আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার প্রতিবেদন ‘নাটোরের গুরুদাসপুর: বাবা এমপি, ছেলেরা বেপরোয়া’। খবরে বলা হয়, মোগল সম্রাট শাহজাহানের জীবদ্দশাতেই সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর দুই ছেলে দারাশিকোহ ও আওরঙ্গজেবের মধ্যে শুরু হয়েছিল ক্ষমতার লড়াই। নাটোরের গুরুদাসপুরের ‘সিংহাসন’ (এমপির কর্তৃত্ব) নিয়ে তেমনই দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের দুই ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু ও মাহমুদুজ্জামান সোহাগ।
এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধে ছোট ভাই সোহাগের অনুসারী ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলামকে (৩২) বড় ভাই মিন্টু খুন করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মিন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এখন দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের নানা অভিযোগ সামনে আসছে। ছেলেদের এবং নিজের কর্মকাণ্ডে চাপে পড়েছেন সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজও।
টার্গেট খুঁজছিলেন সোহাগও
গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ১৪ অক্টোবর রাতে হামলার শিকার হন। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। অনুসারী শাকিলের ওপর হামলা হওয়ার আগে নিজের ‘টার্গেটকে’ খুঁজছিলেন সোহাগও। তাঁর টার্গেট উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সুজাউদ্দৌলা সুজন।
সুজন দাবি করেন, পূর্ববিরোধের জেরে ১২ অক্টোবর রাতে সোহাগ তাঁকে মোবাইলে হুমকি দেন। পরে তিনি যেখানে ছিলেন, সেখানে সশস্ত্র অবস্থায় দলবল নিয়ে আসেন। তবে এর দুই মিনিট আগে তিনি স্থান ত্যাগ করায় বেঁচে গেছেন। সুজনের ভাষ্য, ‘আমি এখন জান হাতে নিয়ে ঘুরছি।’
এদিকে শাকিলের ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপি কর্মী শাহ আলম ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে ১৮ অক্টোবর নয়াবাজারে এমপিপুত্র মিন্টুর নেতৃত্বে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
শাহ আলমের দাবি, শাকিলের ওপর হামলার প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে। এলাকার মানুষ এখন এমপির দুই ছেলের কাছে জিম্মি।
বাবার জন্যই বেপরোয়া মিন্টু
গুরুদাসপুরের দলীয় নেতা-কর্মীরা বলছেন, আব্দুল আজিজ এমপি হওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে মিন্টু মাদকাসক্ত এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তা ছাড়া চাঁদাবাজি করে বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন।
উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সুজাউদ্দৌলা সুজন বললেন, মিন্টু আগে থেকে রাজনীতি করতেন। তাঁর ছোট ভাই সোহাগ আগে কখনো রাজনীতি করেননি। তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে নামেন। এমপি হওয়ার পর আব্দুল আজিজ তাঁকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। তিনি উপজেলা নিয়ন্ত্রণে নেন। এমনকি সোহাগকে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী করারও সিদ্ধান্ত নেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্টু অপরাধজগতে চলে যান।’
মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁর ভাই সোহাগ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সম্পাদক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপির এক নেতা জানান, দুই ভাইয়ের দা-কুমড়া সম্পর্ক। এ জন্য মিন্টু বাড়ি ছেড়ে উপজেলা সদরে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছিলেন। সম্প্রতি সার ডিলার নিয়োগে ২৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ডিলারশিপ পেয়েছেন সোহাগের ভায়রা ভাইও। মিন্টু নিজে একটি ডিলারশিপ পেলেও টাকার ভাগ পাননি।
বিএনপির ওই নেতা বলেন, দুই উপজেলার সব সরকারি অফিস ছোট ছেলে সোহাগের নিয়ন্ত্রণে। ঠিকাদারিও করছেন বেনামে। এসব নিয়ে মিন্টুর সঙ্গে সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে। সম্প্রতি একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে দুই ভাই প্রকাশ্যেই বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মঞ্চের পেছনে গিয়ে তাঁরা একে অপরকে পিস্তল দেখান। এই পরিস্থিতিতে পুরস্কার বিতরণ না করেই মঞ্চ থেকে চলে যান এমপি আব্দুল আজিজ।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবার সোহাগকে ফোন করা হলে তিনি ওই অনুষ্ঠানেই যাননি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘দলের ভেতরে বিরোধী পক্ষ আছে। জামায়াত-আওয়ামী লীগ আছে। তারা এখন নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াচ্ছে। আসলে এগুলোর কোনো কিছুরই ভিত্তি নেই।’
এলাকায় মিন্টুর দখলদারত্ব
স্থানীয়রা বলছেন, আব্দুল আজিজ এমপি হওয়ার পর এলাকার যেখানেই অবৈধ পুকুর খনন হয়েছে, সেখানেই ভাগ বসিয়েছেন নুরুজ্জামান মিন্টু। পুকুরের মাটি বিক্রি করে তিনি অঢেল টাকা পকেটে পুরেছেন। যত দিন তিনি মাটি বিক্রি করেছেন, তত দিন উপজেলা প্রশাসনকে কোনো অভিযান চালাতে দেননি।
তিন মাস আগে গুরুদাসপুরের ধারবাড়িয়া এলাকায় প্রায় ১১ বিঘা জমিতে পুকুর কেটেছেন রোফাতুল্লাহ সরকার। তিনি জানালেন, কাজ শুরু করতেই মিন্টু গিয়ে সেখানে হাজির হন এবং জানান, মাটি তিনি বিক্রি করবেন। এরপর সেখান থেকে ৪ হাজার ২০০ ট্রাক্টর মাটি তিনি ইটভাটায় দিয়েছেন। প্রতি গাড়ি মাটি বিক্রি করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকায়। এখান থেকে মিন্টু প্রায় ৬০ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
রোফাতুল্লাহর ভাষ্য, যত দিন মাটি কাটা হয়েছে, তত দিন তাঁকে পুকুরেই যেতে দেওয়া হয়নি। সব সময় মিন্টুর ১০-১২ জন লোক থেকেছেন। পুকুর খনন শেষে তিনি তাঁর খালাতো ভাই ফারুক হোসেনকে দিয়ে অনুরোধ করিয়েছিলেন, যেন ভেকু ভাড়ার ৯ লাখ টাকা মিন্টু দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্টু পুলিশ দিয়ে তাঁকে ধরিয়ে মাদকসেবী সাজিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নিয়েছেন। ৪ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। মাটি বিক্রি যেদিন শেষ হয়েছে, সেদিন ইউএনওকে দিয়ে ভেকুও জব্দ করিয়েছেন।
শাকিল খুনের নেপথ্যে
ছাত্রদল নেতা শাকিল খুনের কারণ খুঁজতে গুরুদাসপুরের ১০ জন নেতা-কর্মী এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে আজকের পত্রিকা। তাঁরা জানিয়েছেন, শাকিল ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত নুরুজ্জামান মিন্টুর সঙ্গেই রাজনীতি করতেন। কিন্তু সোহাগ রাজনীতিতে নামলে তিনি তাঁর সঙ্গে রাজনীতি শুরু করেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন মিন্টু।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মিন্টু এলাকার মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। কয়েক মাস আগে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে ৮ লাখ টাকার একটি ইয়াবার চালান গুরুদাসপুরে আসে। শাকিল এই ইয়াবার চালানের টাকা মেরে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হন মিন্টু। এ কারণেই মিন্টু তাঁকে ‘শায়েস্তা’ করার পরিকল্পনা করেন।
এই অবস্থায় ২০ এপ্রিল শাকিল ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘এ বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডায়েরি করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে ওই ডায়েরি অনুযায়ী মামলা করে দিবেন।’
তবে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বলেন, ‘এ ধরনের কোনো জিডির হদিস পাওয়া যায়নি।’
আলোচনায় ‘চাটা গ্রুপ’
