বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের শাখা খোলার আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। এই সম্ভাবনাকে ঘিরে ব্যবসায়ী মহলে প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। তবে একটি বিদেশি ব্যাংকের উপস্থিতির গুরুত্ব শুধু তার দেশের অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বাংলাদেশের জন্য মূল বিবেচনা হওয়া উচিত, এর মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কতটা কমবে, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়বে এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থা কতটা উপকৃত হবে। চীনা ব্যাংকের সম্ভাব্য আগমনকে তাই উচ্ছ্বাস কিংবা সংশয়ের একপেশে দৃষ্টিতে দেখার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থের নিরিখে বিচার করা প্রয়োজন।
গত ২০ অক্টোবর বেইজিংয়ে এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ডে’ এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অনুষ্ঠানে চীনের ১১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ২৬টি কোম্পানি অংশ নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ এত বড় বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিপরীতে বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের সরাসরি কার্যক্রম নেই। অনুষ্ঠানে সেই শূন্যতা পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে আহ্বান, বিনিয়োগে আগ্রহ এবং শাখা চালুর চূড়ান্ত অনুমোদন যে পৃথক বিষয়, সেটিও মনে রাখতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, চীনা ব্যাংক এলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে? সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সম্ভাবনাটি বাণিজ্য অর্থায়নে। আমদানির ঋণপত্র খোলা, সরবরাহকারীর সঙ্গে অর্থ পরিশোধের সমন্বয়, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই এবং স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ কিংবা অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের উৎপাদন খরচে যুক্ত হয়। চীনের ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বাড়লে কিছু লেনদেন সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুবিধা কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সেবার ধরন, চার্জ, ঋণের শর্ত এবং বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতার ওপর।
এখানে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার। নতুন ব্যাংকের সেবা যদি প্রধানত বড় চীনা কোম্পানি ও তাদের প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতিতে তার সুফলও সীমিত হবে। দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তা, মাঝারি ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারকদের অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাড়ানো গেলে এই উপস্থিতি অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগের সুবিধা স্থানীয় উদ্যোগ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি।
বাণিজ্য সহজ হওয়ার পাশাপাশি তার গঠন নিয়েও ভাবতে হবে। শুধু আমদানির অর্থায়ন বাড়লেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ পূরণ হবে না। আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল যদি উৎপাদন বাড়ায়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং রপ্তানি সক্ষমতা গড়ে তোলে, তাহলে সেই অর্থায়নের মূল্য অনেক বেশি। অন্যদিকে উৎপাদন ও রপ্তানির সুযোগ না বাড়িয়ে শুধু বিদেশি পণ্য কেনার সক্ষমতা বাড়ালে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বাড়তে পারে। তাই ব্যাংকিং সহযোগিতার আলোচনায় বাংলাদেশের পণ্য চীনের বাজারে পৌঁছানোর পথ, রপ্তানিকারকদের অর্থায়ন এবং স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরির বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। পরিচিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপস্থিতি বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে পারে। প্রকল্পের অর্থায়ন, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং চলতি মূলধনের ব্যবস্থা সহজ হলে বিনিয়োগ বাস্তবায়নের পথ কিছুটা মসৃণ হয়। কিন্তু ব্যাংক এলেই বিনিয়োগ আসবে, এমন সরল সমীকরণ টানা যায় না। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, জমির প্রাপ্যতা, দক্ষ শ্রমশক্তি, বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং নীতির ধারাবাহিকতাও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গায় দুর্বলতা থাকলে নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি একা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
চীনা ব্যাংকের প্রসঙ্গে ইউয়ানে লেনদেনের সম্ভাবনাও আলোচিত হচ্ছে। বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিবৃতিতেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং চীনা ব্যাংককে বাংলাদেশে শাখা স্থাপনে স্বাগত জানানোর কথা ছিল। ফলে বর্তমান উদ্যোগকে আগের আলোচনার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যায়।
