নিজেদের পাহাড়সম ব্যর্থতা চাপা দিতেই বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, তারা (বিএনপি) নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছেন। আমরা নাকি পরিত্যক্ত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছি। নাউজুবিল্লাহ। আপনারা নির্বাচনের সময় ইনিয়ে-বিনিয়ে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছেন। গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক আলোচনা সভায় জামায়াত আমীর এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান মেনে চললে ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারিতে কোনো নির্বাচনের অস্তিত্ব থাকে না। ওই নির্বাচন না হলে আপনারা সরকার হন কীভাবে, আর আমরা বিরোধী দল হই কীভাবে? কিছুই তো থাকে না। সংবিধানের এই নেশা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, এই সংবিধান ফ্যাসিবাদের জন্মই শুধু দেয় নাই, ফ্যাসিবাদকে স্থায়ী রূপ দিতে চেয়েছিল। যে সমস্ত জায়গায় আমূল পরিবর্তন দরকার, সব জায়গায় আপনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছেন। আবার নোট অব ডিসেন্ট দেন নাই, সেগুলোও এখন আপনারা এড়িয়ে চলছেন।
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়া সংবিধানে ফিরে না গিয়ে জুলাই সনদের আলোকে ৭০ ভাগ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে রাজপথের আন্দোলনেই সরকারকে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, একই দিনে দুটো ভোট হয়েছে। আমরা কিন্তু একই দিনে চাইনি। আমাদের স্পষ্ট দাবি ছিল, আগে গণভোট হবে, তারপরে সংসদ নির্বাচন হবে। আমাদের আশঙ্কা ছিল, দুইটাকে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত করলে দুটোকে গুলিয়ে ফেলা হবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের আশঙ্কাই সত্য বলে প্রমাণিত হলো। তিনি আরও বলেন, তারা (বিএনপি) শুরু থেকেই চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছেন। বিএনপি’র দাবি ছিল- একই দিনে হোক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই অযৌক্তিক দাবিকে মেনে নিয়ে একই দিনে ভোট করলো। জনগণ জানে এবং বলে বিএনপি আসলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি।
জামায়াত আমীর বলেন, তারা দেশ-বিদেশে ইনস্ট্রাকশন দিয়েছিল তাদের লোকদেরকে ‘না’-তে ভোট দেয়ার জন্য। জনগণের আকাঙ্ক্ষার কাছে ‘না’ ভেস্তে গেছে, ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিয়েছে।
জুলাই সনদ সইয়ের অনুষ্ঠানস্থল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই স্বাক্ষর দক্ষিণ প্লাজায় হলো কেন? এটা গণভবনে হলো না কেন? অন্য কোনো জায়গায় হলো না কেন? এটা একটা বার্তা ছিল যে-এই সংসদে বসে বসে জনগণের অধিকারকে খুন করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে।
সংসদের বিষয়ে জামায়াত আমীর বলেন, এই সংসদে বসে আগামীতেও যেন একই প্রক্রিয়া চালু না থাকে, এজন্যই এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়েছে-সাধু সাবধান! কিন্তু জাতির সঙ্গে দেয়া কথা রাখা হলো না। আপনারা ৭০ ভাগ জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছেন, আপনারা কি চান বিরোধী দলও ধোঁকাবাজি করুক? আমরা এটা মেনে নেবো না।
আদালত দিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যেই আইনজীবীরা, আইন প্রণেতারা ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ বলেছেন যে, এরকম বহুবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে, কিন্তু আদালতে গিয়ে এটা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। আমরা ঐ প্রক্রিয়ায় যেতেই চাই না। আরেকটা সংশোধন করবেন, একটা আদালত এটাকে একদম হোয়াইটওয়াশ করে দিবে। আমরা এই পণ্ডশ্রমে এবং অতীতের ভুল ধারায় চলতে রাজি নই, এজন্যই আমরা আমূল সংস্কার চাই।
তিনি বলেন, তারা (বিএনপি) নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছেন। আমরা নাকি পরিত্যক্ত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছি। নাউজুবিল্লাহ। আপনারা নির্বাচনের সময় ইনিয়ে-বিনিয়ে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেছে, ‘হাতে-পায়ে ধরে ভোট নিলো, এখন বেঈমানি করে কেন?’ তার দলের আরেকজন গডফাদার বলেছেন, কমপক্ষে ৯৫টি আসনে হেরে যাওয়া বিএনপিকে আমরাই জিতিয়ে দিয়েছি ভোট দিয়ে।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে আর এইখানে ইঙ্গিত করে বলেন, আমরা নাকি অস্থিরতা সৃষ্টি করছি। সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে তো আপনি সরকারে আছেন কেন? এই টাকা ঢুকে কীভাবে, ঠেকাতে পারেন না কেন?
মাদকের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ওপার থেকে অস্ত্র আসে, মাদক আসে, কেন ঠেকাতে পারেন না? যেই সরকারের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তু ঠেকানোর কোনো যোগ্যতা নাই, সেই সরকারের দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নাই।
আলোচনা সভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, তারেক রহমানকে অতীত থেকে সবক নিতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকজনের কারণেই তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। চারদিকে যুদ্ধ করে প্রধানমন্ত্রী জয়লাভ করতে পারবেন না। জনগণের স্বার্থে অনতিবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপি’র সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও গণভোটের রায়ের পরও সরকার সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলো অস্বীকার করতে চায়।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। এ জন্য তারা আবোলতাবোল বকছে, জাতিকে ভুল বুঝিয়ে কোনো রকম টিকে থাকার অপচেষ্টা করছে। বিশেষ কমিটির নামে সংবিধান সংশোধনের অপচেষ্টা করা হচ্ছে। জুলাই সনদের সঙ্গে যায় না, এমন নতুন নতুন ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন-জামায়াতের নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন) প্রমুখ।