শাকিলের মৃত্যুর পর গুরুদাসপুরে আলোচনায় এসেছে ‘চাটা গ্রুপ’ নামের একটি বাহিনী। শাকিলের বাবা রবিউল করিমের দাবি, শাকিল জীবিত অবস্থায় জানিয়েছিলেন, চাটা গ্রুপের সদস্য ইরফান নেওয়াজ ও মো. হাবিব তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছিল। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমেরিকাপ্রবাসী স্থানীয় ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইনের অনুসারীদের এলাকায় ‘চাটা’ বলা হয়। এমপিপুত্র মিন্টু চাটা গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
রাসেল হোসাইন গুরুদাসপুরের ধারাবারিষা ইউনিয়নের কচুগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় ব্যবসা করেন। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি ওই দলের নেতাদের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন। গুরুদাসপুর উপজেলা সদর চাঁচকৈড় বাজারে তাঁর একটি শপিং মল রয়েছে। শাকিলের লাশ দাফন শেষে এই শপিং মলে হামলা চালানো হয়।
নাটোর জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মাদকসংশ্লিষ্ট কারণে শাকিলকে শায়েস্তা করতে মিন্টু চাটা গ্রুপকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে অর্থের জোগান দেন আমেরিকাপ্রবাসী ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইন।’
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয় রাসেল হোসাইনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি কেন অর্থের জোগান দিতে যাব? আসলে আমার ওপর দোষ চাপিয়ে এমপির পরিবার দায়মুক্তি পেতে চাচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘অভ্যুত্থানের পর থেকে গ্রামের বাড়ি-গাড়ি রক্ষায় আমি চাঁদা দিতে দিতে অস্থির। মিন্টু দফায় দফায় টাকা নিয়েছেন। ভোটের সময় তাঁর বাবাও আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁর নির্বাচনে আমাকে ৩০-৩৫ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে।’
আরও দুজন হেফাজতে
শাকিল হত্যা মামলাটি তদন্ত করছেন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম। আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জেলা ডিবির পরিদর্শক নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনিসুর রহমান ও আল-আমিন নামের দুজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁরা চাটা গ্রুপের সদস্য।
এদিকে নাটোর প্রতিনিধি জানান, তিন দিনের রিমান্ড শেষে এমপিপুত্র মিন্টুকে গতকাল বিকেলে আদালতে তোলা হয়। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর আরও সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। তবে আদালতে শুনানি হয়নি। ডিবির পরিদর্শক নজরুল ইসলাম জানান, রিমান্ড আবেদনের শুনানি পরে হবে। আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
প্রথম আলো
‘এলডিসি উত্তরণ: আপাত স্বস্তি, আছে সংস্কারের চাপ’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের প্লেনারি মিটিংয়ে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। ইউএনওয়েব টিভি বৈঠকটি সরাসরি সম্প্রচার করে। বৈঠকের শুরুতে জি-৭৭-এর পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সংঘাত, বৈশ্বিক অভিঘাত—এসব কারণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ঘাটতি আছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া কোনো দেশের প্রতিনিধি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেননি।
ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের (ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর বিষয়ে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য দেন। তবে সবাই তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশে সংস্কারের তাগিদ দেন। জাতিসংঘ আরও বলেছে, বাংলাদেশ ও নেপালের এই সময় বাড়ানোর বিষয়টি ব্যতিক্রমী উদ্যোগী হিসেবে বিবেচিত হবে। এর মানে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের জন্য এটি উদাহরণ হবে না। জাতিসংঘ আরও বলেছে, ২০২৭ সালের শেষে বাংলাদেশ কী প্রস্তুতি নিচ্ছে, এর অগ্রগতি নিয়ে একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করবে।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য আরও তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ। অর্থনীতিতে এখন নানামুখী চাপ আছে। এই চাপের সময়ে প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেবে। এলডিসি উত্তরণ হলে যেসব বাণিজ্যসুবিধা উঠে যেত, সেসব সুবিধা অন্তত ২০২৯ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে। সুবিধা পাওয়ার তালিকায় আছে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, ভর্তুকি, নগদ সহায়তার সুযোগ, নমনীয় শর্তে ঋণ পাওয়া ইত্যাদি।
এদিকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকালে বাড়তি তিন বছরের মধ্যে রাজস্ব ও আর্থিক খাত, ব্যবসাসহায়ক পরিবেশ, বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে চলমান সংস্কারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। ছয়-সাত মাস ধরে নানা প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ ও নেপালের জন্য বাড়তি সময়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেয় জাতিসংঘ। আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা ছিল। সময় বাড়ানোর ফলে এখন ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে উত্তরণ হবে বাংলাদেশের।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও নিট পোশাক মালিকের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি সরকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির খবর। এ বছর এলডিসি উত্তরণ হয়ে গেলে শুধু শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ছাড়া অন্য সব সুবিধা উঠে যেত। এই তিন বছরকে কাজে লাগাতে হবে। ভালো ছাত্ররা যেমন সারা বছর পড়াশোনা করে, তেমনি প্রস্তুতি হিসেবে আগামী তিন বছরজুড়েই প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করতে হবে। তিন বছর সময় দিয়েছে বলে এক বছর বসে থাকলে চলবে না।
ফজলুল হক আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের সব প্রস্তুতি যেন পোশাক খাত নিয়ে। ইদানীং ওষুধশিল্প নিয়ে কিছু কথা হচ্ছে। কিন্তু চামড়া ও চামড়াজাতীয় পণ্য, প্লাস্টিক, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো নিয়েও ভাবতে হবে। এসব নিয়ে নভেম্বর মাস থেকেই কাজ শুরু করবে এফবিসিসিআই।
কেন স্বস্তি
এখন এলডিসি উত্তরণ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ত। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাওয়া যাবে না। তৈরি পোশাক হলো সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা উঠে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা বছরে প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার কমতে পারে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হিসাব।
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৯ সাল পর্যন্ত এমনিতেই শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাবে। এলডিসি উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীনের মতো বড় বাজারে আরও তিন বছর পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
