আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় লড়তে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন না সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ ৫ আসামি। গতকাল এই আসামিদের করা আবেদন নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। কয়েকটি কারণ দেখিয়ে আবেদনগুলো নাকচ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ফারজানা রুপার নিযুক্ত আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক ও জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার মানবজমিনকে বলেন, বার কাউন্সিল এখন পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। এদিকে বার কাউন্সিলের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এটা এখন প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তার পেছনে কারণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদনের পর তা লিখিত আকারে প্রকাশ করা হবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, ট্রাইব্যুনালে বিদেশি আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার সুযোগ দেয়া হলে তিনি যদি কোনো পেশাগত অসদাচরণ করেন তাহলে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোনো বিধান বার কাউন্সিল আইনে নেই। ফলে বিদেশি আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার জন্য কোনো সুযোগ দেয়া উচিত হবে না। এ ছাড়া দেশের আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য অতীতে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের কোনো রেওয়াজ নেই। এমনকি শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের অনেক দেশের আদালতে বিদেশি আইনজীবীরা মামলা লড়তে পারেন না।
সূত্রটি জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধে করা মামলায় আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য নিয়োগকৃত দেশি আইনজীবীদের পরামর্শ দেয়ার সুযোগ বিদেশি আইনজীবীদের রয়েছে। এসব কারণে বিদেশি আইনজীবীদেরকে বাংলাদেশের আদালতে মামলা লড়ার জন্য কোনো ধরনের অনুমতি দিচ্ছে না বার কাউন্সিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক-এর মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারের কাঠগড়ায় আছেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা মে. জে. (অব.) জিয়াউল আহসান। আর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গণহত্যার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত রিপোর্ট করে বিচারের মুখোমুখি একাত্তর টিভির বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক ফারজানা রূপা।
এই ৫ জন নিজেদের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দেয়ার লক্ষ্যে বার কাউন্সিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। গতকাল বিকালে এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। বৈঠকে কাউন্সিল সদস্যরা তাদের নিজেদের মতামত উপস্থাপন করেন। পরে সর্বসম্মতিক্রমে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের অনুমতির আবেদনগুলো নাকচ করে দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় (আইসিটি-বিডি মামলা নং ০৮/২০২৫) শুনানিতে অংশ নিতে যুক্তরাজ্যের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বারসের আইনজীবী এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড সিবিই কেসি ও গ্রাহাম এল. হলকে নিয়োগের অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। এর আগে ২০২৫ সালের ১০ই ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর জেল কর্তৃপক্ষ সালমান এফ রহমানের আবেদনটি বার কাউন্সিলে পাঠায়। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ওই দুই আইনজীবীও অনুমতির জন্য গত ১৭ই আগস্ট ই-মেইল (গৃহীত ১৮ই আগস্ট) এবং ২৪শে আগস্ট হার্ড কপি জমা দেন, সবশেষ গত ১৫ই সেপ্টেম্বর মনসুরুল হক চৌধুরী বার কাউন্সিল সচিব বরাবর আবেদনটি করেন। একইভাবে, ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিক ফারজানা রুপার পক্ষে লড়তে একই ল চেম্বারের অপর দুই আইনজীবী জোনাথন প্রাইস কেসি ও নিকিলা কৌশিকের অনুমতি চেয়ে গত ১লা অক্টোবর বার কাউন্সিলে ই-মেইলে আবেদন পাঠানো হয়।