তবে মুদ্রার বৈচিত্র্যকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সমাধানের সহজ পথ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে আমদানির মূল্য পরিশোধ করা হলেও সেই ইউয়ান সংগ্রহ করতে হবে। পর্যাপ্ত ইউয়ান আয় না থাকলে অন্য মুদ্রা বিনিময় কিংবা ঋণের মাধ্যমে তা জোগাড় করার প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং লেনদেনের মুদ্রা বদলালেই বৈদেশিক দায় কমে যায় না। বিনিময় ব্যয়, মুদ্রার প্রাপ্যতা, ঋণের সুদ এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধের সক্ষমতা মিলিয়েই লাভ ও ক্ষতি নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক মুদ্রায় লেনদেনের সক্ষমতা তৈরি করা এবং সেই ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক রাখা।
একইভাবে চীনা ব্যাংকের সম্ভাব্য উপস্থিতিকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সূচনা বলা অতিরঞ্জিত হবে। বাংলাদেশের কাছে এর তাৎপর্য অনেক বেশি বাস্তব ও নির্দিষ্ট। ব্যবসায়ী কম খরচে অর্থায়ন পাবেন কি না, লেনদেনের সময় কমবে কি না এবং শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরেই উদ্যোগটির মূল্য নিহিত। বৃহৎ ভূরাজনৈতিক বয়ানের আড়ালে এই বাস্তব প্রশ্নগুলো হারিয়ে গেলে নীতিগত সিদ্ধান্তও ভুল দিকে যেতে পারে।
নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির বিষয়টি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির বিকল্প হতে পারে না। নতুন প্রতিষ্ঠানের মূলধন, তারল্য, ঋণের মান, গ্রাহক যাচাই, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং তথ্যনিরাপত্তা সম্পর্কে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। স্থানীয় ও বিদেশি সব ব্যাংকের জন্য নিয়ম প্রয়োগে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যেন কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়ন্ত্রক ছাড়ের কারণ না হয়। শক্তিশালী তদারকি একটি বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক বাজারের ভিত্তি।
প্রকল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। ঋণ ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব এক নয়। কোন অর্থায়নে পরিশোধের দায় কার, রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি আছে কি না এবং প্রকল্প থেকে আয় হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, এসব পরিষ্কার থাকা দরকার। ঋণের সহজলভ্যতা কোনো অকার্যকর প্রকল্পকে কার্যকর করে তোলে না। আবার যথাযথভাবে যাচাই করা উৎপাদনশীল প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়ন উন্নয়নের গতি বাড়াতে পারে। সিদ্ধান্তের ভিত্তি তাই হওয়া উচিত প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, আর্থিক সক্ষমতা এবং জনস্বার্থ।
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও বিচক্ষণতার দাবি রাখে। চীনের সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি অন্য বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের পরিসর ধরে রাখা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে ভারসাম্যের মূল কথা হলো, নিজের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা। একাধিক বিনিয়োগকারী, অর্থায়নের উৎস ও রপ্তানিবাজার সেই সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পারে। কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে দরকষাকষির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বেইজিংয়ের আয়োজন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। এখন প্রয়োজন আলোচনাকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব, স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্তে নিয়ে যাওয়া। কোন ব্যাংক কী ধরনের সেবা দিতে চায়, দেশীয় উদ্যোক্তারা কী সুবিধা পাবেন এবং নিয়ন্ত্রক শর্তগুলো কী হবে, এসব বিষয়ে স্পষ্টতা তৈরি করতে হবে। ঘোষণার গুরুত্ব থাকবে তখনই, যখন তার ফল ব্যবসা ও উৎপাদনে দৃশ্যমান হবে।
চীনা ব্যাংকের সম্ভাব্য আগমন বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হতে পারে। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার নির্ভর করবে আমাদের প্রস্তুতি, দরকষাকষির সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের শক্তির ওপর। সাশ্রয়ী অর্থায়ন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিই হওয়া উচিত প্রত্যাশিত অর্জন। বাংলাদেশে কোন দেশের ব্যাংক এলো, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী অবদান রাখল। জাতীয় স্বার্থের এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই হবে নতুন আর্থিক অংশীদারিত্বের প্রকৃত সাফল্য।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: [email protected]