এলডিসি উত্তরণ হলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত ওষুধশিল্প। এলডিসি থেকে বের হলে ওষুধশিল্পের ওপর মেধাস্বত্ব বিধিবিধান আরও কড়াকড়ি হবে। আপাতত আগামী তিন বছরের জন্য স্বস্তি পাওয়া গেল। এলডিসি থাকার কারণে বাংলাদেশের কিছু ওষুধ উৎপাদনে এই তিন বছর মেধাস্বত্বের বিধিবিধান আরোপ হবে না। মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পেটেন্ট লাইসেন্স লাগবে না। এতে উৎপাদকের খরচ কমায়। এতে ওষুধের উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রায় ২০ শতাংশ ওষুধ এমন সুবিধা পায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এলডিসি হিসেবে যেকোনো দেশ তার দেশে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার ওপর নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিতে পারে। বাংলাদেশ এখন কৃষি ও শিল্প খাতের নানা পণ্য বা সেবায় ভর্তুকি দেয়। এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোয় ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া এলডিসি হিসেবে নমনীয় শর্তে বিদেশি ঋণের সুযোগ অব্যাহত থাকবে। আবার এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের বৃত্তি দেয়। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে এ ধরনের বৃত্তির সংখ্যা কমে যাবে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘গতিহীন উচ্চগতির রেল’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কাগজে-কলমে ১৪০ কিলোমিটার গতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী আমলে ৭০টি উচ্চগতির ইঞ্জিন ও ৮০০টি যাত্রীবাহী কোচ কিনেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে বাস্তবায়নে দেখা গেছে উলটো চিত্র-এসব ইঞ্জিন-কোচ ৫০ থেকে ৬৭ কিলোমিটারের বেশি গতি তুলতে পারছে না; কোনো কোনো সেকশনে তা নেমে আসছে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটারে।
২০ থেকে ২৫ বছর আয়ুষ্কাল বলা হলেও এসব ইঞ্জিনের প্রায় অর্ধেকই ক্রয়ের দুই-তিন বছরের মধ্যে অচল হয়ে পড়েছে। রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতি এবং সড়ক পরিবহণ খাতের প্রভাবশালী লবির চক্রান্তে হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ইঞ্জিন ও কোচের তীব্র সংকটে রেলে গতি আসেনি; বরং বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ৭৭টি ট্রেন। আর ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনগুলো মাঝপথেই বিকল হয়ে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে যাত্রীদের।
জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রোলিংস্টক (ইঞ্জিন ও কোচ) ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ এর বিপরীতে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৯ গুণ বেশি (৯২ হাজার কোটি টাকা)। কমলাপুর স্টেশনের ৭টি প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বর্তমানে ৬০টি ট্রেন চলছে। অথচ এ অবস্থায়ই আরও দ্বিগুণের বেশি ট্রেন চালানো সম্ভব। তাছাড়া আরও অন্তত ১০টি প্ল্যাটফর্ম বাড়ানোর পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০০ ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু শুধু ইঞ্জিন ও কোচের অভাবেই তা হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সরকার রেল উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইঞ্জিন-কোচ সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন ক্রয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। আগামী ২-৪ বছরের মধ্যে সংকট নিরসন হবে। আমরা আরও নতুন ট্রেন চালাতে পারব। যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে কেনা ৭০টি ইঞ্জিন ও ৮০০ কোচ নিয়ে রয়েছে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ। চুক্তি অনুযায়ী, হুন্দাই রোটেমের সরবরাহ করা ৩০টি ইঞ্জিনে নির্দিষ্ট মডেলের যন্ত্রাংশ (অল্টারনেটর, ট্রাকশন মোটর ইত্যাদি) দেওয়া হয়নি। প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) ছাড়াই ইঞ্জিনগুলো খালাস করা হয়। ফলে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে আনা এসব ইঞ্জিন ২ বছরের মাথায় বিকল হতে শুরু করে; অথচ এগুলোর আয়ুষ্কাল ছিল ৩০ বছর।
বর্তমানে এর ১৯টিই পড়ে আছে অকেজো হয়ে। অন্যদিকে ২০২১-২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ৪০টি ইঞ্জিনের ১৩টিই বিকল। আখাউড়া-সিলেট রুটে ওজন বেশি হওয়ায় ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো চালানোই যাচ্ছে না। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ওই সময় কেনা মোট ৭০টি নতুন ইঞ্জিনের মধ্যে ৩২টি বিকল। বাকি ৩৮টি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। চলন্ত অবস্থায় মাসে গড়ে ৬০-৬৫ বার ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে। ভৈরব, আখাউড়াসহ বিভিন্ন সেকশনে ব্রিজে ওঠার সময় ইঞ্জিনগুলো চলন্ত অবস্থায় বিকট শব্দে বিকল হয়ে পড়ছে।
রেলওয়ে পরিবহণ দপ্তর সূত্র বলছে, সচল ইঞ্জিনগুলোর বেশির ভাগই ৪টির বদলে মাত্র ২টি ট্রাকশন মোটর নিয়ে চলছে। ফলে এসব ইঞ্জিনে পর্যাপ্ত গতি নেই। ১৪০ কিলোমিটার গতি তো দূরের কথা-এর অর্ধেক গতি নিয়ে ট্রেন চললেই লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। কিছু কিছু সেকশনে গতি ৪০-৫০ ওঠাতে গেলেই বিপতে পড়তে হয়। সম্প্রতি জামালপুরগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস এবং তিস্তা এক্সপ্রেস চলন্ত অবস্থায় বিকল হয়ে পড়ে।
এতে চরম ভোগান্তির শিকার হন যাত্রীরা। কোনো কোনো মাসে এই একটি রুটেই ১৫ থেকে ১৮টি ট্রেন বিকলের রেকর্ড রয়েছে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুর ওপর দুই পাশে ৫ কিলোমিটার গতি নামিয়ে আনতে হয়। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র সেতু, ঈশ্বরদীর গার্ডার ব্রিজ, পাবনার বাউনজান রেলসেতু, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও তিস্তা রেলসেতু এলাকায় ত্রুটিযুক্ত ইঞ্জিন-কোচ দিয়ে নামমাত্র গতি ওঠানো সম্ভব হয়। সিলেট রুটে (পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা সেকশন) ৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলের ৪৪৯ কিলোমিটার ট্র্যাকে (পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগ) ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে রেলে মাত্র ২৭০টি ইঞ্জিন রয়েছে, যার ৭৭ শতাংশেরই আয়ুষ্কাল (২০ বছর) শেষ। যাত্রীবাহী কোচের ৭০ শতাংশও মেয়াদোত্তীর্ণ। ভারত থেকে ২০০ কোচ আসা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ১৯টি কোচ রেল বহরে যুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই বাকি কোচগুলো রেলবহরে যুক্ত হবে। কিন্তু ইঞ্জিন নেই। চুক্তি অনুযায়ী, নতুন ইঞ্জিন দেশে আসতে আরও দুই বছরের বেশি সময় লাগবে। ওই সময়ের মধ্যে চলমান ইঞ্জিনের আরও অনেকগুলো অকেজো হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিন ছাড়া এই দুর্দশার অবসান হবে না।
অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে মামলা: ইঞ্জিন ক্রয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে রেলের ৩ শীর্ষ কর্মকর্তা-সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা রয়েছে। তাছাড়া কোচ-লাগেজভ্যান ক্রয়েও ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮০০ কোচ ক্রয় করে রেল।
২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০০ কোচ কেনায় বড় অঙ্কের ঘুস লেনদেনের প্রমাণ পায় দুদক, যা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে। পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করে এই দুর্নীতি করা হয়। এছাড়া ২০২০ সালে প্রাক-সমীক্ষা ছাড়াই ২৫৮ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি করে ১২৫টি লাগেজভ্যান কেনায় সাবেক ডিজি শামসুজ্জামানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে।
নেপথ্যে পরিবহণ লবি : বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রেল হলো দুর্নীতি আর লুটপাটের কারখানা-যা দুদকও বলছে। রেলওয়ের বিভিন্ন বৈঠকে বহুবার প্রমাণসহ বলেছি, রেলের একশ্রেণির কর্মকর্তা সড়ক ও আকাশযান মালিকদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ কামাচ্ছেন। তিনি বলেন, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে অন্তত ৩০টি ট্রেন চালানো সম্ভব হলেও চলছে মাত্র ২টি।
