চাঁপাইনবাবগঞ্জে সার সংকটের নেপথ্যে যে কারণ

ফন্ট সাইজ:

চাঁপাইনবাবগঞ্জে শীতকালীন সবজি, পিয়াজ, সরিষা ও ভুট্টা চাষে সময়মতো প্রয়োজনীয় সার মিলছে না। সার সংকটের কারণে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সংকট ও বিতরণে অনিয়মের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। ডিলার পয়েন্টগুলোতে কৃষকের ভিড় ও বিশৃঙ্খলা সামলাতে পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুরে শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বন্ধন ট্রেডার্স নামে ডিলার পয়েন্টে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অভিযোগ, এখন শীতকালীন সবজি, পিয়াজ, সরিষা ও ভুট্টা চাষের মৌসুম। কিন্তু বিভিন্ন ডিলার পয়েন্ট ঘুরেও সময়মতো সার পাচ্ছেন না। সরকারের হিসাবে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে। তাহলে সংকটের কারণ কী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কৃষক, ডিলার ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সারের সংকটের তিনটি কারণ জানা যাচ্ছে। এগুলো হলো- বরাদ্দ অপ্রতুল, ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, সচেতনতার অভাবে জমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার প্রয়োগ। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার করছে। এর ফলে কৃষিজমির জন্য বরাদ্দ করা সারের ওপরও চাপ বাড়ছে।

ডিলারদের দাবি, আগামী নভেম্বরের আলু, পিয়াজ ও শীতকালীন সবজি চাষের কারণে দ্বিগুণ সারের প্রয়োজন। ফসল চাষকে কেন্দ্র করে আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। যে কারণে সারের চাহিদায় চাপ বাড়ছে। নভেম্বর মাসের বরাদ্দ আগেই দেয়া হয়েছে। এতে সংকট কাটবে না। সংকট সমাধানে উপ-বরাদ্দ এবং যেখানে সার অতিরিক্ত আছে, সেখান থেকে সারের ঘাটতি থাকা এলাকাগুলোতে পুনর্বণ্টন প্রয়োজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বিসিআইসি’র এক ডিলার বলেন, আমার ইউনিয়নে এই মৌসুমে অন্তত ১০০ টন ডিএপি সারের প্রয়োজন। কিন্তু অক্টোবর-নভেম্বর দুই মাসে বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ৬৫ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর সারের চাহিদা নিয়ে একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর এক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি কাজ করে থাকে। চলতি অর্থবছরে সারের চাহিদা ও বরাদ্দে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সব ধরনের সারের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। তথ্যমতে, জেলার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৩৮ জন ও বিসিআইসির ৫৮ জন ডিলার কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ করে থাকে।

চলতি অর্থবছরে ৪২ হাজার ৭৪৯ টন ইউরিয়া চাহিদার বিপোরিতে বরাদ্দ অনুমোদ হয়েছে ৩৯ হাজার ১০৩ টন, ৯ হাজার ৫৪০ টন টিএসপি চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ মিলেছে ৭ হাজার ৮৪০ টন, ৪০ হাজার ৩৯৩ টন ডিএপি চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ মিলেছে ৩৪ হাজার ৫৮০ টন, ২২ হাজার ১৯১ টন এমওপি সার চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে ১৯ হাজার ৮১৩ টন। সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন সার চাহিদা থাকলেও বরাদ্দ মিলেছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ জেলায় চাহিদার তুলনায় ১৩ হাজার ৫৩৭ টন কম বরাদ্দ হয়েছে। বিসিআইসি’র ডিলারদের সংগঠন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের (বিএফএ) জেলা শাখার সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। এ কারণে কৃষকদের চাহিদামতো সার দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা সার সংকটের পেছনে কৃষি কর্মকর্তাদেরও দায় আছে বলে মনে করেন।

তিনি কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়তে পারেন, এ আশঙ্কায় নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি। ওই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা সারের চাহিদার সঠিক পরিকল্পনা করেন না। মাঠপর্যায়ে যাচাই করেন না, এমন অভিযোগ তুলে ওই কর্মকর্তা বলেন, বছরের শুরুতে সার ও বীজ ব্যবস্থাপনা কমিটি চাহিদাপত্র নেয়। জেলায় সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আছে। উপজেলা থেকে কোনো সার কী পরিমাণ দরকার, তার একটি চাহিদা নেয়া হয়। তার ওপর ভিত্তি করে বর্ষপঞ্জি সাজানো হয়। চাহিদা হিসেবে সার বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, কমিটির লোকজন যথাযথভাবে যাচাই না করে গতানুগতিক চাহিদা দিয়ে দিচ্ছেন। ওই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারো মাসি আম, পেয়ারা, মাল্টাসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল ও ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। জেলায় ৪৫ টি ইউনিয়ন আছে আছে, প্রত্যেক এলাকায় একইভাবে ফসল উৎপাদন হয় না।

কিন্তু সারের বণ্টন বা বরাদ্দ প্রায় সমান। তবে সারের সংকট নেই বলে দাবি করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ পেয়েছি। কৃষকরা সার নিচ্ছে, পরবর্তী ফসলের জন্যও সংগ্রহ করছে। তবে সার পাওয়া যা না-এই শঙ্কা থেকে কৃষকরা ব্যতিব্যস্ত। এ কারণে কিছুটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সার সংকটের প্রশ্নে জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এমপি বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। বর্তমানে সারের পর্যাপ্ত মজুত আছে। চাহিদা দিলে বরাদ্দ দেয়া হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে কেন সার সংকট সেটি খতিয়ে দেখা হবে।