লুলার অবিশ্বাস্য বিজয়

লুলার অবিশ্বাস্য বিজয়

ফন্ট সাইজ:

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে এ বিজয় লাভ করেন তিনি। প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিওর চেয়ে ২২ লাখ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন লুলা। তবে রান-অফে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করেন তিনি, যা ব্রাজিলের আধুনিক ইতিহাসে প্রথম। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৫ শতাংশ বা ৬ কোটি ৪২ লাখের বেশি ভোট। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২৫ শতাংশ বা ৫ কোটি ৯৮ লাখের বেশি ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৪০ লাখ। লুলার এই বিজয় লাতিন আমেরিকা ও বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজ লুলার ৮১ তম জন্মদিন (২৭শে অক্টোবর)। নিজের জন্মদিনের ঠিক আগের দিনে এই জয় তাকে করেছে আরও বেশি প্রাণবন্ত। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থেকেও রান-অফে জয়লাভ করার এমন দৃষ্টান্ত ব্রাজিলে আগে কখনো দেখা যায়নি।

চতুর্থ মেয়াদে লুলা: এই জয়ের মাধ্যমে ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চতুর্থ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড গড়লেন লুলা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জয় কেবল একজন প্রার্থীর জয় নয়, বরং এটি একটি দেশের গণতান্ত্রিক ধারা ও শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য এক নির্ণায়ক মুহূর্ত। এই নির্বাচনের ফলাফলকে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের একটি বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফ্লাভিও বলসোনারো তার প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি তার বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে কারামুক্ত করবেন। জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করার দায়ে বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ফ্লাভিওর পরিকল্পনায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসন এবং সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ফ্লাভিও এখন পরাজয় মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্টিয়ানো জানিনের ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য বলে ফলাফল বাতিল করার দাবি জানান।

ডানপন্থিদের উত্থানে বাধা: ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও লুলার এই প্রত্যাবর্তন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি রাজনীতির যে উত্থান দেখা যাচ্ছিল, লুলার জয় সেই ধারায় একটি বড় বাধা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মিত্র হিসেবে পরিচিত ফ্লাভিওর পরাজয় আন্তর্জাতিক ডানপন্থি বলয়ের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের ওপর শুল্ক আরোপসহ বিভিন্নভাবে বলসোনারো পরিবারকে সমর্থন জুগিয়েছিল। লুলার জয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে গ্লোবাল সাউথ, ব্রিকস এবং চীনের সঙ্গে ব্রাজিলের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুসংহত হবে। লুলা সবসময় বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছেন।

পরিবেশবাদ ও সামাজিক নিরাপত্তা: পরিবেশগত সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই নির্বাচন ছিল একটি বড় পরীক্ষা। জাইর বলসোনারোর আমলে আমাজন রেইনফরেস্টের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং আদিবাসীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে সেই পরিবেশবিনাশী নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা ছিল। লুলার বিজয় বিশ্বের ফুসফুসখ্যাত আমাজন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষ ও নারীদের অধিকার সুরক্ষায় লুলার সামাজিক কর্মসূচিগুলো এই জয়ের ফলে অব্যাহত থাকবে। তবে ফ্লাভিও নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করায় এবং ব্রাজিলের কংগ্রেসে ডানপন্থিদের আধিপত্য থাকায়, একটি মেরুকৃত সমাজ ব্যবস্থায় আগামী দিনগুলোতে লুলাকে সরকার পরিচালনায় বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
অ্যালগরিদম কারসাজির বিরুদ্ধে লড়াই: লুলার এই বিজয় মেটা’র মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যালগরিদম কারসাজির বিরুদ্ধেও একটি বড় জয়। লুলার প্রচার শিবির অভিযোগ করে, মেটা তাদের প্ল্যাটফরমে প্রগতিশীলদের কনটেন্ট লুকিয়ে রাখছে এবং ফ্লাভিওর কনটেন্ট বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, নির্বাচনী আদালত মেটা’কে সব প্রার্থীর প্রতি নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়। প্রযুক্তিনির্ভর এই অপতৎপরতা রুখে দিয়ে লুলার জয় বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

লুলার বিজয়ের মূল নির্ণায়ক: লুলার প্রচারণার কৌশলগত পরিবর্তন এই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর লুলা তার প্রচারণায় জনবান্ধব অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেন, যার মধ্যে সপ্তাহে ছয়দিনের বদলে পাঁচদিন কাজের নিয়ম, ঋণ মওকুফ এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিনামূল্যে গণপরিবহন চালুর মতো বিষয়গুলো ছিল। প্রথম দফায় প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ মানুষ ভোটদানে বিরত থাকলেও রান-অফে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া লুলার জয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে। নারী ভোটারদের ভোটও লুলার পক্ষে গিয়েছে।

ধর্ম ও নারী-পুরুষে বিভেদের প্রভাব: ব্রাজিলের এই নির্বাচনে ধর্ম, অপরাধ ও লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। অপরাধ দমনে ফ্লাভিও এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলির মতো কট্টর নীতি গ্রহণ, ধর্ষকদের রাসায়নিক খোঁজাকরণ এবং অপরাধের ক্ষেত্রে নাবালকত্ব বয়সসীমা ১৪ বছরে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। ধর্মীয় মেরূকরণের দিক থেকে ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের ৬২ শতাংশ ফ্লাভিওকে সমর্থন করলেও ৫২ শতাংশ ক্যাথলিক লুলার পক্ষে ছিলেন। তবে নারীদের ভোট লুলার জয়ে সবচেয়ে বেশি নির্ণায়ক ছিল। ফ্লাভিও ২০০৬ সালে নারীদের ‘দেশের পর্যটন আকর্ষণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, যা নারীদের পছন্দনীয় ছিল না। বিপরীতে লুলা নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এর ফলে নারীরা ব্যাপকভাবে লুলার পক্ষে রায় দিয়েছেন। ব্রাজিলের কংগ্রেসে ডানপন্থিদের আধিপত্য থাকলেও লুলার এই বিজয় লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থিদের উত্থানকে আপাতত থামিয়ে দিয়েছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট