কোনো লোকেরই নিজ হাতে আইন তুলে নেয়া উচিত নয়। আবার শিশু-কিশোরেরা যেন কোনো কারণে নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে অনিরাপদ মনে না করে, তাও সুনিশ্চিত করতে হবে। টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (৭) যৌননিপীড়নের অভিযোগের ঘটনার প্রেক্ষিতে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এই মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ ছুটি কমিয়ে আনা, বেঞ্চ পুনর্গঠন এবং বিচারাঙ্গনে ন্যায়বিচার দ্রুত বাস্তবায়নে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। রোববার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিচারপতিদের সাক্ষাতের (মিট অ্যান্ড গ্রিট) পর আয়োজিত চা-চক্র শেষে নিজ কার্র্যালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।
অ্যার্টনি জেনারেল বলেন, আমার মনে হয়, পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে, যে দেশে এত বেশি আইন আছে। বাংলাদেশে এমন কোনো আইন নাই, যা প্রত্যেকটা সিচুয়েশনকে ডিল করে না। এটা একটা আশ্চর্য জিনিস। এই ঘটনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান আছে। আইনি প্রতিকার আছে। যদি কোনো কারণে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকেন, সেই অপরাধের জন্য তিনি শাস্তি ভোগ করবেন বলে মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। একইসঙ্গে তিনি বলেন, যদি কোনো কারণে ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হন, তাহলে তিনি নিরপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। কারোরই নিজ হাতে আইন তুলে নেয়া উচিত নয়। রুহুল কুদ্দুস আরও বলেন, শিক্ষকদের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, তা যেন কোনো আচরণের কারণে নষ্ট না হয়ে যায়। তিনি বলেন, শিশু-কিশোরেরা যেন কোনো কারণে নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে অনিরাপদ মনে না করে, তা সুনিশ্চিত করতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, শিক্ষকদের মূল ভূমিকা ‘লোকো প্যারেন্টিস’। অর্থাৎ, মা-বাবার যে ভূমিকা, শিক্ষকেরা সেই ভূমিকা পালন করে থাকেন।
একটা-দুইটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো শিক্ষক সমাজকে টার্গেট করা উচিত হবে না। আবার সন্তানের কোনো রকম অনিষ্ট দেখলে মা-বাবার স্বাভাবিক যে আবেগ, সেটাকেও কেউ কেউ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি যেহেতু আইনের মানুষ, তাই তার নিজের অভিমত হচ্ছে, আইনের কাঠামোর মধ্যে পুরো বিষয়ের একটা আইনি সমাধান করা সম্ভব। আমি জানতে পেরেছি যে, এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলা তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। যেহেতু আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এই প্রক্রিয়াতেই বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। এদিকে মামলার বিশাল স্তূপের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ ছুটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক থাকাকালীন তিনি ছুটি কমানোর লিখিত আবেদন করেছিলেন। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও তিনি বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ছুটি নির্ধারণ বা কমানোর বিষয়টি এককভাবে প্রধান বিচারপতির ওপর নির্ভর করে না; এটি হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সব বিচারপতির সিদ্ধান্তের বিষয়।
তবে প্রধান বিচারপতি এ বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী দায়িত্ব নেয়ার পর নিম্ন আদালতের এক মাসের ছুটি দুই পর্বে ভাগ করেছিলেন। বর্তমান প্রধান বিচারপতির অধীনে প্রথম দীর্ঘ ছুটির পর ঐতিহ্য অনুযায়ী হাইকোর্টের ৫৭টি বেঞ্চ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এই পুনর্গঠনে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের পাশাপাশি মেধা, প্রজ্ঞা ও সততার স্বাক্ষর রাখা তরুণ বিচারকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখবে এবং এতে সাধারণ আইনজীবীরাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ছাড়া শুধু বেঞ্চ বা বিচারপতির সংখ্যা বাড়িয়ে মামলার জট বা দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, বেঞ্চ বাড়ানোর চেয়েও বড় বিষয় হলো-সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোতে কী পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের জন্য গঠিত একটি বেঞ্চের উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, বেঞ্চটি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি কার্যদিবসের মধ্যে প্রায় ২৪টি ফাঁসির (মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত) মামলা নিষ্পত্তি করেছে। অথচ পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, একই ধরনের এখতিয়ারসম্পন্ন অন্যান্য বেঞ্চ হয়তো সমপরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি করতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, বিচারপ্রার্থীদের, বিশেষ করে নির্জন কারাবাসে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির অধিকার রয়েছে। তারা দোষী হলে সাজা ভোগ করবেন, আর নির্দোষ হলে খালাস পাবেন। এই অধিকার সমুন্নত রাখতে ক্ষেত্রবিশেষে প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ বা বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। তবে কেবল বেঞ্চ বাড়িয়েই মামলার স্তূপ কমানো সম্ভব নয়, মামলা নিষ্পত্তির গতিও নিশ্চিত করতে হবে।
