পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে উত্তরপ্রদেশের কায়দায় পুলিশি এনকাউন্টার তত্ত্ব কার্যকর করা শুরু হয়েছে। চার মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার একই দিনে দু’টি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের শামসেরগঞ্জে। দুই ক্ষেত্রেই পুলিশের একই তত্ত্ব। অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্র্নিমাণ করতে গিয়েছিল পুলিশ। সে সময়ে অভিযুক্ত যুবক পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালিয়েছিল। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালিয়েছে পুলিশ। তাতে নিহত হয়েছেন অভিযুক্ত।
বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে সোচ্চার মানবিকতার সংগঠনগুলো। এনকাউন্টার নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের এনকাইন্টার
তত্ত্বে সিলমোহর দিয়েছে রাজ্যটির মন্ত্রী থেকে বিজেপি নেতারা। যদিও এ ধরনের অপরাধ দমনে ‘সকালে জমা বিকেলে খরচ’ নীতির কথা আগেই ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকারের মতো পশ্চিমবঙ্গেও একই কায়দা অনুসরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সামশেরগঞ্জে বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সামাউন শেখ। মঙ্গলবার তাকে নিয়ে ঘটনার পুনর্র্নিমাণে বের হয়েছিল পুলিশ। সামশেরগঞ্জ থানার পুরাতন ডাকবাংলা এলাকায় ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সামাউনকে।
পুলিশের দাবি, পুনর্র্নিমাণের সময় এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছেন অভিযুক্ত। তিন রাউন্ড গুলিও চালিয়েছেন বলে অভিযোগ। পুলিশের পাল্টা হয়ে গুলিতে জখম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মৃত্যু হয়েছে সামাউনের।
মঙ্গলবার ভোররাতে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু হয়েছে ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্র্নিমানের সময় এক পুলিশ কর্তার আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল অভিযুক্ত। গুলিও চালিয়েছিল অভিযুক্ত। পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে আহত হয় সে। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
গত রোববার গাইঘাটায় প্রতিবেশীর বাড়ির পেছন দিক থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল এক কিশোরীর ক্ষতবিক্ষত দেহ। পরিবারের দাবি, তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। ঘটনায় রোববারই ওই পরিবারের আত্মীয় প্রহ্লাদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এনকাউন্টারে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
এর আগে গত জুলাইয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নাবালিকাকে গণধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলেরও মৃত্যু হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। সে সময়েও পুলিশ দাবি করেছিল, গভীর রাতে অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্র্নিমাণের জন্য ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযুক্ত পুলিশের হাত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল অভিযুক্তের।
সেই সময়ই পুলিশের এই এনকাউন্টার তত্ত্ব নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। মঙ্গলবারে এনকাউন্টার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। এক বিবৃতিতে সংগঠনের সহসভাপতি রঞ্জিত শূরের বক্তব্য, ‘রাত ১২টার সময় বন্দিকে নিয়ে ঘটনার পুনর্র্নিমাণে যাওয়া গভীর সন্দেহজনক। তা-ও বন্দির হাত খোলা রেখে!’ পুলিশের রিভলবার কী ভাবে ছিনিয়ে নিলেন অভিযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তবে মঙ্গলবারের দু’টি এনকাউন্টারে অভিযুক্তের মৃত্যু নিয়ে সমর্থন জানাতে শুরু করেছেন বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীরা। বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ রাখঢাক না করে জানিয়ে বলেছেন তিনি ‘এনকাউন্টারে’র পক্ষে। আরজি করকাণ্ডে তার মেয়ের ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে তিনি খুশি হতেন। রত্নার দাবি, এর ফলে অপরাধীদের মনে ভয় আসবে। এমন ঘটনার সংখ্যা কমবে।
রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের মতে, কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তাকে এমন পরিণতির জন্যই তৈরি থাকতে হবে। দিলীপ ঘোষ বলেছেন, ‘বিচারের সামনে সবাইকে আনতে হবে। আইনের উপরে কেউ নেই। কিন্তু কেউ যদি আইনকে অমান্য করে, তার সঙ্গে এ রকমই হবে।’ পঞ্চায়েত মন্ত্রীর বক্তব্য, মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়া পুলিশের কাজ। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ তাদের (পুলিশের) ওপর ভরসা রাখতে ভুলে গিয়েছে। ভরসা ফিরিয়ে আনতে হলে পুলিশকে কিছু অপ্রিয় কাজ করতে হবে।’
পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে দু’টি এনকাউন্টার নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা
ভারত
২ ঘন্টা আগে
২৮ অক্টোবর (বুধবার), ২০২৬, ১০ঃ০৬ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
