বণিক বার্তা
দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘নতুন পে-স্কেলে বেতন দিতে ব্যাংক ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে সরকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকার ঋণ।
নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো অনুযায়ী ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেবে সরকার। ওইদিন অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের জন্য নতুন বেতনের বকেয়াও পরিশোধ করা হবে। বাড়তি এ ব্যয় সংস্থানে সরকার চলতি মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আজ ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে। এ নিলামের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়া হবে।
দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেয়ার জন্য সরকার সাধারণত ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করে। রাজস্ব আয় ও দৈনন্দিন বা মাসিক ব্যয়ে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হলে অল্প সময়ের জন্য ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ছাড়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিশেষ বিল ইস্যুর প্রয়োজন হয়নি। হঠাৎ বিশেষ বিল ইস্যুর কারণ জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোববার তথা ১ নভেম্বর সরকার নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করবে। এজন্য বাড়তি টাকার প্রয়োজন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়েছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গতকাল পর্যন্ত চলতি অক্টোবরে সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আজ আরো ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিলে এ মাসে নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। দায়িত্ব নেয়ার পর এক মাসে সরকারকে এত পরিমাণ ঋণ নিতে দেখা যায়নি। এর আগে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ তুলেছিল সরকার। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে নেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫০ ও সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা।
তবে ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলামের মাধ্যমে নেয়া এ ঋণের হিসাব নিট নয়। নতুন নেয়া ঋণের বড় অংশ মেয়াদ পূর্ণ হওয়া আগের বিল-বন্ড পরিশোধ বা রি-ইস্যুতে ব্যয় হয়। এ কারণে ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলামে উত্তোলিত ঋণের তুলনায় নিট ঋণের স্থিতি অনেক কম হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকার ঋণ। বাকি ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অক্টোবরে নেয়া নতুন ঋণের হিসাব জানা গেলেও কত টাকার ঋণ এ মাসে পরিশোধ করা হয়েছে, সেটি সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা গতকাল জানাতে পারেননি।
এদিকে সরকারের ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চলতি অক্টোবরে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহারও বেড়েছে। মাসের শুরুতে ৫ অক্টোবরের নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২৬ অক্টোবরের নিলামে একই বিলের ইল্ড ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে উঠে যায়। একইভাবে বাকি সব মেয়াদের বিল ও বন্ডের ইল্ড রেটও বেড়েছে। বিল-বন্ডের ইল্ড এমন সময়ে বাড়ছে, যখন দেশের ব্যাংকগুলোয় ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হয়েছে। আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এ তারল্যের একটি অংশ অলস পড়ে আছে।
সরকারের ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ নিলাম আয়োজনের পাশাপাশি বাড়তি বিল-বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া। আমরা কেবল সে দায়িত্ব পালন করছি। প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার রাজস্ব আয় করতে পারছে না। তাই ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘প্রচলিত বিল-বন্ডের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ছাড়ার বড় উদ্যোগ নিচ্ছে। কেবল চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সুকুকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের জোগান হলে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমবে।’
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি ধরা হয়েছে। এ অর্থ দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়ে জোগান দেয়ার কথা। এর মধ্যে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল সরকার। যদিও সংশোধিত বাজেটে সে লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কারণে এবার সরকারকে আরো বেশি ব্যাংক ঋণনির্ভর হতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
ঘোষিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যদিও অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই ও আগস্ট) ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ঘাটতি দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি এনবিআর। এ কারণে দৈনন্দিন ব্যয়ের জন্য সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি অক্টোবরে (২৭ অক্টোবর পর্যন্ত) ৯১ দিন মেয়াদি বিলের চারটি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এসব নিলামের ফেস ভ্যালু বা অভিহিত মূল্য ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। সমসংখ্যক নিলামের মাধ্যমে ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ১২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের নিলাম হয়েছে আরো ৮ হাজার কোটি টাকার। সব মিলিয়ে অক্টোবরে কেবল বিলের মাধ্যমে ৪০ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
আর ২ থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে অক্টোবরে সরকার ঋণ নিয়েছে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গতকালও বাজার থেকে ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেয় সরকার। এ দুটি বন্ডের ইল্ড ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের প্রয়োজনে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যুকে ‘দেশের অর্থনীতি ও সরকারের সক্ষমতার জন্য ভালো খবর নয়’ বলে মনে করেন সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সাধারণত বাজারে তারল্য উদ্বৃত্ত হয়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি বিল ইস্যু করে। এখন দেখছি, সরকার তার কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্যও বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যু করছে। সরকার তার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারছে না। বিপরীতে নতুন পে-স্কেলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। আবার বড় বড় মেগা প্রকল্পও নেয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের ঋণের বোঝা দ্রুত বড় হবে। বিপরীতে বেসরকারি খাত আরো বেশি সংকুচিত ও দুর্বল হবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩৪ শতাংশেরও বেশি। যদিও একই সময়ে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। বেসরকারি খাতে বিরাজমান ঋণ খরা আরো তীব্র হচ্ছে। বিপরীতে ক্রমাগত বাড়ছে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
