বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘প্রবারণা পূর্ণিমা’ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা’ আজ। প্রার্থনা, পূজা-অর্চনা ও নানা ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের মধ্যদিয়ে দিনটি পালন করবে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা। আশ্বিনের পূর্ণিমা তিথিতে একদিকে যেমন ধনসম্পদ, সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রতীক লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা করবেন সনাতনী নারী-পুরুষেরা। ঠিক তেমনই বৌদ্ধবিহারে ধর্মীয় আলোচনা, বুদ্ধপূজা, প্রার্থনা ও মানবকল্যাণে রঙিন কাগজের তৈরি ফানুস ওড়াবেন বৌদ্ধ ধর্ম্বালম্বীরা।
শাস্ত্রমতে, আশ্বিনের পূর্ণিমা তিথিতে ধনসম্পদ, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী দেবী বিষ্ণুলোক থেকে পৃথিবীতে নেমে আসেন পূজা গ্রহণ করতে। লক্ষ্মী দেবী সন্তুষ্ট থাকলে সংসারে অর্থকষ্ট থাকে না, বরং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ে। শনিবার পূর্ণিমা তিথিতে লক্ষ্মী দেবীর বন্দনা করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রাচীনকাল থেকেই রাজা-মহারাজা ও ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ অবধি সবাই দেবী লক্ষ্মীর পূজা দিয়ে আসছেন। লক্ষ্মীকে নিয়ে বাংলার জনসমাজে বিভিন্ন জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে।
এই গল্পগুলো লক্ষ্মী পাঁচালীর আকারে লক্ষ্মীপূজার দিন পাঠ করা হয়। সিঁদুর, ঘট, ধান, মাটি, আম্রপল্লব, ফুল, দুর্বা, তুলসীপাতা, হরিতকী, চন্দন, ধূপ, দীপ, আতপ চালের নৈবেদ্য দিয়ে আয়োজন করা হয় লক্ষ্মী পূজার। মঙ্গলঘট, ধানের ছড়ার সঙ্গে পুরো ঘরে চালের গুঁড়া ও খড়িমাটি দিয়ে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ দিয়ে আলপনা আঁকা হয়।
অন্যদিকে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। মূলত ‘প্রবারণা’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। ব্যাপক অর্থে প্রবারণা বলতে অসত্য ও অকুশল কর্মকে বর্জন করে সত্য ও কুশল কর্মকে বরণ করা। প্রবারণা পূর্ণিমার অপর নাম ‘আশ্বিনী পূর্ণিমা’। এই পবিত্র দিনের আকর্ষণ সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানোর উৎসব। সর্বস্তরের মানুষ ফানুস ওড়ানো উপভোগ করে। ফানুস মূলত ওড়ানো হয় বুদ্ধের কেশ ধাতুর প্রতি পূজা ও সম্মান প্রদর্শনার্থে। প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাব্রত পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এই পূর্ণিমা তিথি সব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিন মাস বর্ষাব্রত পালন করেন। এই তিন মাস তারা বিহারে অবস্থান করেন। যেহেতু একসঙ্গে বসবাস করতে গেলে পরস্পরের মধ্যে ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক, সেহেতু ভিক্ষুদের মধ্যেও ভুলভ্রান্তি হতে পারে। তাই বর্ষাব্রত পালন শেষে ভিক্ষুরা আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা করেন। এইদিনে ভিক্ষুরা পরস্পরের কাছে তাদের পূর্বকৃত ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যার মাধ্যমে বুদ্ধের শাসনের উৎকর্ষ সাধিত হয় এবং ভিক্ষুসংঘের কল্যাণ সাধিত হয়। ভিক্ষুসংঘের বর্ষাবাস পরিসমাপ্তির এই পবিত্র দিনকে কেন্দ্র করেই প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করা হয়। প্রবারণা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য একটি আবশ্যক বিধিবদ্ধ নিয়ম। এই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
