যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও বেঁচে গেছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইক। শুক্রবার প্রথমবারের মতো এ ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। পাইক জানিয়েছেন, তিনি এখনো সারাক্ষণ অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছেন, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে এবং কারা হাসপাতালের একটি কক্ষে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, এত মানুষের জীবনকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়া অদক্ষতা। এ কারণে আমি গভীরভাবে আহত। তিনি আরও বলেন, আমি এখনো আমার ভুক্তভোগীর পরিবারের কথা ভাবি। তারা যে ভয়াবহ যন্ত্রণা ও ক্ষতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তা আমাকে ভাবায়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
১৯৯৫ সালে নিজের প্রেমিকের সঙ্গে মিলে ১৯ বছর বয়সী সহপাঠী কলিন স্লেমারকে নির্যাতন ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন পাইক। ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। ফলে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কম বয়সী নারীদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রত্যক্ষ করতে ফ্লোরিডা থেকে টেনেসিতে এসেছিলেন নিহত কলিনের মা। বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী পাইককে দু’বার প্রাণঘাতী ওষুধ দেয়া হয়েছিল। তার আইনজীবীদের দাবি, ওষুধটি সম্ভবত সঠিকভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করেনি। বরং তার দুই বাহুতে জমা হয়েছিল। এতে বাহু পুড়ে যাওয়ার মতো ক্ষত ও ফোসকা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। কয়েক দিন তাকে ভেন্টিলেটরের সাহায্যে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। এমনকি একপর্যায়ে তার আইনজীবীরা জানান, তারা মনে করছেন না যে তিনি বেঁচে ফিরতে পারবেন।
পাইক বলেন, সেই রাতের পর থেকে এমন একটি মুহূর্তও যায়নি, যখন আমি ব্যথামুক্ত ছিলাম। আমার শরীর ব্যথা করে। দুই বাহুতে ব্যথা, হাতে ব্যথা, গলায় ব্যথা। এখনো কথা বলতে কষ্ট হয়। আর এই যন্ত্রণা শুধু শারীরিক নয়। আমার মন ও আত্মার মধ্যেও যন্ত্রণা রয়েছে। পাইক জানান, মৃত্যুর জন্য তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন। শান্তিতে মৃত্যুবরণ করবেন বলেই ভেবেছিলেন। কিন্তু তার পরিবর্তে হাসপাতালের বিছানায় একা ও বিভ্রান্ত অবস্থায় তার চেতনা ফিরে আসে। তার ভাষায়, নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি। কারাগার থেকে আইনজীবীদের মাধ্যমে লিখিত বক্তব্যে পাইক বলেন, সেই রাতে কেন আমি বেঁচে গেলাম, তা জানি না। এরপর কী ঘটবে, সেটাও জানি না।
প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ ব্যর্থ হলেও পাইকের মৃত্যুদণ্ড এখনো বহাল। তার আইনজীবীরা রিপাবলিকান গভর্নর বিল লি’কে মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গভর্নর লি বলেন, আদালত অন্য কোনো সিদ্ধান্ত না দিলে আমার ধারণা, তার আগের সাজাই বহাল থাকবে। ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তদন্তে একজন সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নিকে নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দায়িত্ব দিয়েছেন গভর্নর। একই সঙ্গে চলতি বছর অঙ্গরাজ্যে নির্ধারিত অন্য একটি প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কর্মসূচিও স্থগিত করেছেন তিনি।
ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তার আইনজীবীরা আগেই সতর্ক করেছিলেন, পাইকের শিরা চিকন এবং থ্রম্বোসাইটোসিস নামের রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ায় তার শরীরে শিরাপথে ওষুধ প্রবেশ করানো কঠিন হতে পারে। আদালতে দাখিল করা একটি নথিতে তার আইনজীবী র্যান্ডি স্পাইভি জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দায়িত্বে থাকা দলটি পাইকের দুই বাহুতে কার্যকর শিরাপথ তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছিল। এমনকি একটি শিরা ফেটে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়ের বেশির ভাগ সময়ই চেতনা ছিল পাইকের। এ সময় তিনি নিজের বাহুতে ব্যথা ও জ্বালাপোড়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরে একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার কিছু আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পর কারাগারে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্স।
