ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা নিয়ে সতর্ক আশাবাদী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। শুক্রবার দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এ কথা জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে উচ্চপর্যায়ের একটি আঞ্চলিক প্রতিনিধিদলের তেহরান সফরের পর প্রথম সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান তিনি। আট মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। অক্টোবর মাসে তিনি দু’বার তেহরান সফর করেছেন। সর্বশেষ গত সোমবার সৌদি আরব ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ইরান সফরে যান তিনি। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সফরগুলো ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি না থাকলে ফিল্ড মার্শাল কেন দু’বার সেখানে যাবেন? সুতরাং হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি আরও বলেন, আমরা সব সময় যে শব্দটি ব্যবহার করি, তা হলো সতর্ক আশাবাদী। আহমেদ শরিফ বলেন, শক্তিশালী কিছু পক্ষ ও বিরোধী গোষ্ঠী এখনো মনে করে, এই সংঘাত তাদের স্বার্থ পূরণ করছে। তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ করেননি।
সর্বশেষ তেহরান সফরে আসিম মুনিরের সঙ্গে ছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এবং তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন। সফরকালে প্রতিনিধিদলটি ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ) সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে। আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করে রেজায়ি বলেন, চারটি দেশই বিশ্বাস করে, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ালে আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব। বৈঠকের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূচনা হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে। কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি হয়। এর ফলে সংঘাতের প্রথম দফার তীব্র লড়াই বন্ধ হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এরপর থেকে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তান এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। অক্টোবরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় অগ্রগতির প্রতিফলন।
সর্বশেষ এই উদ্যোগে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর ইরান, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়। এরপর সৌদি আরব তেহরান বৈঠকের ফলাফলকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানায়। পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনা পুনরায় ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেয়ার তাগিদ দেয় দেশটি। এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনার পাশাপাশি সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পাকিস্তানের পাশাপাশি সৌদি আরব ও তুরস্কের অংশগ্রহণ এ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক দেশগুলোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার প্রতিফলন। এসব দেশ সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে চাইছে।
