বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের ৮ম তলা থেকে পড়ে সামিয়া নুর (১৫) নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে শনিবার। বিএমইউ’র সি-ব্লকের গাইনি ওয়ার্ড থেকে পড়ে যায় সামিয়া। কেবল সি ব্লকের ওই ওয়ার্ড নয়, ওই ভবনের সবটাই যেন মৃত্যুফাঁদ! ভবনের কোনো জানালায় নেই গ্রিল। এমনকি শিশুদের ওয়ার্ডেও না। ফলে যেকোনো সময়ই জানালা দিয়ে পড়ে রোগী কিংবা স্বজনরা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
সামিয়ার মা জরায়ু টিউমারের চিকিৎসার জন্য ৫/৬ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২৮ তারিখে তার অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। সামিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শনিবার দুপুরে খাওয়ার পর ওয়ার্ডের জানালার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে সামিয়ার মা ও মামি উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ আড়মোড়া দিতে গিয়ে হাতের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সামিয়া। নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই খোলা জানালা দিয়ে পড়ে যায় নিচে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
রোববার দুপুরে সরজমিন দশতলা ভবনটির প্রতিটি ফ্লোর ঘুরে দেখা গেছে, ভবনের সামনের ও পেছনের অংশের কোথাও কোনো জানালায় গ্রিল ব্যবহার করা হয়নি। প্রতিটি ওয়ার্ডের সঙ্গেই জানালা রয়েছে। ওইসব জানালা দিয়ে যে কেউ চাইলেই মাথাসহ পুরো শরীর বাইরে বের করতে পারে। ওয়ার্ডের শয্যাগুলো থেকে খোলামেলা এসব জানালার উচ্চতা মাত্র একহাত সমান। ভবনের ৫ তলায় রয়েছে শিশু ও নিউরো সার্জারি বিভাগ। সেখানে শিশুদের ওয়ার্ড রয়েছে। শিশুদের ওয়ার্ডের শয্যা আর খোলা এসব জানালার দূরত্বও এক হাত সমান। ফলে একটি শিশু যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। অনেক শয্যার সঙ্গে জানালা লাগানো। গ্রিল না থাকায় রোগী ও স্বজনরা চাইলেই বাইরে যেকোনো কিছু ছুড়ে ফেলতে পারেন। এমনকি অনেককেই ওইসব জানালা দিয়ে মাথা বের করে এদিক-সেদিক উঁকি দিতে দেখা গেছে। নিহত সামিয়া সি-ব্লকের গাইনি ওয়ার্ড থেকেই পড়ে যায়। সেখানেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। তবে হাসপাতালের কেবিন ব্লক, ই ও ডি ব্লকের ভবনগুলোতে জানালায় নিরাপত্তা গ্রিল রয়েছে।
এদিকে এই কিশোরী মারা যাওয়ার পর কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অন্য রোগী-স্বজনরাও।
খোলামেলা জানালা নিয়ে হঠাৎ নতুন করে ভাবছেন তারা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে গাইনি বিভাগে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য এসেছেন মহিন। তিনি বলেন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার ৩ বছরের বাচ্চা আছে। বিষয়টি এতদিন ভাবিনি। এই ঘটনা ঘটার পর তো দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আমার বাচ্চাকে এখন বাড়তি নজরে রাখছি। নাজনিন মুন্নি নামের আরেক স্বজন বলেন, কম টাকায় চিকিৎসা করাতে এসেছি। এখন বিপজ্জনক হলেও সচেতন থেকে কীভাবে সুস্থ হওয়া যায় সেটি ভাবছি।
ওই ভবনটির নিচতলায় রয়েছে পরিচালক (হাসপাতাল) অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ওয়ার্ড মাস্টার অফিস, নিউরো সার্জারি জরুরি বিভাগ, কনফারেন্স রুম ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগ ও মেডিক্যাল গ্যাস প্লান্ট কন্ট্রোল রুম। ২য় তলায় শিশু বিভাগ, এনআইসিইউ, নিওনেটোলজি বিভাগ, চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ রয়েছে। ৩য় তলায় চর্ম ও যৌন অপারেশন থিয়েটার, নেফ্রোলজি ওয়ার্ড, নিউরো সার্জারি ওয়ার্ড, ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ, নার্সিং সুপার অফিস, ইউরোলজি বিভাগ ও হেমোডায়ালাইসিস বিভাগ রয়েছে। ৪র্থ তলায় আছে ইউরোলজি মাইনর অপারেশন থিয়েটার, নেফ্রোলজি বিভাগ, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট (কে টি)। ৫ম তলায় নিউরো সার্জারি বিভাগ, শিশু সার্জারি বিভাগ ও নিউরো সার্জারি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। ৬ষ্ঠ তলায় নাক, কান ও গলা বিভাগ, হেপাটোবিলিয়ারি সার্জারি বিভাগ, কলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ রয়েছে। ৭ম তলায় চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগ, নাক, কান ও গলা বিভাগ, কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগ রয়েছে। ৮ম তলায় জেনা: অবস্ অ্যান্ড গাইনি বিভাগ, গাইনি পোস্ট অপারেটিভ, ফিটোম্যাটার্নাল মেডিসিন বিভাগ, ফিস্টুলা ওয়ার্ড সিজার অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। ৯ম তলায় জেনারেল সার্জারি বিভাগ, লিথোট্রিপসি, ইউরোলজি ওটি, অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগসহ ১০ম তলায় জেনারেল সার্জারি অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ-০১ ও জেনারেল পোস্ট অপারেটিভ বিভাগ রাখা হয়েছে।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা
একমাত্র সন্তান সামিয়াকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে বাবা নুরুন নবী। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। এখন কিছুই করেন না। টাকা সাশ্রয়ের জন্য বিএমইউতে স্ত্রীকে নিয়ে এসে একমাত্র মেয়েকে হারান। রোববার রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সকাল ১০টার দিকে মেয়েকে দাফন করা হয়। আবেগ আপ্লুত হয়ে নুরুন নবী মানবজমিনকে বলেন, আমার একমাত্র সন্তান ছিল আমার মেয়েটি। আমার আর কেউ নেই। হাসপাতালের এত বড় গাফিলতির জন্য আজ আমি আমার একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে ফেলেছি। হাসপাতাল ভবনটি যেন মৃত্যুফাঁদ তৈরি করেছে। আমার মেয়ে আটতলা থেকে পড়ে মারা গেল আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। এটা কোনো জবাব হলো? এটা কোনো সুরাহা হলো? তাদের কাছে আমাদের প্রাণের কোনো মূল্য নেই। এদেশে কার কাছে বিচার চাইবো?
তিনি বলেন, শুধু আমার মেয়েই নয়, এটা অন্য যেকোনো রোগীর জন্যও হতে পারে। কোনো রোগী সুস্থ হতে না পেরে অনেক সময় হতাশায় লাফ দিতে পারে। আমার মেয়ের মতো অসাবধানতাবশত পড়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই ঘটনায় ইচ্ছা করলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারতাম, কিন্তু আমি অপমৃত্যুর মামলা করেছি। কারণ আমি জানি সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে আমি জিততে পারবো না। আমার মেয়ের শরীরের সবকিছু ভেঙে গেছে। মামলার পর ময়নাতদন্ত করে উল্টো মেয়েকে কাটাছেঁড়া করে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে ফেলতো।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে রোববার দুপুরে বিএমইউ-এর হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইরতেকা রহমানের কর্মস্থলে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে ফোনেও একাধিকবার কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
