ইরান কি পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে?

ইরান কি পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে?

ফন্ট সাইজ:

ইরান কি পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে! নাকি বানানোর পথে! ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের মধ্যে এমন ইস্যু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কোনো কোনো সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ডস করপসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা ফার্সের একটি রিপোর্টের পর বিষয়টি ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানকে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে তখন সেই হুমকিকে নস্যি হিসেবে উড়িয়ে দিচ্ছে ইরান। ফলে অনেকেই ভাবছেন ইরানের হাতে হয়তো পারমাণবিক বোমা আছে না হয় তারা এই বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে।

বিশেষ করে সম্প্রতি চীন থেকে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম সরবরাহের খবর প্রকাশের পর এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে। ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবিকে জনসাধারণের চাওয়া হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে আইআরজিসি। রাস্তায় সাধারণ মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে জনসমর্থন রয়েছে বলে প্রচার করেছে বার্তা সংস্থা ফার্স। এক্স ও টেলিগ্রামে ছড়িয়ে দেয়া ভিডিওটির বিবরণে ফার্স লিখেছে, এই মুহূর্তে ইরানিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত দাবি হলো: আমেরিকা ও ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক বোমা থাকবে, অথচ আমাদের থাকবে না কেন?

সংবাদ সংস্থাটি নির্বাচিত কয়েকটি সাক্ষাৎকারকে পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। যদিও এসব সাক্ষাৎকার থেকে ইরানের কতসংখ্যক মানুষ এমন অবস্থান সমর্থন করেন, তার নির্ভরযোগ্য কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইরানের কয়েকজন আইনপ্রণেতা এবং ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যে যুক্তি তুলে ধরেছেন, ফার্সের এই প্রচার তারই প্রতিধ্বনি। ইরানের পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তন আনার আলোচনা অবশ্য সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগেই শুরু হয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খাররাজি বলেছিলেন, ইসরাইল যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় অথবা দেশটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে তেহরান তার পারমাণবিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। পরবর্তী সময়ে তিনি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২৬ সালের এপ্রিলে তেহরানে নিজের বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় আহত হওয়ার পর মারা যান খাররাজি। গত আগস্টে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ) সচিব মোহসেন রেজায়ি যুক্তি দেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিগুলো ইরানকে সামরিক হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে রেজায়ি বলেন, আমেরিকা যখন এ ধরনের যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করে, তাহলে আমরা নিজেরাই কেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করব না? তার এই বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইরানের ওপর হামলা পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের পক্ষে যুক্তিকে আরও জোরালো করেছে।

কয়েকজন আইনপ্রণেতা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। গত ১৮ অক্টোবর দেশটির পার্লামেন্টের প্রেসিডিয়াম কমিটির সদস্য আহমেদ নাদেরি বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো এবং পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে কথা বলে আসছেন। নাদেরি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রয়াত পিতা আলি খামেনির অবস্থান থেকে ভিন্ন অবস্থান নিতে পারেন। আলি খামেনি ধর্মীয় ফতোয়ার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে গত জুলাইয়ে আইনপ্রণেতা আহমেদ বাখশায়েশ আরদেস্তানি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আহ্বান জানান। তার যুক্তি, দেশটি ইতিমধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য বড় মূল্য দিয়েছে।

রক্ষণশীল সংবাদপত্র ‘ভাতান-এ ইমরোজ’ও অক্টোবর মাসে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পত্রিকাটির শিরোনাম, ‘ইরানের বোমা তৈরি করা উচিত’। এতে বলা হয়, পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবিকে জনসাধারণের চাওয়া হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা অবশ্য ফার্সের সাম্প্রতিক ভিডিওতেই প্রথম নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক ভাষ্যকার দাবি করেন, ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে। তবে এ দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য কোনো জনমত জরিপের পদ্ধতি বা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ যুক্তি দিয়েছেন, পারমাণবিক অস্ত্র কোনো দেশের নিরাপত্তা কিংবা অস্তিত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তার এই বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন কট্টরপন্থিরা। তাদের মতে, ভবিষ্যতে হামলা প্রতিরোধে পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োজন।