রেলওয়ে বিপণন ও করপোরেট পরিকল্পনা দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রভাবশালী সড়ক পরিবহণ লবি কখনোই চায় না রেল লাভজনক গণপরিবহণ হিসাবে দাঁড়াক। কারণ রেল শক্তিশালী হলে বাস ও বিমান ব্যবসায় ধস নামবে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সড়ক পরিবহণ লবি অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা কিছুতেই রেলপথকে লাভজনক হতে দিচ্ছে না। রেল হচ্ছে সাশ্রয় ও নিরাপদ বাহন-তাহলে এটি কী করে বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে। তিনি বলেন, এখন প্রয়োজন অনেক ইঞ্জিন, অনেক কোচ, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, যাত্রীসেবার মান বাড়ানো। জনস্বার্থেই এখানে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।
কালের কণ্ঠ
‘এআইয়ের ছবি যখন হয়রানির অস্ত্র’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখেন জ্যোত্স্না খাতুন (ছদ্মনাম)। মেসেঞ্জারে পাঠানো একটি ছবি দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি।
তাঁর অতি সাধারণ একটি ছবিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিকৃত (অশ্লীল) করে দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তিনি মেসেঞ্জার থেকে ওই মেসেঞ্জারে কল করেন। অন্য প্রান্তের ব্যক্তিটি তাঁকে স্পষ্ট হুমকি দেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা না পাঠালে ছবিটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। পাঠানো হবে আত্মীয়-স্বজনের কাছেও।
এটুকু বলে তিনি কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। পরদিন বিকাশ নাম্বার পাঠিয়ে ওই ব্যক্তি আবারও ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন জ্যোত্স্নাকে। কালের কণ্ঠকে জ্যোত্স্না খাতুন বলেন, ‘আমি জানি অশ্লীল ছবিটি আমার নয়। এআই ব্যবহার করে একটি নগ্ন ছবিতে আমার মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তার পরও ছবিটি দেখার পর আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হচ্ছিল, ছবিটি ছড়িয়ে দিলে আমি মুখ দেখাব কিভাবে? কতজনকে আমি বোঝাব যে ওই অশ্লীল ছবির ব্যক্তি আমি নই। পরিচিত-অপরিচিতরা কিভাবে নেবেন ছবিটি!’
পরে এক বন্ধুর সহায়তায় জ্যোত্স্না সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে অভিযোগ করেন। এরপর পরিবারকে বিষয়টি জানান। জ্যোত্স্নার মতো নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এভাবেই এআইয়ের অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। বাদ যাচ্ছে না রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান। নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। সরকারপ্রধানের কন্যাকে নিয়েও অর্ধশতাধিক এআই ছবি-ভিডিও প্রকাশ করার খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। সম্প্রতি অভিনেত্রী পরীমনি ও মেহজাবীন চৌধুরীর এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর ভিডিও একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ ঘটনায় দুই অভিনেত্রীই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মেহেজাবীন চৌধুরী বলেন, ‘এআই ব্যবহার করে কারো নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া বিনোদন নয়। এটি জঘন্যতম অপরাধ।’ ওই টেলিভিশনের উদ্দেশে পরীমনি বলেন, ‘আমার স্বাভাবিক জীবনটা এভাবে আবার দুর্বিষহ করে দিয়েছেন, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাদের। আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পোস্ট দিতে পারছি না।’
পরে এ ঘটনায় টেলিভিশন চ্যানেলটি পরীমনি ও মেহজাবীন চৌধুরীর কাছে ক্ষমা চায়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ‘মাহমুদ রাফাত’ নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে এআই নির্মিত একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। তাতে সেনাবাহিনীর পোশাকের মতো পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে সরকার গঠন নিয়ে আপত্তিকর প্রশ্নে দেশবাসীর কাছে মতামত চাওয়া হয়। রিউমার স্ক্যানার জানায়, সেনা সদস্যের বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত ভিডিওটি ভুয়া। সেনাবাহিনীকে নিয়ে এমন আরো নানা ধরনের এআই ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই বাড়ছে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়েও ছড়ানো হয়েছে এআই নির্মিত একাধিক ভুয়া ছবি ও ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেলোনি জানান, তাঁর ভুয়া ছবিকে বাস্তব হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ডিপফেক ও এআই অত্যন্ত বিপজ্জনক হাতিয়ার, যা মানুষকে বিভ্রান্ত ও অপমানিত করতে পারে।’ সাধারণ মানুষকে তিনি অনলাইনে কোনো কিছু বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে ভালোভাবে যাচাই করার আহবান জানান। মেলোনি জানান, তিনি নিজের পক্ষে প্রতিবাদ জানাতে পারলেও অনেক ভুক্তভোগীর সে সামর্থ্য নেই।
চাকরিজীবী রাহাত রাকিব (ছদ্মনাম) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে এক নারীর সঙ্গে আমার ছবি জোড়া লাগিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে আমি থানায় জিডি করি।’ ভুক্তভোগী আরেক নারী জানান, তাঁর ছবি ব্যবহার করে নগ্ন ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর অনেকে তাঁকে খারাপ চোখে দেখা শুরু করেন। অথচ এতে তাঁর কোনো দায় ছিল না।
তবে কেউ কেউ বিকৃত এসব ছবিকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তাঁদের একজন উম্মে সালমা ঊষা। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ খেয়াল করলাম মেসেঞ্জারের আউটবক্সে আমার মুখ জোড়া দেওয়া কয়েকটি নুড ছবি। দেখেই ওই আইডি ব্লক করে দিই। এরপর ভিন্ন আইডি দিয়ে আবারও আমাকে একই ছবি পাঠানো হয়। পরে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, তাঁর মুখ ব্যবহার করেও একই ধরনের ছবি পাঠানো হয়েছে। তখন ভাবলাম, আমাদের পরিচিত কেউ এই বিকৃত কাজটি করেছে। পরে আর গুরুত্ব দিইনি। কারণ এগুলো ফেক।’
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন এডিটিং সফটওয়্যারে আগে ছবি বা ভিডিও বিকৃত করা হতো। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে এআই। এসব ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা, সামাজিকভাবে হয়রানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। সম্প্রতি দেবী দুর্গার প্রতিমায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার মুখ বসিয়ে তৈরি করা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এআই দিয়ে তৈরি আমার ছবিটি ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই চিন্তা সব ধর্মের জন্যই ক্ষতিকর।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী বছর থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে একই বিষয়ের পরীক্ষা হবে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ (আইসিটি) আবশ্যিক বিষয় এবং বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অভিন্ন বিষয়গুলোতে একই প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
