আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের আমীর শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী (পীর বরুণা) বলেছেন, আত্মশুদ্ধির মেহনত ব্যতীত সমাজ সংস্কার অসম্ভব। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আল্লাহ এবং তার রাসূলের পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি সম্ভব। তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যে গোনাহ করতেন, ইসলাম গ্রহণের পর আত্মশুদ্ধির মেহনত করে তারা হয়ে গেলেন সোনার মানুষ। বর্তমানে সমাজে যত অনাচার, হত্যা, দুর্নীতি ও অরাজকতা রয়েছে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সব বন্ধ হয়ে যাবে।
শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের ৮২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আজিমুশ্বান ইসলাহী ইজতেমায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাদ ফজর থেকে শুরু হওয়া ইজতেমায় আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, মানুষের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার প্রাচুর্য কিংবা বাহ্যিক উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঈমানের দৃঢ়তা, আমলের বিশুদ্ধতা, চরিত্রের সৌন্দর্য এবং আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। কিন্তু দুনিয়ার ব্যস্ততা ও প্রবৃত্তির টানে অনেক সময় আমরা নিজেদের সংশোধনের কথা ভুলে যাই। ইবাদতে শৈথিল্য, আমল-আখলাকের দুর্বলতা এবং পারস্পরিক অধিকার আদায়ে অবহেলা আমাদের দ্বীনি জীবনে প্রভাব ফেলে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত আত্মসমালোচনা, উপকারী নসিহত গ্রহণ, দ্বীনি পরিবেশের সাহচর্য এবং আত্মশুদ্ধির মেহনত। ইসলাহী ইজতেমা মানুষকে সেই পথে ফিরে আসার এবং জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রেরণা জোগায়।
তিনি বলেন, ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে শায়খুল ইসলাম আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ. আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে দ্বীনি ও ইসলাহী মেহনতের সূচনা করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ, সুন্নতের অনুশীলন, আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রতি আহ্বান জানানো। তার রেখে যাওয়া এ ইসলাহী ধারার যথাযথ পরিচর্যা ও অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। এ মেহনত কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক নয়; বরং মানুষের জীবনে দ্বীনের শিক্ষা বাস্তবায়ন এবং ব্যক্তি ও সমাজের সংশোধনে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার নাম।
পীর সাহেব বরুণা আরও বলেন, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম কারো ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়। কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানোর এজেন্ডাও এ সংগঠনের নেই। এ সংগঠন দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষকে এক আল্লাহর দাওয়াত প্রদান এবং তার আদেশ-নিষেধ পালনে উদ্বুদ্ধ করার কাজেই একনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকে।
বাংলাদেশের প্রতিটি ঘর হবে এক একটি মাদরাসা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিটি পরিবারে দ্বীনি শিক্ষা ও তালিমের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি বই পাঠ কিংবা প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল শেখার ব্যবস্থা করুন। সন্তানদের বয়স অনুযায়ী কুরআন, নামাজ, ঈমান-আকিদা, মৌলিক ইবাদত ও ইসলামী আদব শেখান এবং তাদের মক্তব বা উপযুক্ত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বীনি জ্ঞানচর্চা ও আমলের অভ্যাস গড়ে উঠলে ঘরগুলোই হয়ে উঠবে দ্বীন শেখা ও শেখানোর কার্যকর কেন্দ্র।
তিনি মসজিদের ইমামদের উদ্দেশ্যে বলেন, জুমআর খুতবার আগে মুসল্লিদের একটি করে ছোট সূরা মশক করানোর উদ্যোগ নিন। সূরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে ৫২ সপ্তাহে অন্তত ১০টি সূরা সহিহভাবে শেখানোর চেষ্টা করুন। পাশাপাশি প্রতি জুমায় একটি করে জরুরি মাসআলা সহজভাবে আলোচনা করুন এবং প্রয়োজনে তার সঠিক প্রয়োগ হাতে-কলমে দেখিয়ে দিন।
ইজতমায় আগত মুসল্লিদের উদ্দেশ্য আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর মধুপুর বলেন, যারা নবীজী সা. কে শেষ নবী মানে না, তারা কাফের। তিনি কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতীব মুফতি আব্দুল মালেক বলেন, ঈমানের সাথে তাকওয়া জরুরি। তাকওয়া ছাড়া ঈমান হয় না আর ঈমান ছাড়া তাকওয়া হয় না। আল্লাহকে ভয় করতে হবে। ফরজ ওয়াজিব আদায় করতে হবে। সব ধরণের গোনাহ পরিত্যাগ করে আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, বর্তমানে এলজিবিটিকিউ এবং ট্রান্সজেন্ডারকে বিভিন্ন ভাবে প্রমোট করা হচ্ছে। এই অভিশপ্ত ঘৃণ্য কাজ সমাজে ছড়িয়ে দিতে নানাবিধ চক্রান্ত চলছে। যে কোন মূল্যে এসব রুখে দিতে হবে।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, ড. আফম খালিদ হোসেন নব্বই ভাগ মুসলমানের এই দেশে মুসলমানের সন্তানদের ঈমান আমলের হেফাজতের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাথমিক স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র সঠিক দায়িত্ব পালন না করলে আমাদের দায়িত্ব, আমাদের সন্তানদের ফরজে আইন পরিমাণ দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সংগঠনের প্রকৃত শক্তি শুধু তার পরিচিতি কিংবা বড় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর্মীদের ইখলাস, দায়িত্বশীলদের আমানতদারিতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং আদর্শের প্রতি অবিচলতার মধ্যেই এর ভিত্তি নিহিত। প্রত্যেক দায়িত্বশীলের উচিত নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে দ্বীনি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেওয়া। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আদব ও দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করা।
আঞ্জুমানের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শেখ সাদ আহমদ আমীন বর্ণভী, মুফতি ওয়াজেদ আলী ও মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফীর সঞ্চালনায় আলোচনা করেন আওলাদে রাসূল সা. সাইয়্যিদ ফয়সাল নাদীম, খেলাফত মজলিস মনোনীত সিলেট-৫ আসনের এমপি মুফতি আবুল হাসান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, ওলামা-মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সভাপতি মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন, মাওলানা আকরাম আলী ফরিদপুর, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মুফতি শেখ আহমদ আফজল বর্ণভী, মুফতি ইমাদুদ্দীন ফরিদাবাদ, হাফেজ মাওলানা আলী আকবর কাসেমী, মুফতি সাইফুল ইসলাম ফারুকী প্রমুখ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশের জুমার জামাতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ বিপুল সংখ্যক মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।
