আসন প্রয়োজন। কারণ দুই দলের আসন সমান ৫০-৫০ হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের নির্ণায়ক ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারিত হয়। বর্তমানে ভাইস প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান হওয়ায় এই ব্যবস্থায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দলটি।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলেও কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাবে। তারা নিজেদের আইন প্রস্তাব উত্থাপনের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি ও তদন্তের সুযোগ পাবে।
জয়ের সম্ভাবনা কার বেশি?
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি প্রবণতা দেখা যায়-প্রেসিডেন্টের দলের বিরুদ্ধে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন অনেক ভোটার। এবারও সেই প্রবণতা রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় উল্লেখযোগ্য পতনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জরিপবিষয়ক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনসমর্থন ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে তা কমে প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। বিপরীতে, তার প্রতি অসন্তুষ্ট মানুষের হার দাঁড়ায় ৬১ শতাংশে।
তবে জনমত জরিপের ফলাফল সরাসরি নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে না। কারণ কংগ্রেসের সব আসনে দুই দলের জয়ের সম্ভাবনা সমান নয়। বেশ কিছু আসন ঐতিহ্যগতভাবেই রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
বিবিসির মার্কিন সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ গুরুত্বপূর্ণ ১০টি সিনেট আসন এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৪২টি আসনকে এবারের নির্বাচনে নজর রাখার মতো কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইওয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের সিনেট নির্বাচন এবং অ্যারিজোনা ও ওহাইওর প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্র্নিধারণ নিয়ে দুই দলের বিরোধ। রিপাবলিকানরা কয়েকটি রাজ্যে নিজেদের অনুকূলে নির্বাচনী এলাকার মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করেছে। পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরাও। ফলে কিছু আসনে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ডেমোক্র্যাটরা জিতলে ট্রাম্পের কী পরিণতি হবে?
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ট্রাম্পের জন্য কংগ্রেসে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তার অভ্যন্তরীণ নীতির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো বাধার মুখে পড়তে পারে। যদিও কংগ্রেসের সমর্থন ছাড়াও নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প।
এ ছাড়া কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রম তদন্ত করতে পারবেন। দুর্নীতির অভিযোগ, হোয়াইট হাউসে নতুন বলরুম নির্মাণ এবং অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) কর্মকাণ্ড তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অভিশংসন হচ্ছে কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এটি নিজে কোনো ফৌজদারি বিচার নয়; বরং রাজনৈতিক বিচারের পথ তৈরি করে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের জন্য নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ তুলনামূলক সহজ থাকবে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কী প্রভাব পড়বে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট না হলেও ট্রাম্প বিষয়টিকে নিজের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরছেন। রিপাবলিকান ভোটারদের প্রতি তার আহ্বান, এবারের নির্বাচনে তাকে সমর্থন জানিয়ে ভোট দিতে হবে, যেন ব্যালটে তার নামই রয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল যেদিকেই যাক, ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নিয়ে জনগণের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর থেকেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হওয়ার কথা। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়েও শুরু হবে হিসাব-নিকাশ।
সব মিলিয়ে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক শক্তি, ভবিষ্যৎ নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে দুই দলের প্রস্তুতিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