তবে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বিশেষায়িত বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী আগের মতোই আলাদা প্রশ্নপত্র থাকবে। জানতে চাইলে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সমকালকে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করা এবং সব শিক্ষার্থীর যোগ্যতা একই মানদণ্ডে মূল্যায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘একটি রাষ্ট্র, একটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং একই সিলেবাস হওয়া সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন বোর্ডে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডকে এক সুতায় বেঁধেছি, একক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের ক্ষেত্রেও বাংলা, ইংরেজির মতো সাধারণ বিষয়গুলোর পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে।’
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জিপিএ বেশি পাওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আগামী দিন থেকে মাদ্রাসা ও স্কুল একই প্রশ্নে পরীক্ষা দেবে। আলাদা হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব জায়গায় ভর্তি হয় একই বিষয়ে, একই প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়। তাই আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তারপর দেখব, মাদ্রাসায় কেন বেশি জিপিএ পায়।’
এবার ৯টি সাধারণ বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছর থেকে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ কার্যকর করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বিষয়গুলোও অভিন্ন প্রশ্নপত্রের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা ও কারিগরি– তিন ধারার শিক্ষার্থীদের অভিন্ন বিষয়গুলোর মূল্যায়নে একই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও আইসিটির পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো অভিন্ন বিষয়েও একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে। ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগের অভিন্ন বিষয়গুলোও এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। তবে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বিশেষায়িত বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সিলেবাস অনুসারেই প্রশ্ন করা হবে।
ফলাফলে বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য
শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একই বিষয়ে বিভিন্ন বোর্ডে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে প্রশ্নের ধরন ও কঠিনতার মাত্রায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের অর্জিত নম্বর ও ফলাফলের তুলনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালু হলে সব বোর্ডের শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। ফলে মূল্যায়নে সমতা এবং ফলাফলের তুলনাযোগ্যতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশ্নপত্র অভিন্ন করলেই শিক্ষার সব বৈষম্য দূর হবে না। পাঠদানের মান, শিক্ষক সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতিও ফলে প্রভাব ফেলে। তাই অভিন্ন প্রশ্নপত্রের পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রেও সমতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মনিনুর রশীদ সমকালকে বলেন, একই প্রশ্ন হলে একই ধরনের মান যাচাই করা যাবে, এটা এক অর্থে সত্য। তবে তার আগে দেখতে হবে, স্কুলের মতো মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই মানের শিক্ষক আছেন কিনা। আমরা সবাই জানি, মাদ্রাসাগুলোতে সাধারণ শিক্ষাধারার শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্য শিক্ষকের তীব্র সংকট। সেখানে শিক্ষা উপকরণসহ রিসোর্সেরও অভাব। সুতরাং শুধু একই প্রশ্ন করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য দূর হয়ে যাবে না; মূল্যায়নও একই মানের হতে হবে। সে জন্য বিষয়ভিত্তিক একটি মূল্যায়ন মানদণ্ড (রুব্রিক্স) তৈরি করে তার ওপর পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী বছর থেকে পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন বিষয়গুলোর মূল্যায়নে বড় পরিবর্তন আসবে। তবে কোন কোন বিষয় অভিন্ন প্রশ্নপত্রের আওতায় থাকবে এবং সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে প্রশ্ন প্রণয়ন ও পরীক্ষা পরিচালনায় কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় আগেভাগেই স্পষ্ট করতে হবে।
ইত্তেফাক
‘এলডিসি উত্তরণে আরো তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরো তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশকে। এর ফলে উত্তরণের প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বাড়তি সময় পেল দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) প্লিনারি সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ওয়েব টিভিতে বৈঠকটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
বৈঠকে জি-৭৭ জোটের পক্ষ থেকে উরুগুয়ের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের বিরোধিতা করেননি কোনো দেশের প্রতিনিধি। ফ্রান্স, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা এ সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানান। তবে তাদের বক্তব্যে উত্তরণের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর আগে গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদনটি বিবেচনার জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সুপারিশ করে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে একই ধরনের সুপারিশ করেছিল।
২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়েই এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি চলছিল বাংলাদেশের। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়।
সরকারের যুক্তি ছিল, বাড়তি সময় পাওয়া গেলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, চলমান সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং মসৃণ উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) আওতায় নির্ধারিত কাজগুলো শেষ করা সহজ হবে।
আবেদনে বলা হয়, এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকটে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীর পুনরুদ্ধার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় কঠোরতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বিশ্ববাণিজ্যের অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যার দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টিও আবেদনে তুলে ধরা হয়।
সরকারের প্রত্যাশা, অতিরিক্ত সময় কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটানো এবং উত্তরণের পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘চাকচিক্যের নগরে সবই আছে, নেই শুধু স্বস্তি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, চাকচিক্যময় আধুনিক ও টেকসই নগরী কেবল ইট-পাথর, বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার কিংবা মেগা অবকাঠামোর সমষ্টি হতে পারে না। নগরের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার সাধারণ অধিবাসীদের সার্বিক জীবনমান, নিরাপদ চলাচল, বিশুদ্ধ বাতাস, সুপেয় পানি, সবুজ উন্মুক্ত স্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তায়। অথচ বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকা এই মৌলিক শর্তগুলো পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। রাজধানীর প্রতিটি ক্ষেত্রে পদে পদে দুর্ভোগ আর জনভোগান্তি। সড়ক কিংবা বাসা সব জায়গায় প্রাণঘাতী দূষণের উপস্থিতি বিরাজমান। এই শহরে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে না পারলেও উঁচু দালান আর চাকচিক্যের কোনো কমতি নেই।
আজ বিশ্ব শহর দিবস। এ দিবসটির মূল বার্তাই হলো-নগর গড়ে উঠবে মানুষের জন্য, মানুষ নগরের জন্য নয়। নগরবিদরা বলছেন, একটি শহরের সফলতা মাপা উচিত তার ভবনের উচ্চতায় নয়; বরং শিশুরা কতটা নিরাপদে খেলতে পারছে এবং সাধারণ নাগরিকরা কতটা স্বস্তি ও সম্মান নিয়ে বেঁচে আছেন তার ভিত্তিতে। অথচ এই শহরে খোলা বাতাস, সুপেয় পানি, সাশ্রয়ী আবাসন ও সুগম চলাচলের ন্যূনতম নিশ্চয়তা নেই।
জাতিসঙ্ঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাস করে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঘটবে শহরগুলোতে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন কোটি ৬৬ লাখেরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল নগর। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৬ সালের জাতীয় নগর ফোরামের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের নগর অর্থনীতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬৫ শতাংশ জোগান দেয়। তবে এই বিরাট অর্থনৈতিক অবদানের বিপরীতে ঢাকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন পরিণত হয়েছে এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও সঙ্কটে।
সকালে কর্মস্থলে যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, বর্ষায় অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক তলিয়ে যাওয়া, ক্ষতিকর ও দূষিত বাতাস, সুপেয় পানির অভাব এবং সাশ্রয়ী বাসস্থানের মারাত্মক সঙ্কট আজ তিন কোটি মানুষের নিত্যদিনের নিয়তি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে। অথচ ঢাকাকেন্দ্রিক অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ও সেবার কেন্দ্রীভবন রাজধানীর ওপর এমন এক অসহনীয় চাপ তৈরি করেছে, যা পুরো নগর কাঠামোকে ভেঙে পড়ার মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ চলতি বছরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পরিবেশগত সূচকের ভিত্তিতে ঢাকার বাসযোগ্যতার গত দুই দশকের যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাত্র ২০ বছরে ঢাকার পরিচ্ছন্ন ও বসবাস উপযোগী ভূখণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে এবং অবাসযোগ্য এলাকার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণে দাঁড়িয়েছে।
সাময়িকীটির গবেষণা তথ্য অনুসারে, গত দুই দশকে ঢাকায় পরিবেশগত বাসযোগ্য এলাকা ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতক্রমে অবাসযোগ্য এলাকা ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ার-এর ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বার্ষিক গড় পিএম দুই দশমিক পাঁচ ঘনত্বের হিসাবে ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক দূষিত প্রধান শহর। ঢাকায় বার্ষিক গড় পিএম দুই দশমিক ৫ ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম, যা মারাত্মক জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্য দিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এ বছরের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে কেবল ঢাকা শহরেই ৪০৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২৯ জন নিহত এবং ৫১১ জন আহত হয়েছেন। পথচারীবান্ধব ফুটপাথ দখল, মিশ্র যান চলাচল ও আধুনিক গণপরিবহনের অভাবেই এই প্রাণহানি ঘটছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলে অবস্থিত। ঢাকা অঞ্চলে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হবে এবং জরুরি সেবাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
এ অবস্থায় বাসযোগ্য শহর গড়তে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকায় বিলুপ্ত হওয়া ২৬টি খাল পুনরুদ্ধার, প্রবহমান খালগুলো দখলমুক্তকরণ এবং সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ঢাকার জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে দূর করতে হবে। প্রতিটি সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডে ঘাটতি নিরূপণ করে শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশগম্য খেলার মাঠ, পার্ক ও সবুজ এলাকা গড়ে তোলা জরুরি। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমিয়ে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন, আধুনিক মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক এবং ফুটপাথ দখলমুক্ত করে পথচারীবান্ধব সড়ক নির্মাণ করতে হবে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কর্মস্থলের কাছাকাছি পরিকল্পিত সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। আর বস্তি উচ্ছেদ নয়; বরং সেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসনিক কার্যাবলি ও শিল্পকারখানা ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও জেলা শহরে স্থানান্তরিত করে ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে হবে। রাজউক, সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা ও পরিবেশ অধিদফতরের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি একক ও শক্তিশালী নগর কর্তৃপক্ষের অধীনে তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ঢাকার প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে সবুজ এলাকার পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র ৮ শতাংশে। এ ছাড়া ঢাকার ঐতিহাসিক ৫৬টি খালের মধ্যে ২৬টিই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং শহরের ৪৮টি এলাকা নিয়মিত তীব্র জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল ইতোমধ্যে বিলুপ্ত বা চরম বাধাগ্রস্ত অবস্থায় পড়েছে। কোনো সুস্থ উন্নয়ন দর্শন নয়; বরং নিছক ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠী স্বার্থই ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে আমাদের আবাসন এলাকাগুলো কেবল ঘুমানোর জায়গায় পরিণত হয়েছে; অথচ নগর দর্শনে এসব এলাকা থাকার কথা ছিল একেকটি প্রাণবন্ত সামাজিক কমিউনিটি।
বণিক বার্তা
‘ঈদে ঘরে ফেরার প্রত্যাশা’ থেকে আরো দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় রোহিঙ্গারা—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, আশ্রয়, শিক্ষাসহ প্রায় সব মানবিক খাতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সহায়তা এভাবে কমতে থাকলে শিগগিরই রোহিঙ্গা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকিও তৈরি করবে।
গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। চারদিনের ওই সফরের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল রোহিঙ্গা সংকট। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পও পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়ে সংকটটির দিকে আবারো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। সেদিন প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়া করি, সামনের বার যেন আপনারা নিজের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে পারেন।’ পরে ঈদ উপলক্ষে দেয়া বার্তাতেও একই প্রত্যাশার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। এর ছয় মাস পর, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয় ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতিবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন’। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনকে সংকটের টেকসই সমাধান হিসেবে জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।
তবে এরপর রোহিঙ্গা পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, উল্টো আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। রাখাইনে সংঘাত আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সময়ে সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণও কমে এসেছে নাটকীয়ভাবে।
