সিঙ্গাপুরে অন্তত ২৪০ জন অভিবাসী শ্রমিক বিগত দুই থেকে তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। এ ঘটনায় দেশটির দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম)। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস এবং জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। গত ২৪ অক্টোবর এক বিবৃতিতে এ তদন্তের কথা জানিয়েছে এমওএম।
এদিকে বেতন না পাওয়ায় ভুক্তভোগী শ্রমিকেরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। দেশে থাকা পরিবারের ভরণপোষণ, ঋণ পরিশোধ এবং সিঙ্গাপুরে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তারা।
সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইটস টাইমস এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোসাইন মিদুল নামে বাংলাদেশি শ্রমিক ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সিঙ্গাপুরে যান। প্রতি মাসে ওভারটাইমসহ প্রায় ৬০০ ডলার বেতন পেতেন ২৪ বছর বয়সী মিদুর। আয়ের প্রায় পুরোটাই তিনি দেশে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু গত দুই মাস বেতন না পাওয়ায় পরিবারের কাছে কোনো অর্থ পাঠাতে পারেননি।
মিদুলের অভিযোগ, গত অক্টোবরের শুরুতে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে দেয় নিয়োগকর্তা। যদিও তার কাজের পারমিটের মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত।
মিদুল জানান, সিঙ্গাপুরে যাওয়ার জন্য এজেন্টের ফি দিতে ৯ হাজার ডলারের ব্যাংকঋণ নিয়েছিলেন। বেতনের প্রায় অর্ধেক দিয়ে সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন। বাকি অর্থ দিয়ে পাবনা জেলার পশ্চিমাঞ্চলে থাকা ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চালাতেন।
এনিয়ে মিদুল বলেন, ‘আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। তাদের সহায়তা করার জন্যই বাড়ি ছেড়ে এখানে এসেছি। কিন্তু এখন কাজ নেই, বেতনও নেই। ভয় হচ্ছে, আমার পরিবারকে অনেক কষ্ট করতে হবে।’
তিনি জানান, প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনসের কাছে তার ১ হাজার ৮০০ ডলার বেতন বকেয়া রয়েছে।
ওই দুই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, গত আগস্ট থেকে তারা বেতন পাচ্ছেন না। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে দফায় দফায় তাদের ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করা হচ্ছে। এতে সিঙ্গাপুরে কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং দেশে পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের ২১ বছর বয়সী শ্রমিক সাইমন ইসলাম বলেন, তার প্রায় ১ হাজার ৮০০ ডলার পাওনা রয়েছে। তবে পুরো অর্থ পাবেন, এমন আশা আর করছেন না তিনি।
চাকরি পেতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকজন শ্রমিক বাংলাদেশে থাকাকালে সিঙ্গাপুরে প্রসেস খাতে চাকরি পাওয়ার জন্য নিয়োগ এজেন্টদের ১২ হাজার ডলারেরও বেশি দিয়েছেন। দেশটিতে প্রসেস খাতের কাজের মধ্যে শিল্পকারখানায় বিশেষায়িত কাজ, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।
এসব শ্রমিককে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, এক বছর কাজ করার পর নিয়োগকর্তা তাদের সিঙ্গাপুরের বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অথরিটির (বিসিএ) সনদ অর্জনের কোর্সে পাঠাবেন। কিন্তু স্ট্রেইটস টাইমসের সঙ্গে কথা বলা প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনসের ১৫ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র একজনকে ওই কোর্সে পাঠানো হয়েছিল।
রিয়াগ নামের ২৬ বছর বয়সী এক শ্রমিক জানান, প্রসেস খাতে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করা অনেকে নির্মাণ খাতে কাজের যোগ্যতা অর্জনের জন্য বিসিএ সনদ নিতে চান। কারণ নির্মাণ খাতে আয় তুলনামূলক বেশি।
ট্রান্সিয়েন্ট ওয়ার্কার্স কাউন্ট টু (টিডব্লিউসিটু) নামের একটি সংগঠনের গত আগস্টে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ওভারটাইম বাদে ভাতাসহ নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের গড় মাসিক আয় ৮৬৮ ডলার। অন্যদিকে প্রসেস খাতে এ আয় ৭৭১ ডলার।
কিছু শ্রমিক বকেয়া বেতন পেয়েছেন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরে কিছু শ্রমিক তাদের বকেয়া বেতন পেয়েছেন। ২৩ অক্টোবর প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনসের প্রায় ৭০ জন শ্রমিক সুন লি রোডে অভিবাসী শ্রমিক কেন্দ্রের (এমডব্লিউসি) বিনোদনকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রুজাইদি মাসুনিক এবং জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকে যেসব শ্রমিকের বেতন বকেয়া ছিল, তাদের কাজের দিন ও ওভারটাইমের হিসাবসংবলিত নথি দেন রুজাইদি।
এক শ্রমিক জানান, কর্তৃপক্ষ তাদের বলেছে, প্রসেস খাতের নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ খুঁজতে অনুমতিপত্র দেয়া হবে। তবে বাংলাদেশে এজেন্টকে দেয়া অর্থের কারণে বিসিএ সনদসংক্রান্ত সমস্যায় দেশটির মন্ত্রণালয় সরাসরি সহায়তা করতে পারবে না বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে এমডব্লিউসি জানিয়েছে, শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত নতুন চাকরি এবং কর্মস্থল পরিবর্তনের সহায়তা দিতে তারা নিয়োগ সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রায় ৯০ জন শ্রমিককে খাবারও দেয়া হচ্ছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন
স্ট্রেইটস টাইমসের অনুসন্ধানে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসূত্রের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শ্রমিকেরা তুয়াস এলাকার একই ডরমিটরিতে থাকেন। একই বাংলাদেশি ব্যবস্থাপক তাদের নিয়োগ ও একই কর্মস্থলে পাঠাতেন বলেও জানিয়েছেন শ্রমিকেরা।
করপোরেট নথি অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট ফক চি মেংয়ের কাছ থেকে প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনসের পরিচালকের দায়িত্ব নেন রুজাইদি। একই দিন আগে গ্রেট ওশান টেক নামে পরিচিত জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের পরিচালনাতেও পরিবর্তন আসে। রেন জির কাছ থেকে দায়িত্ব নেন উষা রানি বালাকৃষ্ণান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেন জি গত জুলাইয়ে জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ জনের একজন। ওই ব্যক্তিদের একটি অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে মন্ত্রণালয়।
গত ২৩ জুলাই সিঙ্গাপুর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়োগকর্তাদের অধীনে কাজ করেন না—এমন ১৩৯ জন স্থানীয় নাগরিকের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ডে (সিপিএফ) অবদান জমা দেয়ার অভিযোগে তাদের তদন্ত করা হচ্ছে।
বেশি বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ পেতে কিছু প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে স্থানীয় কর্মী দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিঙ্গাপুরে কোনো প্রতিষ্ঠান কতজন বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে পারবে, তা খাতভিত্তিক কোটা দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। প্রসেস খাতে স্থানীয় যোগ্যতাসম্পন্ন বেতন—মাসে অন্তত ১ হাজার ৮০০ ডলার—পান এমন একজন বাসিন্দার বিপরীতে পাঁচজন ওয়ার্ক পারমিটধারী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। কর্মসংস্থান আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনসের কার্যালয়ে স্ট্রেইটস টাইমসের সঙ্গে কথা বলা এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তনের সময় কিছু অসংগতির কারণে বেতন দিতে দেরি হয়েছে।
তার দাবি, বেতনসংক্রান্ত অভিযোগ ও বিসিএ সনদের বিষয়গুলো মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসূত্র থাকার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
