আগামীকাল মঙ্গলবার জনমত বিভক্ত ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ে জনপ্রিয়তার দিক থেকে বেশ চাপে আছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত রীতি ভেঙে তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। রোববার নেতানিয়াহুর প্রতি তার সমর্থন আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। ইসরাইলিদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, মঙ্গলবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে হবে, যাতে দুই নেতা মিলে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা ‘কাজ শেষ করতে’ পারেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইসরাইল।
ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া সর্বশেষ এই পোস্টটি এসেছে নেতানিয়াহুর প্রতি তার প্রথম সমর্থন ঘোষণার এক সপ্তাহ পর। এর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে আবারও সমর্থন জানানোর জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছিলেন। একাধিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অবস্থান থেকে অনেক দূরে রয়েছে।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ইসরাইলের জনগণের উদ্দেশে বলছি, যারা বিষয়টি দেখেননি, তাদের জন্য এক সপ্তাহ আগে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী ‘বিবি’ নেতানিয়াহুর প্রতি দেয়া আমার সমর্থনের বক্তব্যটি আবারও তুলে ধরছি। গত সপ্তাহে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেয়া নিজের আগের পোস্টটিও নতুন পোস্টের সঙ্গে যুক্ত করেন ট্রাম্প। তিনি আরও লিখেছেন, শত্রুপক্ষসহ সবাই জানে, বিবি ও আমার মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। আমরা একসঙ্গে বিজয় অর্জন করেছি। ট্রাম্প দাবি করেন, আমি ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়েছি, যা ইতিহাসের অন্যতম সফল সামরিক অভিযান। তবে তার আগে আমরা অপারেশন মিডনাইট হ্যামার পরিচালনা করেছি। এর মাধ্যমে বিশ্বের সন্ত্রাসবাদের এক নম্বর পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছি।
এরপর তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এরপর আমরা অপারেশন এপিক ফিউরি পরিচালনা করেছি। এখন ইরানের কোনো নৌবাহিনী নেই, বিমানবাহিনী নেই। দেশটির সামরিক বাহিনী ও অর্থনীতি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। এমনকি ইরানে মূল্যস্ফীতি ৩০১ শতাংশে পৌঁছেছে। নৌ অবরোধের কারণে তারা তেল পাচ্ছে না। সামরিক ও বেসামরিক- দুই পর্যায়ের নেতৃত্বই হারিয়ে গেছে।
তবে ট্রাম্পের এসব দাবির নিরপেক্ষতা যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। পোস্টের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘বিবি’ নেতানিয়াহুকে ভোট দিন। আমরা যে কাজ শুরু করেছি, তা শেষ করতেই হবে! নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা ট্রাম্পের প্রথম সমর্থন ঘোষণাকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছিলেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা বলেছেন, তারা ট্রাম্পকে সম্মান করেন, তবে ইসরাইলিরাই তাদের নেতা নির্বাচন করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিবর্তনশীল মেজাজের প্রেসিডেন্ট অনেক আগেই মিত্রদেশগুলোর নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের হস্তক্ষেপ না করার প্রচলিত রীতি পরিত্যাগ করেছেন। বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে তিনি একাধিকবার প্রার্থীদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের বিষয়ে নেতানিয়াহু বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় তার ওপর বিরক্ত ট্রাম্প। ওয়াশিংটন যখন তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করে সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়, তখন দুই নেতার মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে বলে খবর প্রকাশিত হয়। ইসরাইলের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমন কোনো চুক্তি হতে পারে, যা দেশটির নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হবে।
জুন মাসে লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলার কারণে ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয়। এ সময় নেতানিয়াহুকে অশালীন ভাষায় সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, নেতানিয়াহু পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করলে তিনি ‘সম্ভবত’ তাকে সমর্থন জানাবেন না। তবে তার আগে নির্বাচনে আর কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তা দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে বলে বারবার দাবি করে আসছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে কাজ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের আহ্বানের আগে রোববার নেতানিয়াহুও ইরান নিয়ে সতর্কবার্তা দেন। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি তেল আবিবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের একটি ছবি প্রকাশ করেন। এতে তিনি সতর্ক করে বলেন, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দিলে ইসরাইলিরা ‘দ্বিতীয় হলোকাস্টের’ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ওই পোস্টে বলা হয়, ট্রাম্প যত দিন ক্ষমতায় রয়েছেন, তত দিন ইরানের মোকাবিলা করার জন্য ইসরাইলের হাতে সীমিত সময় রয়েছে। এই ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ‘আমাদের ক্ষমা করবে না’ বলেও সতর্ক করেন নেতানিয়াহু।
তবে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য তার নিজের আগের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বারবার বলেছেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দিয়েছে। গত মাসে জাতিসংঘে নেতানিয়াহু বলেন, গত এক বছরে আমরা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করে দিয়েছি। এর আগে মার্চে দেয়া এক বিবৃতিতে ইসরাইলের এই নেতা বলেন, ইসরাইলের হামলার ফলে ইরান ‘আর আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে না’।
নেতানিয়াহুর সমালোচকরা সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে কিংবা ভোট পিছিয়ে দিতে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করার চেষ্টা করছেন। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশকে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহু ও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামিরের মধ্যে ‘নজিরবিহীন সংঘাত’ চলছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