২০২৫ সালে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান বা জেআরপির আওতায় ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার চাওয়া হয়েছিল। বছর শেষে পাওয়া যায় ৪৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার—চাহিদার মাত্র ৪৬ শতাংশ। ২০১৭ সালের পর কোনো বার্ষিক জেআরপিতে অর্থায়নের হার এত নিচে নামেনি।
চলতি বছর অর্থ সংকটের কারণে পরিকল্পনাটিই ছোট করে ফেলেছে জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো। ২০২৬ সালের জন্য চাওয়া হয়েছে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) ফাইন্যান্সিয়াল ট্র্যাকিং সার্ভিসের তথ্যভিত্তিক ১৪ জুলাই পর্যন্ত হালনাগাদ অনুযায়ী, এ চাহিদার বিপরীতে ৩১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার অর্থায়নের তথ্য রিপোর্ট হয়েছিল, যা মোট চাহিদার ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থায়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে প্রয়োজনীয় সহায়তার বড় অংশই ঘাটতিতে থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, আশ্রয়, শিক্ষাসহ প্রায় সব মানবিক খাতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সহায়তা এভাবে কমতে থাকলে শিগগিরই রোহিঙ্গা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকিও তৈরি করবে।
আর্থিক সহায়তা ও প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা—দুটোই কমে আসায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আছে বলে মনে করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি কঠিন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে রাখাইনের বর্তমান বাস্তবতা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরার বিষয়ে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, সেগুলো অনেকটাই রেটরিক ছিল। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি চিন্তা করা হয়নি।’
২০১৭ সালেও প্রত্যাবাসন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা—দুই ক্ষেত্রেই বর্তমানের তুলনায় পরিস্থিতি ভালো ছিল জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করতে পারেনি। উল্টো গত দুই বছর আরো প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ওপর কীভাবে কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা যায়, সেটি নিয়ে পরিকল্পনা করা জরুরি। আগামী নয় বছরেও যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব না হয়, তাহলে বাংলাদেশ কী করবে—এখন থেকেই সে বিষয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।’
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দেয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু একই ঘোষণায় মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়গুলোর একটি হলো নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার। মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। একই সঙ্গে স্বাধীনভাবে চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে প্রবেশাধিকার নিয়েও স্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই। ফলে শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না; ফেরার পর রোহিঙ্গারা কী আইনি মর্যাদা পাবে এবং নাগরিক হিসেবে কী অধিকার ভোগ করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম প্রতিবন্ধীদের ‘মুক্তা’য় ধস। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে চাহিদা আছে, ক্রেতাদের আস্থাও রয়েছে। কিন্তু চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন করতে পারছে না সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ‘মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটার’। উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, বাজারজাতকরণে দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় গত ২ বছর এই বোতলজাত পানির উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাজারে নিয়মিত মিলছে না প্রতিবন্ধীদের উৎপাদিত বোতলজাত পানি ‘মুক্তা’।
গাজীপুরের টঙ্গীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠান মৈত্রী শিল্পে উৎপাদিত হয় এই বোতলজাত পানি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ৫০ লাখ ৩ হাজার ৭৪৩ লিটার পানি উৎপাদন হয়েছিল, দুই বছরের ব্যবধানে তা নেমে এসেছে ২৪ লাখ ৯ হাজার ৫০০ লিটারে। অর্থাৎ ২ বছরে উৎপাদন কমেছে ২৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৪৩ লিটার বা প্রায় ৫২ শতাংশ। মুক্তা পানির উৎপাদনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪২ লাখ ১০ হাজার লিটার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৫ লাখ ৮ হাজার লিটার পানি উৎপাদন করা হয়। পরের বছর উৎপাদন বেড়ে ৫০ লাখ লিটার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এরপর থেকেই উৎপাদনে বড় ধরনের পতন শুরু হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে আসে ২৫ লাখ ১ হাজার ৮৬৩ লিটারে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৯ হাজার ৫০০ লিটারে।
চাহিদা ২ লাখ, উৎপাদন ৫০ হাজার লিটার : মৈত্রী শিল্প কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ লিটার মুক্তা পানির চাহিদা রয়েছে। অথচ কারখানার বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ হাজার লিটার। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে মাত্র এক-চতুর্থাংশ। এই সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের সব অঞ্চলে নিয়মিতভাবে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুর শহর ও আশপাশের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দোকানির কাছেই ‘মুক্তা’ পানির নিয়মিত সরবরাহ নেই। কেউ কেউ নাম জানলেও তাদের দোকানে এই পানি সচরাচর দেখা যায় না। আবার যেসব দোকানে মুক্তা পানি পাওয়া যায়, সেখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতাদের মধ্যে এর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ নিয়মিত না হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করা সম্ভব হয় না। গাজীপুর শহরের ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন বলেন, আমি মুক্তা পানি রাখতে আগ্রহী। ক্রেতারাও এই পানি খোঁজ করেন। বহু চেষ্টা করেও পানি আনতে পারিনি। যদি সব দোকানে সরবরাহ করা যেত অন্য সব পানি থেকে এই পানি বাজারে বেশি চলত।
১১ ধাপে পরিশোধন: মুক্তা পানির গুণগত মান নিয়ে আপস না করার কথা জানিয়েছে মৈত্রী শিল্প কর্তৃপক্ষ। কারখানায় রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তিতে ১১টি ধাপে পানি পরিশোধন করা হয়। উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও নজর দেওয়া হয়। পরিশোধনের পর পরীক্ষাগারে পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়। নির্দিষ্ট পোশাক ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এসব কাজ করা হয়। এখানকার কর্মীদের একটি বড় অংশ শারীরিক প্রতিবন্ধী।
সরকারি সিদ্ধান্তে ধাক্কা, সঙ্গে পুরনো সীমাবদ্ধতা : উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি দপ্তরগুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতলজাত পানি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মুক্তা পানির বড় ক্রেতা হওয়ায় ওই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে উৎপাদন ও বিক্রিতে। তবে শুধু সরকারি পর্যায়ে বোতলজাত পানির ব্যবহার কমে যাওয়াকেই দায়ী করছে না মৈত্রী শিল্প। দীর্ঘদিনের উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, বাজারজাতকরণে ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকাকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। কালিয়াকৈর ইউএনও অফিসের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম বলেন, এক সময় আমাদের নিয়মিত মুক্তা পানি সরবরাহ করা হতো। তবে গত এক দেড় বছর আগে থেকে পানি ঠিকভাবে সরবরাহ করা হয় না, যার কারণে অন্য পানি কিনতে হচ্ছে।