সরকার এরই মধ্যে দেশী-বিদেশী উভয় উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঋণ শোধের চক্রে পড়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারছেন না। এ কারণে বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি মাত্রায় ঋণ নিতে হচ্ছে। যেসব ট্রেজারি বিল-বন্ডের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সরকার সেগুলো “রোলওভার” করতে বাধ্য হবে। কারণ এসব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এ মুহূর্তে সরকারের নেই।’
বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। এছাড়া পেনশনভোগী রয়েছেন ৯ লাখ ২৫ হাজার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। এর মধ্যে শুধু বেতনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে আগামী রোববার থেকে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন পরিশোধ করবে সরকার। নতুন কাঠামোয় সবচেয়ে নিচের গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেতন ও ভাতার পুরো কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। নবম বেতনকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়বে।
অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার বিদেশী বিনিয়োগ ও স্বল্প সুদের অর্থায়ন নিশ্চিতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের এ সংসদ সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের পরিস্থিতি প্রকট ছিল। সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয়ও অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো সরকারের পক্ষেই রাতারাতি ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। আমাদের সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে।’
মুশফিকুর রহমান আরো বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে নির্ধারিত আয়ের চাকরিজীবীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ কারণে সরকার কর্মচারীদের উৎসাহ দেয়া ও দক্ষতা বাড়াতে নতুন পে-স্কেল দিয়েছে। এর কোনো বিকল্প আমাদের হাতে ছিল না। তবে এটাও ঠিক, ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে আমাদেরকে অবশ্যই আয় বাড়াতে হবে।’
প্রথম আলো
‘রাশিয়ায় যুদ্ধে জোর করে নেওয়া হয় বাংলাদেশিদের’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কমিশন বলেছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় দালালদের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ কর্তৃপক্ষ এই মানব পাচার করেছে। নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপিও পেয়েছে কমিশন, যাতে রাশিয়ার একটি বেসামরিক কোম্পানির আমন্ত্রণের উল্লেখ রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) দপ্তরের ওয়েবসাইটে ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত একটি খসড়া প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার বাহিনীতে নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে।
তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, আজারবাইজান, বেলারুশ, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, তাজিকিস্তান, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জিম্বাবুয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশের নিয়োগ-এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব মানুষকে তাদের সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ করেছে। ভুক্তভোগীরা সবাই পুরুষ। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাঁরা বেশির ভাগই আর্থিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। তাঁদের অনেকের শিক্ষার স্তরও কম। এসব ব্যক্তির অনেককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের কেউ নিহত, আহত, বন্দী কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। তবে ভিসার সংখ্যা, বাংলাদেশি নিয়োগপ্রাপ্তদের সংখ্যা, তাঁদের নাম বা তাঁদের পরিণতি সম্পর্কে আলাদা তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
প্রতিবেদনে ৩০ জনের একটি দলের কথা বলা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া একটি নিশ্চয়তাপত্রে বলা হয়েছিল, তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে না। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ওই দলের ১৭ জন সামনের সারিতে নিহত, ৫ জন নিখোঁজ এবং ১ জন আহত হয়ে ফিরেছেন। তবে প্রতিবেদনে ওই দলের কর্মীদের দেশের নাম বলা হয়নি।
এর আগে ২১ অক্টোবর ‘চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে, ৩ বছরে ৫৪ জনের মৃত্যু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। এতে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়। এ প্রতিবেদনেও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন বিষয়ে ওএইচসিএইচআরের ওয়েবসাইটে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রধান এরিক মোসে। তিনি বলেছেন, তদন্তে কমিশন দেখেছে রাশিয়া বিশ্বজুড়ে সক্রিয় এজেন্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে ভর্তি করতে এবং ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধে পাঠাতে ২৯টি দেশের নাগরিকদের পাচার করেছে। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দুর্বলতাগুলোর সুযোগ নিয়ে এবং মিথ্যা কর্মসংস্থানের কথা বলে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁদের রাশিয়ায় যেতে আকৃষ্ট করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন নিয়ে ঢাকায় রাশিয়ার দূতাবাসের বক্তব্য জানতে গতকাল মঙ্গলবার রাতে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। রাত সাড়ে ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে।
তবে রাশিয়ার জাতিসংঘ মিশনের বিবৃতির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম গত সোমবার জানিয়েছে, রাশিয়া এই তদন্ত কমিশনের এখতিয়ার স্বীকার করে না। মস্কোর দাবি, ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। নিয়োগপত্র এখন অনেক বেশি যাচাই-বাছাই করে দেখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
উচ্চ বেতনে বেসামরিক চাকরির প্রস্তাব
বিদেশে থাকা পুরুষেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে বা নিয়োগ-এজেন্ট ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় চাকরির প্রস্তাব পেতেন বলে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন বলছে, তাঁদের নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, মেরামতকর্মী, পরিবহনকর্মী ও টেকনিশিয়ানের কাজের কথা বলা হতো। কোনো কোনো প্রস্তাব ছিল তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, খেলাধুলা বা কৃষি খাতের কাজের। আবার কিছু নিয়োগকারী বলত, কাজটি সামরিক বাহিনীর অধীনে হলেও তা বেসামরিক।
প্রতিবেদনে একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের কথা আছে। তাঁকে বলা হয়েছিল, রাশিয়া বিদেশি খেলোয়াড় নিচ্ছে। রাশিয়ায় গিয়ে কাজটি পছন্দ হলে চুক্তিতে সই করা যাবে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
চাকরির প্রস্তাবে উচ্চ বেতন, রুশ নাগরিকত্ব, আরামদায়ক বাসস্থান, চাকরি ছাড়ার পর পেনশন এবং অন্যান্য সুবিধার কথা বলা হতো। কোনো কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাসস্থানের ছবি বা ক্যাটালগ দেখানো হয়েছিল।
