একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলাদেশের কথা এবং বাংলা ভাষার কথা বলা হয়েছিল। কেউ যদি ইতিহাস বলতে যায় তাহলে সেই ইতিহাসই পাবেন। ১৯৬৪ সালে যখন টেলিভিশনের জন্ম হয় সেই সময় টেলিভিশনে যারা উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন তাদের ভেতর অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন জামিল চৌধুরী। তার সঙ্গে যারা কাজ করতেন তাদের নিয়ে তিনি ঠিক করেছিলেন টেলিভিশন যখন অনএয়ার যাচ্ছে তখন টেলিভিশনের সবকিছু বাংলাতেই হবে। কারণ পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় বাংলা ভাষাভাষির সংখ্যা বেশি। এখানকার মানুষ আবেগপ্রবণ। বাংলার মানুষের মনের ভাষা যেন বুঝেছিলেন জামিল চৌধুরী এবং তার দল। তাই টেলিভিশনের সবকিছু বাংলাতেই শুরু করলেন। যেমন চেক বই লেখা, অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট, স্টুডিওর নাম, কক্ষের নাম ইত্যাদি। সেই ধারাবাহিকতায় রিহার্সেল কক্ষের নাম রাখা হয়েছিল মহড়া কক্ষ। মেকআপ রুমের নাম সাজসজ্জা ঘর। প্রযোজকদের রুম, সম্পাদনা- এগুলো যে শুধু বাংলায় লেখা হয়েছিল তাই নয় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান যখন টেলিভিশন উদ্বোধন করতে এসেছিলেন তখন তাকে যে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়েছিল তাতে তারিখ লেখা হয়েছিল বাংলায়। সে অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল বাংলায়।
প্রথম দিন থেকেই টেলিভিশনে বাংলার উপর জোর দেয়া হয়েছিল। আর এই বাংলা চর্চার কাজ যারা করেছিলেন তাদের অনেকেই পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তারা সকলে পরামর্শ করেই টেলিভিশনে বাংলার প্রচলন শুরু করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের মধ্যে বাংলার একটা ছাপ থাকবে। বাংলাদেশের একটা ছোঁয়া থাকবে, বাংলা গানের একটা প্রভাব থাকবে। এই চেষ্টা তারা টেলিভিশন সম্প্রচারের শুরুর দিন থেকেই করেছিলেন। এ কারণেই যখন একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধ পুরোপুরি শুরু হয়নি তখন টেলিভিশনের পর্দায় চলেছিল ছায়ানট পরিবেশিত রবীন্দ্রনাথের চন্ডালিকা, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত। আর এগুলো ছিল দেশপ্রেমের গান। সেই সময় স্বল্প কারিগরি সুবিধার ভেতর দিয়েও তারা কতো সুন্দর কাজ করে গেছেন। সিকান্দার আবু জাফরের একটি গান মুস্তাফা মনোয়ার এমনভাবে তৈরি করলেন যেন হাজার হাজার দর্শক সেই অনুষ্ঠান দেখছে। মনে হচ্ছে জনতার ঢল নেমেছে টেলিভিশনের পর্দায়। টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরি করা হলো সুকান্তের কবিতা দিয়ে।
টেলিভিশনের আরেক বিখ্যাত নাট্যকার ও নির্মাতা আব্দুল্লাহ আল মামুন সেই স্বল্প কারিগরি সুবিধা নিয়ে কবিতার শুটিং করলেন। টেলিভিশনের পর্দায় ওই সময় তৈরি হলো দেশপ্রেমের নাটক। সেই সময় টেলিভিশন মূল অনুষ্ঠানের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছিল। বাংলাদেশের মানুষের কথা ছিল গানগুলোর মধ্যে। বাংলাদেশের কাজল মাটির গন্ধ ছিল। সেটা একটা লম্বা ইতিহাস। এরপর যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো তখন দেখলাম স্বাধীন বাংলা বেতারের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে দেশের গান প্রচারিত হতো। সেইসব গান শুনে মুক্তিযোদ্ধারা প্রেরণা পেতেন। তারা বনে জঙ্গলে, পাহাড়ে সমতলে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। জীবন বাজি রেখে মাতৃভূমিকে মুক্ত করেছেন।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতাকে গানে রূপ দিয়ে প্রচার করা হতো। ‘কারার ওই লৌহ কপাট’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো’... সহ অনেক কবিতা গানে রূপ দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্র-নজরুল ছিলেন-ছায়া হয়ে।
তখনকার যারা কর্মকর্তা ছিলেন তারা ঠিক করেছিলেন টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেন বলা যায় এই আমাদের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সৌন্দর্য বাংলাদেশের মাটির প্রতি আমাদের ভালোবাসা। দেশের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। দেশকে ভালো রাখার যে প্রতিশ্রুতি আমরা দিচ্ছি সেটাই বড় কথা। দেশ তোমাকে কী দিচ্ছে, সেটা বড় কথা নয়, তুমি দেশকে কী দিচ্ছো সেটাই বড় কথা। তুমি তোমার পাশের লোকটির কোনো উপকার করেছো কিনা সেটা ভাবতে পারো। তাহলে তুমি হবে দেশপ্রেমিক। অনেকেই পথশিশুদের জন্য কাজ করেন। সেদিন একটা খবর দেখলাম-ভালো কাজের হোটেল নামে ঢাকার কয়েকটি স্থানে অসহায় দরিদ্রদের খাবার দেয়া হয়। প্রতিদিন দুপুরে কয়েকটি স্থানে এরা খাবার বিতরণ করে। খবরটি দেখে আমার বুক গর্বে ভরে উঠলো।
আমাদের বেশি কষ্ট করতে হবে না, প্রত্যেকের ছোট ছোট প্রচেষ্টাই আমাদের দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেদিন অনেক বেশি দূরে নয়। এই ছোট প্রচেষ্টা বলতে শুধু খাবার দেয়া- তাই নয়। পাড়ার ফুটবল ক্লাবে ফুটবল দিয়ে তাদের উৎসাহিত করতে পারি। দিকনির্দেশনা ঠিক করার জন্য একটা কেরামবোর্ড দিতে পারি। এমনকি বিদেশ থেকে আনা প্রিয় গল্পের বইটাও উপহার দিতে পারি। কেউ যদি হিসাব করতে বসে তাহলে দেখবে এখন আর পৃথিবীতে খারাপ কাজ করার চেয়ে ভালো কাজ করা সহজ এবং ভালো কাজ করা অনেক বেশি সম্ভব। সুতরাং পাশের লোকদের দিকে তাকালেই আপনার মনে হতে পারে কী ভালো কাজটি আপনি করলেন।
কবি তো অনেক আগেই লিখে গেছেন-
‘সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
সেই প্রতিপাদ্য নিয়েই বাংলাদেশ টেলিভিশন মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশের গান প্রচার করে যেমন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল তেমনি করে এখনো তারা সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থেকে অনুষ্ঠান প্রচার করছে। সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান সহ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ নানা অনুষ্ঠান করে আসছে তারা।
