ঢাকার হকার সমস্যা সমাধানে পুরোদমে কাজ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ে স্বয়ং প্রশাসকরাই নামছেন উচ্ছেদ অভিযানে। গত ক’দিনে একাধিকবার এসব অভিযান চালিয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরমধ্যেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন হকাররা। শত শত দোকানপাট উচ্ছেদ আর জরিমানাও হচ্ছে। হকার উচ্ছেদের পর ফের বসার চেষ্টা করলেও সেটা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় এই কার্যক্রম চলতে থাকবে।
চলতি বছরের এপ্রিলের দিকে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করে সিটি করপোরেশন। এর কিছু দিন পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হকারদের পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। তবে গত ৩০শে সেপ্টেম্বর থেকে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রমকে ঘিরে মিরপুর এলাকায় তুলকালামের পর উচ্ছেদ অভিযান নতুন করে গতি পেয়েছে। সেদিন ফুটপাথের অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় উত্তর সিটির অন্তত তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া পুলিশের একটি গাড়ি ও উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত একটি ভেকু ভাঙচুর করা হয়। তবে সেদিন ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর দুপুর ২টা ২০ মিনিটে আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। এই ঘটনার পর হকার উচ্ছেদ কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় সিটি করপোরেশন।
এদিকে, গত বুধবার ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও ফুলবাড়িয়া সুপারমার্কেট সংলগ্ন ফুটপাত থেকে শতাধিক অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে ডিএসসিসি। এসময় পে-লোডারসহ বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অবৈধ অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়ার পর উচ্ছেদকৃত মালামাল ও সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়। এসময় ডিএসসিসি প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম উপস্থিত ছিলেন। গতকালও একইভাবে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত দুই দফায় পরিচালিত এক উচ্ছেদ অভিযান চালায় ডিএসসিসি। অভিযানকালে মূল রাস্তা ও ফুটপাথ দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয় এবং মালামাল জব্দ করা হয়। এর মাধ্যমে জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত সম্পূর্ণ সড়ক ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করা হয়।
উচ্ছেদ চালিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘অবৈধ ফুটপাথ দখলের পক্ষে যতই যুক্তি বা অজুহাত দেখানো হোক না কেন, কোনো অবস্থাতেই রাস্তা ও ফুটপাথে হকার বসতে দেয়া হবে না। যতবারই অবৈধভাবে রাস্তা ও ফুটপাথ দখল করা হবে, ততবারই আমরা নগরবাসীর স্বার্থে অভিযান চালাব। একাধিকবার আলোচনা, অনুরোধ ও সতর্ক করার মতো সব ধরনের পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। এখন থেকে অবৈধভাবে বসলে মালামাল জব্দ এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেপ্তার করা হবে।’
ওদিকে, গত বুধবার শুধু মিরপুর এলাকায় একাধিক অভিযান চালায় ডিএনসিসি। এ সময় ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। মিরপুর-১ নম্বরে সড়ক ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান ডিএনসিসি। বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলা এ অভিযানে প্রায় দুই হাজার দোকান সরানো হয়েছে। তবে অভিযান শেষ হওয়ার আধাঘণ্টার মধ্যেই কয়েকটি দোকান আবারো ফুটপাথে বসে যায়। এদিন দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রথম দফা অভিযান চালানোর এক ঘণ্টার মধ্যেই আবার ফুটপাথে দোকান বসে গেলে সন্ধ্যা ৬টার দিকে দ্বিতীয় দফায় অভিযান শুরু করেন প্রশাসক। এ সময় প্রশাসকের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন ।
এ সময় ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, আমরা মিরপুর-১ নম্বরকে মিরপুর-১০ নম্বরের মতো বানাতে চাই। সেজন্য যদি আরও দুই-চারদিন কষ্ট করতে হয়, আমি সেই কাজ করার জন্য প্রস্তুত আছি। ফের হকার বসার সংবাদ পাওয়ার পর আমরা আবার এখানে এসেছি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি। কারণ, বারবার তারা একই কাজ করবেন- কোনো বিশেষ শক্তির কারণে, নাকি কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়- সেটি আমাদের এখন খুঁজে বের করতে হবে।
তবে রাজধানীর বড় দু’টি সমস্যার মধ্যে হকার সমস্যাকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে দেখছেন দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা। তারা জানান, হকারদের হটস্পট বা অগ্রাধিকার বিবেচনায় এই অভিযান চলবে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, সাধারণ মানুষ চায় হকার সমস্যার সমাধান হোক। এটা মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। অবৈধভাবে ফুটপাথ দখল করে ব্যবসায় করবে এটাতো মানুষ গ্রহণ করবে না। এখন দেখা যাচ্ছে- সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো যানজট নেই, দৃষ্টিনন্দন। প্রশাসক হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব। এই অভিযান আরও চলবে। একই কথা জানান- দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালামও। তিনি মানবজমিনকে বলেন, হকার উচ্ছেদ ছাড়া বিকল্প নেই। ঢাকা শহর স্থবির হওয়ার পেছনে হকার সমস্যা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সমস্যা দায়ী। তাই এসব সমস্যা সমাধান হওয়া জরুরি। আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম নিউমার্কেট এলাকায় পরিচালিত হবে।