কমিশনের মতে, নিয়োগকারীদের আশ্বাস, বিদেশে কাজের আগের অভিজ্ঞতা, একই কাজ পেয়েছেন বলে অন্যদের দেওয়া তথ্য এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদন-সংক্রান্ত নথির কারণে প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিও চাকরির কথা বলেছিলেন।
রাশিয়ায় নিয়ে সামরিক চুক্তিতে সই
চাকরির প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর অনেককে কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়ায় যেতে চাপ দেওয়া হতো। এজেন্টরা ভিসা, বিমানের টিকিট, আবাসন ও যাত্রার অন্যান্য ব্যবস্থা করতেন। কেউ আগে টাকা দিতেন, আবার কারও ক্ষেত্রে পরে বেতন থেকে টাকা কেটে রাখার কথা বলা হতো। দেশ ও অঞ্চলভেদে ভিসার ধরন আলাদা ছিল। কেউ ব্যবসায়িক ভিসা পেয়েছেন, কেউ স্বল্পমেয়াদি পর্যটন ভিসা; আবার কারও ভিসার প্রয়োজন হয়নি।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের পাওয়া সাক্ষ্য ও নথিতে যাত্রাপথের ট্রানজিট দেশ হিসেবে বাহরাইন, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, ফ্রান্স, কেনিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, ওমান, পানামা, স্পেন, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে এজেন্টরা নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে যাত্রা করতেন বা ট্রানজিট দেশে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতেন। কোনো কোনো নিয়োগপ্রাপ্তকে পাশের দেশে সড়কপথে গিয়ে সেখান থেকে বিমানে উঠতে বলা হতো, যাতে বিমানবন্দরে ধরা না পড়ে।
কমিশন বলেছে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগ-এজেন্টরা স্থানীয়, আঞ্চলিক বা রুশ নাগরিক ছিলেন। তাঁরা ভ্রমণ বা পর্যটন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় লাইসেন্স ছিল। কেউ কেউ নিজেদের বৈধ বা সরকারি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দিতেন। রুশ দূতাবাস থেকে দেওয়া ভিসাও অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টদের মাধ্যমে দেওয়া হতো।
রাশিয়ার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর নিয়োগপ্রাপ্ত অনেকের চলাচলের স্বাধীনতা থাকত না। তাঁদের অস্থায়ী আবাসনে রাখা হতো এবং পরে রুশ সশস্ত্র বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হতো। পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে তাঁদের রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বছরের সামরিক চাকরির চুক্তিতে সই করানো হতো। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা ছিল। অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্ত রুশ ভাষা জানতেন না। ফলে চুক্তির শর্ত বুঝতে পারেননি। ফোন হাতে না থাকায় অনুবাদের সুবিধাও তাঁরা নিতে পারেননি।
কমিশন বিভিন্ন দেশের নিয়োগপ্রাপ্তদের চুক্তির অনুলিপি পেয়েছে। চুক্তিগুলো একই ধরনের ছিল। সেগুলোর শিরোনামে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে সামরিক চাকরির জন্য নিয়োগের কথা ছিল। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিতেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাহিনীতে কাজ করছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। চুক্তিতে সই করতে অস্বীকার করলে নিয়োগপ্রাপ্তদের ওপর চাপ, হুমকি বা নির্যাতন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একজন নিয়োগপ্রাপ্ত জানান, তাঁর সামনে চারজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং তাঁকে বলা হয়, সই না করলে পরের ব্যক্তি তিনি হবেন। এরপর তিনি সই করেন।
কমিশন বলছে, বিদেশ থেকে নিয়োগের পাশাপাশি রাশিয়ায় আগে থেকেই থাকা বিদেশি নাগরিকদেরও প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কেউ পুলিশি হেফাজতে বা বিদেশি নাগরিকদের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে ছিলেন। কেউ কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন। কয়েকজনকে বলা হয়েছিল, সামরিক চুক্তিতে সই করলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা, দীর্ঘ সাজা, নির্জন কারাবাস বা নির্যাতন এড়ানো যাবে। সই না করলে নির্যাতনের হুমকি বা সাজা বাড়ানোর কথা বলা হতো।
একজন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি জানান, তিনি রাঁধুনি ছিলেন, সৈনিক হতে চাননি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামনের সারিতে পৌঁছে যান।
অল্প প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধক্ষেত্রে
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো ২০ মিনিট থেকে কয়েক দিন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ এক মাস পর্যন্ত চলত। এরপর তাঁদের ইউক্রেনের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতো। তাঁদের দিয়ে পরিখা খোঁড়া, এলাকা পাহারা, খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া এবং মরদেহ সংগ্রহের কাজ করানো হয়েছে। তাঁদের প্রধান কাজের মধ্যে ছিল আক্রমণ চালানো ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাঁরা খাবার ও পানি ছাড়া দিন কাটানো, মারধর, আটক রাখা ও মৃত্যুর হুমকির কথাও জানিয়েছেন।
নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব খুলতে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু বেতন নিয়ে তাঁদের ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ ছিল। অনেকে বেতন পাননি, কেউ অল্প পেয়েছেন। কারও ব্যাংক হিসাব থেকে অনুমতি ছাড়া টাকা তোলা হয়েছে; কারও বেতন আটকে রাখা হয়েছে বা হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ-এজেন্ট বা সামরিক কর্মীরা ব্যাংকের কার্ড নিয়ে নিতেন। যুদ্ধে যাওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্ত অনেকের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগসংক্রান্ত তদন্তে কমিশন ২৪৫টি সাক্ষ্য ব্যবহার করেছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের হাতে আটক বা দেশে ফিরতে পেরেছেন—এমন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি, তাঁদের পরিবারের সদস্য, আইনজীবী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, গবেষক ও সাংবাদিক। কমিশন আমন্ত্রণপত্র, যাত্রাপথ, বিমানের টিকিট, ভিসা, রাশিয়ায় প্রবেশের নথি, হোটেল বুকিং, সামরিক চুক্তি এবং রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথি সংগ্রহ করেছে। বিভিন্ন দেশকে এ বিষয়ে ৬৯টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল; কমিশন উত্তর পেয়েছে ৬টির। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া কমিশনের ৪১টি লিখিত অনুরোধের জবাব দেয়নি।
কমিশন বলেছে, রুশ কর্তৃপক্ষ নিয়োগ-এজেন্টদের সঙ্গে মিলে মানব পাচার করেছে এবং এতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। রুশ সামরিক চুক্তিতে সই করার পর পাচারের শিকার ব্যক্তিরা রুশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হয়েছেন। তাই তাঁদের ভাড়াটে যোদ্ধা বলা যাবে না। তাঁরা আত্মসমর্পণ করলে বা বন্দী হলে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবন্দীদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
