বাংলাদেশ-নেপালের পর ইউরোপজুড়ে জেন-জি ঝড়, নেপথ্যে কী?

রয়টার্সের রিপোর্ট

বাংলাদেশ-নেপালের পর ইউরোপজুড়ে জেন-জি ঝড়, নেপথ্যে কী?

ফন্ট সাইজ:

ব্রাসেলসে নিজের ডেস্কে বসে দেশের শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান লিখছিলেন ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মায়া গুরদেল। তার লেখা স্লোগান, ‘আমরা পুড়লে, তোমরাও আমাদের সঙ্গে পুড়বে!’ ২০১২ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’ থেকে নেয়া এই স্লোগান বিশ্বজুড়ে তরুণদের বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ইউরোপজুড়ে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের পেছনেও রয়েছে ক্ষোভ, হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

প্যারিসের উপকণ্ঠ থেকে বেলগ্রেডের রাজপথ—ইউরোপের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে নেমেছেন।

তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি, আবাসন সংকট এবং নিজেদের কথা কেউ শুনছে না—এমন হতাশা। এসব দাবির অনেকগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্ষোভ সহিংস রূপও নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শুধু ফ্রান্সেই হাজার হাজার দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করেছে।

তবে চলতি সপ্তাহান্তে এসব বিক্ষোভ বাস্তব পরিবর্তনও এনে দিয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগে আন্দোলনের পর সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা আলেকসান্দার ভুচিচ নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভের পরিণতিতে এসেছে এই পরিবর্তন।

বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী স্তাশা পিলেতিচ বলেন, ‘ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আমাদের মনে হয়েছে স্বস্তি ও স্বাধীনতার অনুভূতি। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিজয়ের অনুভূতি পাচ্ছি। অবশেষে আমরা বিক্ষোভ থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছেছি।’

‘ক্ষোভের বিস্ফোরণ’

বিক্ষোভে উত্তাল ইতালির মিলানের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কিয়ারা মনে করেন, ‘ক্ষোভের বিস্ফোরণ থেকে জন্ম নেয়া মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে অংশ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। এই ক্ষোভই সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।’

তিনি বলেন, ‘শাসকশ্রেণি আমার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি করেছে, তা হলো ভবিষ্যৎ কল্পনা করার, স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেয়া।’
কিয়ারার ভাষ্য, ইতালির শিক্ষার্থীরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং ভবনগুলো জরাজীর্ণ।

তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যার পাশাপাশি সামনে রয়েছে এমন চাকরির সম্ভাবনা, যেখানে বেতন কম এবং যে কাজের জন্য আমরা যোগ্যতা অর্জন করিনি। আর থাকতে হবে ছোট, অতিরিক্ত ব্যয়বহুল কোনো বাসায়—সম্ভবত নিজের শহর থেকে দূরে, যে শহরে আমরা থাকতে চাই না।’
বিশ্বজুড়েই জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেয়া এই প্রজন্ম নিজেদের দাবি তুলে ধরতে শুরু করেছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ, ২০২৫ সালে নেপাল এবং চলতি বছর ভারতেও তরুণদের আন্দোলন দেখা গেছে। এবার ইউরোপ হয়ে উঠেছে এই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র।

২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক জরিপ অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪০ শতাংশ তরুণের প্রধান উদ্বেগের বিষয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়।
২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৯ কোটি ২৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য বা সামাজিক বঞ্চনার ঝুঁকিতে ছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা। এই বয়সী মানুষের ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ এমন ঝুঁকিতে ছিলেন। অন্যদিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

বয়স্ক প্রজন্মের আর্থিক দায়ভার বহন করা নিয়েও তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, বয়স্করা সাধারণত নির্বাচনে বেশি ভোট দেন। ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওএফসিইর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। অথচ দেশটির মোট সম্পদের ৬০ শতাংশের মালিক তারা।