উৎপাদন কমার সঙ্গে কমেছে আয়: উৎপাদনের সঙ্গে মুক্তা পানি বিক্রির আয়েও পরিবর্তন এসেছে। মৈত্রী শিল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে মুক্তা পানি বিক্রি করে আয় হয় ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় পৌঁছে। এরপর আয় কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৭০ লাখে।
প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আয়-ব্যয়ের হিসাবেও ওঠানামা রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মৈত্রী শিল্পের আয় ছিল ২৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, বিপরীতে ব্যয় ২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় ২৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ২৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় বেড়ে ২৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা হলেও ব্যয় বেড়ে হয় ২৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং ব্যয় ২৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘সীমান্ত পেরিয়ে আসছে সবই’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সীমান্তজুড়ে থামছে না পণ্য পাচারের উভয়মুখী স্রোত। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে মাদক, অস্ত্রসহ নানা ধরনের পণ্য দেদার ঢুকছে দেশে। উল্টো স্রোতে বাংলাদেশ থেকেও পাচার হচ্ছে সার, সিমেন্ট, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য। নার্কো কারেন্সি কিংবা বিনিময় প্রথার এই বাণিজ্য এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। চালান থামাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে বিভিন্ন পণ্য জব্দের তালিকা বড় হলেও তৎপরতা থামছে না চোরাকারবারিদের। প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা রাতের আঁধারে ২৪ ঘণ্টাই চলছে চোরাচালানের আদানপ্রদান। সীমান্তবর্তী বাজারগুলো অবৈধ প্রসাধনী, শিশুখাদ্য, চকলেট, পানীয়, চোরাই মোবাইল ফোন, মসলা ও কাপড়ে ছেয়ে গেছে।
আবার বিভিন্নভাবে এসব পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে বিভাগীয় ও জেলা শহরে। দেশের যেকোনো জায়গায় যেন হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ বিদেশি পণ্য।
শুধু তাই নয়-সীমান্তের কাঁটাতার টপকিয়ে গরু ছাগলসহ বিভিন্ন পশু আনা হচ্ছে দুই দেশের প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁটাতারের অভাবে বিভিন্ন স্পটে অরক্ষিত সীমান্ত, পাহাড়ি দুর্গম পথ, নজরদারির ঘাটতি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্রের কারণে থামানো যাচ্ছে না চোরাচালান। এতে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্রের অবাধ প্রবেশে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকিও। সেই সঙ্গে দেশ থেকে সরকারের ভর্তুকির সারসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য পাচার হচ্ছে। এজন্য দেশে এসব পণ্যের সংকট তৈরির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা চোরাচালানের অন্যতম হাব হয়ে উঠেছে। এ ছাড়াও যশোর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার সীমান্ত রুট দিয়ে চলছে চোরাচালান কার্যক্রম।
এক হাতে অস্ত্র-মাদক, অন্যহাতে পণ্য: প্রাপ্ত তথ্য মতে, মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে জ্বালানি তেল, সিমেন্ট, সার, রসুন, পিয়াজ, ডাল, আলু, ভোজ্য তেল, আদা, কাপড়ও ওষুধসহ নিত্যপণ্য। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাচার হওয়া ইউরিয়া সারের উপাদান আরকান আর্মি বোমা তৈরিতে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সীমান্তে আরকান আর্মি বাঙ্কার নির্মাণ করায় সিমেন্টের চাহিদা বেড়েছে বলে জানা গেছে। পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে মাছ ধরার ট্রলার ও সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করছেন চোরাকারবারিরা। এই পাচারের কাজে অর্থের পরিবর্তে ‘পণ্য বিনিময়’ হয়ে থাকে। পাচার হওয়া জিনিসপত্রের বিনিময়ে আনা হচ্ছে মাদক ও অস্ত্র। সম্প্রতি উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিন অনুসন্ধানে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, টেকনাফের অন্তত ২১ পয়েন্ট দিয়ে চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে একটি সুসংগঠিত চক্র। প্রথম স্তরে রয়েছে কয়েকজন রোহিঙ্গা সশস্ত্র সদস্য। যারা রাখাইন রাজ্য থেকে চাহিদা বা অর্ডার সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় স্তরে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, যার মধ্যে পালংখালী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় স্তরে রয়েছে ৬-৭ জনের একটি ব্যবসায়ী চক্র, যারা পণ্য সংগ্রহ, মজুত ও সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। উখিয়ার গয়ালমারা এলাকার সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তি সার পাচার চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে। একাধিক মামলা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গফুরউদ্দীন চৌধুরী বলেন, রাখাইন জনগোষ্ঠী ও আরাকান আর্মি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যই এখন চোরাপথে আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে। মিয়ানমারে ইউরিয়া সার দিয়ে বোমা তৈরির কথা তিনি শুনেছেন। এমনকি ব্যাটারিতে ব্যবহৃত অ্যাসিডও পাচার হয়, যা ধরাও পড়েছে। বিজিবি কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানান, সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
সিলেট সীমান্তে শতাধিক করিডর: অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয় এবং জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও কানাইঘাট দিয়ে আসাম রাজ্য থেকে চোরাইপণ্য আসে। এই ছয় উপজেলার শতাধিক পয়েন্ট দিয়ে চোরাচালান হয়ে থাকে। মেঘালয়ঘেঁষা সীমান্তে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে আর আসাম সীমান্তে নদীপথে এই করিডর তৈরি করেছে চোরাকারবারিরা। এর মধ্যে মেঘালয়ঘেঁষা সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন জাতের মদ, ফেনসিডিল এবং আসামের সীমান্ত দিয়ে আসে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের চালান। এসব করিডর দিয়ে ভারতীয় মসলা, পোশাক, চিনি, চা পাতা, চকলেট, বিস্কুট, এনার্জি ড্রিংকস, সাবান, টুথপেস্ট, শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা এবং গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আসছে। এই চোরাচালান কারবারে, পৃষ্ঠপোষক, মালামাল সীমান্ত পার করা চক্র, পরিবহন শ্রমিক, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ গ্রুপ এবং আড়তদার হিসেবে পৃথক সিন্ডিকেটে বিস্তৃত। এসব সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সিলেট সীমান্ত হয়ে উঠছে ভারতীয় পণ্যের হাট। বিজিবি সিলেট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য জব্দে কঠোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এদিকে মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলার প্রায় ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ পণ্য ও মাদক প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