তদন্ত কমিশন কিছু সুপারিশও করেছে। এতে রাশিয়াকে বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়োগ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। বাহিনীতে থাকা পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অব্যাহতি দিতে এবং তাঁদের সহায়তা দিতে বলেছে। নিয়োগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশও করেছে কমিশন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সমন্বয়ক সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ার শ্রমবাজার সম্ভাবনার হতে পারে, কিন্তু বাজারের চাহিদা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। জোর করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানার পরও দেশটিতে যেতে ছাড়পত্র দিয়ে যাচ্ছে সরকার; বরং যুদ্ধে নিয়োগ বন্ধে তৎপরতা দরকার ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এটি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের একজন কর্মীও যাতে প্রতারিত হয়ে বা জোরপূর্বক যুদ্ধে জড়াতে না পারে, সে দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণ আদায় ও দেশটিতে যুদ্ধ জড়িয়ে যাঁরা আটকা আছেন, তাঁদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘তারেক রহমান-সানায়ে তাকাইচি বৈঠক: সম্পর্কে নতুন সূর্যোদয়’। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের টোকিওতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দুদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন) বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হয়েছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ সহায়তার বিষয়ে একমত হয়েছে টোকিও।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এ বৈঠক দুদেশের সম্পর্কের নতুন সূর্যোদয় সূচনা করবে। এ অধ্যায় আরও গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তিনটি পৃথক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ডিজিটাল রূপান্তর (ডিএক্স), দক্ষ আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ডিজিটাল সংযোগে একযোগে কাজ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের তাগিদসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, রেমিট্যান্স ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’তে এ শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে তারেক রহমানকে রাজকীয় অভ্যর্থনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সেখানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী। আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিদর্শক বইয়ে সই করেন এবং তাকাইচির সঙ্গে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। প্রকাশিত ১৪ দফার এক যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বৈঠক শেষে তারা মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।
১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ ও টেক পার্কের প্রস্তাব: বৈঠকে তারেক রহমান বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকল্প তুলে ধরে বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ এ উন্নয়ন অভিযাত্রায় তিনি জাপান সরকার ও তাদের বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দ্রুত একটি জাপানি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতি বিনির্মাণে এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স ও ইলেকট্রনিক্স গবেষণার কেন্দ্র হিসাবে ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।
যোগাযোগব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তরে দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনায় জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের অংশ হিসাবে এলএনজি অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়।
নতুন রূপরেখায় ‘বিগ-বি’ ও মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন: বৈঠকে দুদেশের ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক উদ্যোগ ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’কে উন্নীত করে নতুন কৌশলগত রূপরেখা ‘শেয়ারিং প্রসপারিটি বিগ-বি’ গঠনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের একটি প্রধান কেন্দ্র (হাব) হিসাবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করার প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, ঢাকার মেট্রোরেলের (এমআরটি) লাইনগুলোর দ্রুত নির্মাণ এবং মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে উভয় দেশ একমত হয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলোর কার্যক্রম বাস্তবায়নে একটি পৃথক মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনেরও প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব ও আস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আজ এ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সময় এসেছে।’ এ সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুদফা জাপান সফর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান প্রধানমন্ত্রী।
কালের কণ্ঠ
‘সোয়া ৬ বিলিয়ন ডলারের আশ্বাস’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
গতকাল মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’তে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান দুই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচি। এই বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বাণিজ্য, জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি (আইসিটি), অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও বৈদেশিক বিনিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা জোরদার করতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্বের’ স্তরে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। জাপানের স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শুরু হয়। এর আগে সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান সানায়ে তাকাইচি। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই নেতা শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। এই বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এসব তথ্য জানান।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার ও দেশটির বেসরকারি খাতকে আরো সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান প্রথমদিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি এবং স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।
তিনি তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং তাঁর মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে অবদানের কথা স্মরণ করেন। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
জাপানি বিনিয়োগে দেশে দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরো গভীর ও বিস্তৃত হবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ: বৈঠকে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা আরো সুদৃঢ় হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও সহযোগিতা: বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহবান জানান তিনি।
প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণা: প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের কম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ মেধা, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অবকাঠামো, দ্রুতগতির রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে আধুনিক ও সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
সমকাল
