পোল্যান্ডে বিচারপতির হাতে আদালতের প্রেসিডেন্ট বরখাস্ত, বিক্ষোভ, অভ্যুত্থানের অভিযোগ

পোল্যান্ডে বিচারপতির হাতে আদালতের প্রেসিডেন্ট বরখাস্ত, বিক্ষোভ, অভ্যুত্থানের অভিযোগ

ফন্ট সাইজ:

পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন আদালতেরই এক বিচারপতি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আদালত ভবনের চারপাশে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, আদালতের আনুষ্ঠানিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ঘটনাটিকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় দেশটির একজন রাষ্ট্রদূত পদত্যাগ করেছেন। স্থানীয় সময় ৩০শে অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের ওয়েবসাইটে একটি সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, আদালতের প্রেসিডেন্ট বোগদান শভেচকোভস্কি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট বার্তলোমিয়েজ সোখানস্কিকে তাদের পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েবসাইটটি অচল হয়ে পড়ে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

আদালতের বিচারপতি আন্না কোরভিন-পিওত্রোভস্কি এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তার দাবি, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এ পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। আদালতের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হিসেবে তিনিই এখন ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানান। ঘটনাটি জানার সময় পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি সেনেগালের উদ্দেশে বিমানে ছিলেন। খবর পাওয়ার পর তিনি মাঝপথ থেকেই বিমান ফিরিয়ে নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, এমন মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের পোল্যান্ডে থাকা জরুরি। আমি সেনেগালের উদ্দেশে যাত্রা সংক্ষিপ্ত করছি। দেশে ফিরছি।
এদিকে আদালত ভবনের চারপাশে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বর্তমান ইউরোপপন্থি সরকারের বিরুদ্ধে আদালতের প্রেসিডেন্টকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেয়ার অভিযোগ তুলে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী সেখানে জড়ো হন। তাদের কেউ কেউ ‘তুস্ক বিশ্বাসঘাতক’ বলে স্লোগান দেন। আদালতের আনুষ্ঠানিক এক্স অ্যাকাউন্টে ঘটনাটিকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করা হয়। শনিবার ভোরে প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ জানান, নাভরোৎস্কি আদালত ভবনে প্রবেশ করেছেন। এক্সে পাভেল শেফেরনাকার লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রেসিডেন্ট জবিগনিউ কাপিনস্কির সঙ্গে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল ভবনে প্রবেশ করেছেন।
এদিকে, এসব ঘটনার পর চীনে নিযুক্ত পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ইয়াকুব কুমোখ পদত্যাগ করেছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, পোল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। আজ থেকে আমি পদত্যাগপত্র এবং আমাকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জমা দিয়েছি। জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি তার পোস্টের জবাব দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আপনার দায়িত্ব পালনের অপেশাদারসুলভ পরিণতি আমি স্বীকার করছি। আপনি আর পোল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন না।
পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালসহ দেশটির শীর্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সরকার ও প্রধান বিরোধী দল জাতীয় রক্ষণশীল আইন ও বিচার পার্টির (পিআইএস) মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দলটি পোল্যান্ডের ক্ষমতায় ছিল। পোল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচকদের অভিযোগ, পিআইএস ক্ষমতায় থাকার সময় সাংবিধানিক আদালতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এসব সংস্কারের কারণে পোল্যান্ডের ওপর জরিমানাও আরোপ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ওই আদালত প্রায়ই ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনের পরিবর্তে পোল্যান্ডের জাতীয় আইনকে প্রাধান্য দিয়ে রায় দিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ ছিল, আদালতটি তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী ডনাল্ড তুস্কের ইউরোপপন্থি সরকার ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। তবে এরপর পিআইএসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা পরপর দুই প্রেসিডেন্ট, যাদের মধ্যে বর্তমান প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কিও রয়েছেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে ভেটো দিয়েছেন। পিআইএস সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতিদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে তুস্কের সরকার। ওই সরকারের আমলেই সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান হয়েছিলেন শভেচকোভস্কি। তুস্কের অভিযোগ, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত বিচারপতিদের দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দিচ্ছেন তিনি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় এক্সে তুস্ক লিখেছেন, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আমাদের দায়িত্ব। পিআইএসের অধীনে বছরের পর বছর ধরে চলা আইনহীনতার পর এটি একটি কঠিন প্রক্রিয়া, কখনো কখনো বেদনাদায়কও। এর জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর আর কোনো বিকল্প নেই। আগস্টে ক্যাম্পাস পোলস্কা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময়ও তিনি বলেন, আইনসম্মতভাবে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতিদের দিয়ে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তার সরকারের রয়েছে। তবে তার সরকারের পদ্ধতি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, সেটিও স্বীকার করেছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, দেশটির বৃহত্তম বিরোধী শক্তি পিআইএসের নেতারা বিচারপতিদের বরখাস্তের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। সাবেক বিচারমন্ত্রী জবিগনিউ জিওব্রো শুক্রবার সন্ধ্যায় এক্সে লিখেছেন, এটি সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর নির্লজ্জ ও অপরাধমূলক আক্রমণ। এ কারণে আমি জোরালো, দৃঢ়, সংহতিপূর্ণ ও নির্ভীক প্রতিরোধের আহ্বান জানাচ্ছি।