বাজারে এলপিজি সংকট এবং ঊর্ধ্বমুখী আচরণের মধ্যেই পণ্যটির নতুন দাম নির্ধারণে গণশুনানির আহ্বান করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করেছে বিইআরসি।
এদিকে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি নিয়মিত দাম বেঁধে দিলেও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য এলপি গ্যাসের দাম বছরখানেক ধরে কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মধ্য প্রাচ্যের যুদ্ধ। এ অবস্থায় বাড়তি দামের জন্য কমিশন, পরিবহন ব্যয় ইত্যাদি নানা যুক্তি দেখাচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এমন প্রেক্ষাপটে মুনাফার কমিশন বাড়াতে বেসরকারি এলপিজি ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব নিয়ে এই গণশুনারি হচ্ছে।
সূত্র মতে, ইতোমধ্যে বিইআরসির কাছে আমদানিকারকেরা ২ থেকে আড়াই গুণ এবং পরিবেশকেরা ৩ গুণ কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। এসব প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির আয়োজন করেছে বিইআরসি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের নভেম্বরে এলপিজির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। চাহিদার তুলনায় আমদানি কম— এমন অজুহাত দেখিয়ে প্রতিটি সিলিন্ডারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি আদায় শুরু করেন বিক্রেতারা। এতে দেশের বহু এলাকায় এলপি গ্যাস না পেয়ে ভোগান্তি শুরু হয়। এরপর ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে শুল্ক হ্রাস, আমদানির সীমা বৃদ্ধি, এলসি খোলা সহজতর করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু সবশেষ ৩ মাস ধরে আবারও এলপি গ্যাসের দামে অরাজকতা চলছে। মাঝে এক মাসে দুইবার দাম বৃদ্ধিও করিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তাতেও নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি পাচ্ছে না ভোক্তারা।
পর্যাপ্ত আমদানি হওয়া সত্ত্বেও গত সেপ্টেম্বর থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার অন্তত ১ হাজার টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি শুরু হয়। এর মধ্যে অক্টোবরে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যটির নির্ধারিত দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। কিন্তু তাতেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। আগের মতোই ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
বিইআরসির কাছে জমা পড়া আবেদনে দেখা যায়, ১২ কেজি সিলিন্ডারের কমিশন ১৯১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। অন্যদিকে পরিবেশকেরা ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন জমা দিয়েছেন।
এলপিজি আমদানির ব্যবসায় ৫০টির বেশি নিবন্ধিত কোম্পানি থাকলেও এর মধ্যে ৬/৭টি কোম্পানি এখন নিয়মিত আমদানি করে থাকে। আর আমদানিকারকদের থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে নিজস্ব প্ল্যান্টে বোতলজাত করার কাজে যুক্ত আছে ১২টি প্রতিষ্ঠান।
এই অবস্থায় দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টি করতে ১৫ ও ১৬ই অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। তবে সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি ও গণশুনানির তারিখ ঘোষণার পরপরই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
দেশে প্রতিমাসে এলপিজির চাহিদা রয়েছে দেড় লাখ টন। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার ও ১ লাখ ৫৭ হাজার টন করে এলপিজি আমদানি হয়েছে। অক্টোবর মাসেও সমপরিমাণ আমদানি হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ, আমদানি হচ্ছে চাহিদার চেয়েও কিছুটা বেশি। তারপরেও দাম বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন অজুহাত দাঁড়া করায় এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী চক্র।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো মাসে মাসে এলপিজির দর ঘোষণার নিয়ম চালু হয়। তখন ১২ কেজির সিলিন্ডারে কমিশন ধরা হয়েছিল ১৪৩ টাকা। তবে আমদানিকারক বা অপারেটরদের দাবির মুখে তা বাড়িয়ে ১৮৬ টাকা এবং পরে ১৯১ টাকা করা হয়।