‘বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন ঘিরে নতুন যাত্রা’—এটি দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিশ্ব বাস্তবতার মধ্যে নিজেদের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে বিশেষ অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে জাপান ও বাংলাদেশ। গতকাল মঙ্গলবার টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় এ কথা জানানো হয়।
এতে বলা হয়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ নামে এগিয়ে নেওয়া হবে। এর আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দুই দেশ সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
বিশেষ এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বাড়ানো হবে।
এ জন্য চারটি ক্ষেত্রে কাজ করা হবে বলে যৌথ ঘোষণায় জানানো হয়। সেগুলো হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ানো এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা।
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাপানের বেসরকারি খাত আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে যৌথ ঘোষণায়।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী এই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। এ বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এ শীর্ষ বৈঠক হলো। স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে বৈঠক শুরু হয়। বেলা ১১টা ৩২ মিনিটে তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সানায়ে তাকাইচি। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যৌথ সমৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ লক্ষ্য অর্জনে জাপানি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুই দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন এবং দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বৈঠক শেষে নিজের অফিসিয়াল ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে জাপানের প্রধানমন্ত্রী লেখেন, কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার এবং অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনে জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
পোস্টে তাকাইচি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানাতে পেরে আনন্দিত। গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মূল্যবোধে বিশ্বাসী বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ। গণতান্ত্রিক সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমান সরকারের রাষ্ট্রগঠন প্রচেষ্টায় জাপান দৃঢ়ভাবে সমর্থন দেবে।
অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি
জাপান সরকারের প্রস্তাবিত বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় দুই দেশ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে একটি বৃহৎ লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিটি দেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন এ দুই নেতা।
তৃতীয় টার্মিনাল, এমআরটি ও বন্দর যোগাযোগ
আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে একমত হয়েছেন। তারা ঢাকায় এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার কথাও বলেছেন। তারা আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদার ও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সমঝোতা স্মারক সই
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাকাইচি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগ সহজ করতে কর, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ পাঠানো ও লাইসেন্স দেওয়ার মতো কার্যক্রমে নিয়মকানুন ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন তারেক রহমান।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে।
দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও বাড়াতে জাপানের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠানো এবং অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও তারা একমত হয়েছেন।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সই হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত তা কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন দুই নেতা। এ চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্য রয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের টেকসই ও ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম উত্তরণে এ চুক্তি সহায়তা করবে বলে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতেও জাপান আগ্রহী।
ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ‘১৪ বছরেও খুনিরা চিহ্নিত হয়নি, জানা যায়নি মোটিভ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪ বছর আগে ঢাকার নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তিনটি সংস্থা ঘুরে গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সর্বশেষ তদন্তের দায়িত্ব পায় টাস্কফোর্স। দুই বছর ধরে তদন্ত করেও টাস্কফোর্স চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি। এমনকি দীর্ঘ তদন্তেও এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং হত্যাকাণ্ডে কে বা কারা জড়িত তা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি।
তবে গত আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার এক বক্তব্যে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়। যেখানে ঐ প্রসিকিউটর দাবি করেন, তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মে. জে. জিয়াউল আহসান ও একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। জিয়াউল আহসানের একজন সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাংবাদিক দম্পতি হত্যার তদন্তে কী তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন তা পাওয়ার জন্য চিফ প্রসিকিউটরকে চিঠি দিয়েছে পিবিআই। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে তাদের তদন্তকাজ সম্পন্ন হলে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত টাস্কফোর্সের তদন্তকারীর নিকট হস্তান্তর করা হবে জানিয়েছে।
তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল: এদিকে গতকাল মঙ্গলবার এই হত্যা মামলার ২৭ পৃষ্ঠা সম্বলিত তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করে টাস্কফোর্স। প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সম্পন্ন করতে এক বছর সময় চায় টাস্কফোর্স। শুনানি নিয়ে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেছেন। একইসঙ্গে আগামী ২৯ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেছেন। ঐ দিন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। এর আগে টাস্কফোর্স উচ্চ আদালত থেকে ছয় মাস করে তিন দফা সময় নেন। কিন্তু এখনো তদন্তের কোনো কুলকিনারা করতে পারেননি।