ফ্রান্সে সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত পেনশন। জনসংখ্যার বার্ধক্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই খাতে ব্যয় বেড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৪ শতাংশে পৌঁছানোর পথে রয়েছে। কিন্তু অবসরের বয়স বাড়ানো কিংবা পেনশন সুবিধা কমানোর বিরোধিতা করছেন ভোটাররা।
তবে পেনশন খাতে জিডিপির অনুপাতে ব্যয়ের দিক থেকে ফ্রান্সের চেয়েও এগিয়ে রয়েছে গ্রিস ও ইতালি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশ দুটি জাতীয় আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ সরকারি পেনশনে ব্যয় করে। বিপরীতে অস্ট্রেলিয়া, চিলি, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশেরও কম।
প্যারিসের উত্তরের একটি উপশহরের ১৭ বছর বয়সী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী বিলাল নারজিসিও নিজের স্কুলের ‘শোচনীয়’ পরিবেশ ও কর্মীসংকটের প্রতিবাদ করছেন।
তিনি বলেন, ‘আগে স্কুলে ইঁদুর ছিল।’ গত বছর স্কুলের আঙিনায় ছাদ ধসে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। তবে এতে কেউ আহত হয়নি বলে জানান তিনি।

বিলালের মতে, এই বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে, ‘ইউরোপের তরুণরা ঐক্যবদ্ধ।’ তিনি বলেন, ‘একটি বিষয়ে আমরা সবাই একমত—তরুণদের সঙ্গে অতিরিক্ত শিশুসুলভ আচরণ করা হয় এবং তাদের কথা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয় না।’

অক্টোবরে প্রকাশিত ফরাসি সরকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পেনশন খাতে ব্যয় জিডিপির অনুপাতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। বিপরীতে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ৩২ শতাংশ ব্যয় হয় পেনশন খাতে। ফলে শিক্ষার অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
বেলজিয়ামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন গুরদেলও।
তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে চেষ্টা করেছিলাম। কেউ আমাদের কথা শোনেনি। মানুষ যখন আবর্জনায় আগুন দিতে শুরু করল কিংবা এ ধরনের কাজ করল, তখনই কেবল সংবাদমাধ্যম ও ক্যামেরাগুলো আমাদের দিকে নজর দিল।’

ইউরোপে বিক্ষোভের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য, যুদ্ধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে এই সপ্তাহান্তে জার্মানিতেও বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
আলবেনিয়াতেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে ক্ষোভ থেকে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। রাজধানী তিরানা ছাড়িয়ে অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন।

‘ইউরোপের তরুণরা ঐক্যবদ্ধ’

১৯ বছর বয়সী স্থাপত্যের শিক্ষার্থী জাইক কুর্তি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী ১৩০ দিন ধরে আমাদের কথা শোনেননি।’
তিনি বলেন, ‘আলবেনিয়ার কোনো শিক্ষার্থীকে যদি জিজ্ঞেস করেন, সে নিজের ভবিষ্যৎ কোথায় দেখে, সবাই বলবে—দেশের বাইরে। কারণ, নিজের দেশে প্রতিভা থাকলেও যাদের প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ রয়েছে, তারাই সব সময় এগিয়ে যাবে।’

সার্বিয়ার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এমন একটি সাফল্য অর্জন করেছে, যা ইউরোপের অন্য রাজধানীগুলোর বিক্ষোভকারীরা কেবল স্বপ্নই দেখতে পারেন।
তবে এখন সামনে এসেছে আরও কঠিন কাজ—দেশ পরিচালনা। শিক্ষার্থী কিংবা তাদের মনোনীত প্রার্থীদের কারওই সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই।

কিন্তু এই বাস্তবতাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে রাজি নন আরেক বিক্ষোভকারী লুকা স্তোয়াকোভিচ। তার বক্তব্য, ‘রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ আমাদের কোথায় নিয়ে গেছেন, তা তো আমরা দেখেছি।’