গতকাল দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এমন অনেক তথ্যের দেখা মিলেছে যেগুলো অতীতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে ছিল। অগ্রগতি প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাইকোর্টে পড়ে শোনান রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। বাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির। পরে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত সেটা নিয়ে সরকারের গোপন করার কিছু নাই। কাউকে রক্ষা করারও কাজ নাই। ২০১২ সালে যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু শোনা যেত। সেজন্য সবাই চাচ্ছে সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক। তিনি বলেন, তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা এই মামলার তদন্তে ছিলেন তাদের অনেককেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।
সাগর-রুনিকে হত্যার সময় তাড়াহুড়ো করেনি খুনিরা: অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে খুন হননি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তারা একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করেছেন এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে তাদের দুই জনকেই হত্যা করা হয়েছে। ক্রাইমসিন এবং ভিকটিমের ক্ষতের পরিমাণ দেখে বোঝা যায় যে খুনিরা হত্যাকাণ্ড সংঘটনে তাড়াহুড়া করেনি।
টাস্কফোর্স বলেছে, লুষ্ঠিত মোবাইল ফোন সেট ও দুইটি ল্যাপটপ আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায় নাই। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট তত্কালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মিডিয়া মুখপাত্র ডিএমপি ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, র্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানগণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায় নাই। সাবেক স্বরাষ্টমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় নাই। একজন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। উল্লিখিত ব্যক্তিগণকে তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়তো বা মামলার গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য কিংবা দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।
খুনিরা পেশাদার ছিল না: অগ্রগতি প্রতিবেদনে বিশেষ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে টাস্কফোর্স। এতে বলা হয়েছে, লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায় যে সাগর বা রুনি উভয়ের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে উল্লেখযোগ্য আঘাতের অস্তিত্ব নেই। পেশাদার খুনির অপরাধের সঙ্গে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভিকটিমদের দেহে অনেকগুলো ক্ষত ছিল যা অধিক রক্ত ক্ষরণের জন্য দায়ী। তবে প্রতীয়মান হয় যে ভিকটিম মৃত্যুর পূর্বে অনেকক্ষণ ক্ষতসহ জীবিত ছিল। ঘাড়ে এবং পিঠে, চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
শরীরে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি: টাস্কফোর্স বলছে, মামলাটি তদন্তকালে পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। আমার তদন্তকালে ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়। পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ মামলায় সন্দেহভাজন আট জন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। মামলার ঘটনায় সম্পৃক্ত মোট ৪৭টি বিভিন্ন ধরনের আলামত জব্দ করা হয়। সাগর ও রুনির লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যালে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু নিহতদের ভিসেরা সংরক্ষণ না করায় পরবর্তী সময় আদালতের অনুমতিক্রমে লাশ কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক পুনরায় ভিসেরা সংরক্ষণ ও ফুসফুস, লিভার ও পাকস্থলিতে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব ছিল কি না তা পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে প্রেরণ করেন। প্রাপ্ত ভিসেরা রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ডিএনএ পরীক্ষায় দুই জন পুরুষ কারা উদ্ঘাটন করা যায়নি: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাট এবং সাগর ও রুনির পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ অন্যান্য আলামত ও ২৫ জন ব্যক্তির বুকাল সোয়াব (মুখের ভেতরের কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ) সংগ্রহপূর্বক ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং নেদারল্যান্ডের ল্যাবে প্রেরণ করা হয়। আলামতে প্রাপ্ত ডিএনএর সঙ্গে প্রেরিত ব্যক্তিদের ডিএনএ ম্যাচিং হয়নি বলে ডিএনএ ল্যাব কর্তৃক প্রেরিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ল্যাব প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনাস্থলে চার জন ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিন জন পুরুষ ও এক জন নারী। তিন জন পুরুষের মধ্যে এক জন সাগর সারওয়ার এবং এক জন নারী মেহেরুন রুনির বলে শনাক্ত হয়। বাকি দুই জন অজ্ঞাত পুরুষ, এরা কারা তা উদ্ঘাটন করা যায়নি।
নয়া দিগন্ত
‘কর্মসংস্থানে চতুর্মুখী চাপ’—এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এক দিকে শিক্ষিত তরুণদের জন্য উপযুক্ত চাকরির অভাব, অন্য দিকে বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা, শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চাপ- সব মিলিয়ে শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে বহুমুখী সঙ্কট। এর সাথে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের অনিরাপদ কাজ। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মূল্যায়ন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে’ বলেছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে, বিনিয়োগ দুর্বল রয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে; আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সঙ্কট ও রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
আইএমএফের মূল্যায়নে উঠে এসেছে শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কাজের সঙ্কট এবং শিক্ষা ও চাকরির চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য। অন্য দিকে এডিবি কারিগরি শিক্ষা, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিন প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের অভিন্ন বার্তা হলো, কেবল প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালিয়ে কর্মসংস্থান সঙ্কটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, শিল্পের বৈচিত্র্য, দক্ষতার সাথে চাকরির সংযোগ এবং বাস্তবে কতটি নতুন কাজ সৃষ্টি হচ্ছে তার নির্ভরযোগ্য হিসাব।
শ্রমবাজারের সঙ্কট কতটা গভীর?
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে শুধু বেকারত্বের হার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শ্রমবাজারের ওপর একই সাথে চারটি দিক থেকে চাপ তৈরি হচ্ছে- নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিহীনতা, শিক্ষিত তরুণদের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতার অভাব, বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাওয়া। এর সাথে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিক্য (প্রায় ৮৪%) এবং বিদেশে শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে সঙ্কটটিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
এ পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো- অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি কি পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষের জন্য নিয়মিত, উৎপাদনশীল ও সম্মানজনক কাজ তৈরি করতে পারছে?
প্রথম চাপ: কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না সমতালে
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রবেশ করছেন। কিন্তু নতুন কর্মপ্রার্থীদের তুলনায় উৎপাদনশীল ও নিয়মিত চাকরি তৈরির গতি অত্যন্ত ধীর। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এক কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও নতুন চাকরি যুক্ত হয়েছিল মাত্র ৮৭ লাখ; অর্থাৎ নতুন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশের জন্য সমপরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি।
এখানে সঙ্কট শুধু চাকরি না পাওয়ার নয়, কাজের মানেরও। বিপুলসংখ্যক কর্মী অস্থায়ী কাজ করছেন, কেউ বাধ্য হয়ে স্বল্প আয়ের স্বনিয়োজনমূলক কাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ যোগ্যতার চেয়ে নিম্নমানের কাজ করছেন। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে তারা ‘কর্মরত’ হিসেবে গণ্য হলেও আয়, কর্মঘণ্টা ও কাজের নিরাপত্তার বিচারে তারা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
দ্বিতীয় চাপ: শিক্ষিত বেকারত্ব ও দক্ষতার অমিল
শিক্ষা বিস্তারের ফলে দেশে উচ্চশিক্ষিত কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু অর্থনীতিতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর উপযোগী চাকরির বাজার সেই অনুপাতে প্রসারিত হয়নি। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্ব পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
এই ব্যবধানের প্রধান কারণগুলো হলো: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমের সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদার অসামঞ্জস্য; কারিগরি, ডিজিটাল, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ঘাটতি; অভিজ্ঞতাহীন নতুন স্নাতকদের জন্য প্রবেশপর্যাযের চাকরির সীমাবদ্ধতা; নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, অপ্রাতিষ্ঠানিক বাধা ও স্বজনপ্রীতি।
এর ফলে পরিবারগুলো শিক্ষায় বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেও প্রত্যাশিত আয় পাচ্ছে না। দীর্ঘকাল বেকার থাকার ফলে তরুণদের অর্জিত দক্ষতার অপচয় ঘটছে, যা তাদের মানসিক হতাশা ও আর্থিক নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তৃতীয় চাপ: বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের দুর্বলতা
কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। কিন্তু নতুন কারখানা স্থাপন, ব্যবসার প্রসার ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপ্তি না ঘটলে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়া কঠিন।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী- দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান বাধা। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (ঝগঊ) খাতগুলো অর্থায়ন সঙ্কট, দুর্বল অবকাঠামো ও জটিল নিয়ন্ত্রক বিধিমালার কারণে গতি পাচ্ছে না।
আজকের পত্রিকা
‘প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের নিয়ে চিন্তায় বিএনপি’—এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে একক প্রার্থী বাছাই করতে চায় ক্ষমতাসীন বিএনপি। এই লক্ষ্যে দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। তবে প্রার্থী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব নিয়ে দলের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোথাও কোথাও জরিপ ও আলোচনা চলার মধ্যেই নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের সামনে আনার চেষ্টা করছেন সংসদ সদস্যরা। এতে দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে একাধিক জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রার্থী বাছাইয়ের সুপারিশ প্রথমে উপজেলা কমিটি থেকে জেলা কমিটিতে যাবে। জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে তা পাঠাবে বিভাগীয় টিমের কাছে। কোনো পর্যায়ে অনিয়ম বা অসংগতি দেখা দিলে তা পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্বাচন পরিচালনা এবং প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে তারেক রহমানের নির্দেশনায় চার সদস্যের একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
পরিকল্পিত এই প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসায় বিএনপির মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতার ভাষ্য, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে চালানো জরিপের ক্ষেত্রে কোনো কোনো এমপি নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের পক্ষে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন তাঁরা। কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে সম্প্রতি শারদীয় দুর্গাপূজার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
বিএনপির নেতাদের একটি অংশ বলছে, একক প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমপিদের প্রভাবের বাইরে থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে জনসমর্থন এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দ প্রাধান্য পেতে পারে। এতে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ পড়ার পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তবে দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ এখনো আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে। যাচাই-বাছাই এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে একজনকে চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের মতে, প্রার্থী হতে আগ্রহী একাধিক ব্যক্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য একজনকে সমর্থন দেওয়াই দলের লক্ষ্য।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, জরিপের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ থাকলেও তা প্রভাবমুক্ত না হলে মনোনয়নে স্থানীয় জনসমর্থনের যথাযথ প্রতিফলন না-ও ঘটতে পারে। সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের বাইরের কাউকে সমর্থন না দিলে একক প্রার্থী নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের মতামত একেবারে উপেক্ষা করার পক্ষেও নন তাঁরা। এই নেতাদের বক্তব্য, স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভোটারদের মনোভাব এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন। তাঁদের অভিমতের পাশাপাশি প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা, এলাকায় জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী লড়াইয়ের সক্ষমতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা যাচাই করে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। বিএনপি একক প্রার্থীই দেবে এবং তা নিশ্চিত করতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রিন্স বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়নে আমরা মতামত নিচ্ছি। সেখানে ৮ জন, কোথাও ৬ জন বেরিয়ে আসছেন (সম্ভাব্য প্রার্থী)। আলোচনার মাধ্যমে ওই সংখ্যা দুই-তিনে নেমে এসেছে। তাঁদের মধ্য থেকে গ্রহণযোগ্যদের সমর্থন দেওয়া হবে। এই অবস্থায় কে অধিক গ্রহণযোগ্য, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। তাঁকে নিয়ে যদি আমরা ঘুরি বা কথা বলি, নির্বাচনের আগে তো এ রকম হতেই পারে।’
অন্যদিকে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুসারেই কাজ করার দাবি করছেন। সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ে দলের চেয়ারম্যান একটা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করছি।...প্রার্থী হতে অনেকে চাইবেন, তবে সবাই তো মনোনয়ন পাবেন না।’
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার প্রতিবেদন ‘ভারত সরকারে অস্বস্তি দোলাচলে নেতাকর্মীরা’। খবরে বলা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা আশা-নিরাশার দোলাচলে রয়েছেন। তিনি ফিরবেন সেটি যেমন সুনিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ, তেমনি তিনি ফিরবেন না সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা।
তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র জানায়, ২০২৪-এ গণঅভুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লির আশ্রয় থেকে আপাতত দেশে না ফিরতে অনুরোধ করেছে ভারত সরকারও। ভারতের যুক্তি হলো শেখ হাসিনার জীবননাশের হুমকি আছে। আপাতত দেশে ফেরার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। দেশে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী এখন তৎপর। এ অবস্থায় তার দেশে ফেরাকে ঝুঁকি মনে করছে ভারত সরকার। তবে শেখ হাসিনাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি ভারত সরকারের কোনো যুক্তি। ভারত সরকার এটা নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতেও রয়েছে। শেখ হাসিনার অনমনীয় অবস্থানের কারণে ভারত সরকার তাকে আর আটকাতেও চায় না। যদিও নিরাপত্তা নিয়ে দেশটির উদ্বেগ আছে। সে বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে নেপথ্যে বেশ বোঝাপড়া চলছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারত কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। সূত্র আরও জানায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে ভারত বেশ কিছু ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চাইবে। নিশ্চয়তার ব্যাপারগুলো চূড়ান্ত হলে দেশে ফেরার ব্যাপারে অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্তরালের আলোচনা ব্যর্থ হলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরা অনিশ্চিতই থেকে যাবে। অন্দরমহলের আলোচনায় রাজনীতি অস্থির করে তোলা যাবে না এ গ্যারান্টিও দিতে হবে আওয়ামী লীগকে।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নেতাকর্মীদের একটি অংশ ধরে নিয়েছে ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা। অপর একটি অংশ শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা দেখছে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, দল সংগঠিত নয়, মব বন্ধ হয়নি, দমন-পীড়ন চলছে, পুলিশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেএ অবস্থায় নেতাকর্মীদের মাঠে দাঁড়ানোই অসম্ভব। সেক্ষেত্রে দলীয় সভাপতির দেশে ফেরার পরিস্থিতি কতটা অনুকূলে সেটা আগে ভাবতে হবে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন এমন বিশ^াস করেন যারা তারা দাবি করেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বোঝাপড়া শেষ হয়ে গেছে। একটি বিশেষ শক্তিও শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ইতিবাচক। ফলে তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সম্পাদকীয় পদের একজন নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেও নানা রকম ভাবনা আছে। পরিষ্কারভাবে না তিনি কীভাবে দেশে ফিরে আসবেন। ওই নেতার দাবি, আমাদের কাছে তথ্য হলো তিনি দেশে ফিরবেন ডিসেম্বরে। তবে এ ব্যাপারে দলের নেতাদের প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো নির্দেশনা আসেনি। তারা কী করবেন সেটিও পরিষ্কার করা হয়নি।
দলের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের নেতাকর্মীদের কাছে নির্দেশনা না যাওয়ার কারণ অন্য কৌশল। তার মতে, সবাই কৌশল জেনে গেলে নানারকম জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পুরো ছক এখনো নিজের মধ্যেই রেখেছেন শেখ হাসিনা । যখন জানানো দরকার জানাবেন সবাইকে।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর। দুয়ে দুয়ে মিলে গেলে দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা। সেটি না মিললে ফেরা অনিশ্চিত হতেই পারে। তবে এখন পর্যন্ত যেটি হয়েছে তা হলো শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্ত, তিনি দেশে ফিরবেন।
যা বলেছেন তথ্য উপদেষ্টা : গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তাকে কোনো মবের মুখোমুখি হতে হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা যাকে চাই, তিনি আসবেন, আমরা হ্যাপি। আমাদের ধরেবেঁধে আনতে হলো না। উনি এলে বিচারের মুখোমুখি হবেন। তিনি ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি। উনি আসার পর আইনি প্রক্রিয়ায় যা যা হওয়ার তাই হবে।’ তবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না, এ নিয়ে সন্দিহান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ আলোচনা চলতে থাকবে।’
উপদেষ্টা জাহেদ বলেন, ‘উনি (শেখ হাসিনা) দেশে ফিরে এলে ন্যায়বিচার ফেস করবেন। উনি কোনো মব ফেস করবেন না। উনি কোনো রকম বেআইনি কিছু ফেস করবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘উনি (শেখ হাসিনা) ন্যায়বিচার করেননি। আমরা ন্যায়বিচার দিয়ে সেটা করব। আসুক, ওনাকে ওয়েলকাম।’
